অতুলপ্রসাদ
সেনক্রমে ক্রমে তিনি লখ্নৌ শহরের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। এই সময় বাবু গঙ্গাপ্রসাদ ভার্মা লখ্নৌ শহরের উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করেন। এক্ষেত্রে অতুলপ্রসাদ, লালা শ্রীরাম এবং নবীউল্লাহ বেগ তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন। এরপর তিনি বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগারের সংস্কার করেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় যুবক সমিতি, গুডউইল ক্লাব ও সেবা সমিতি। শ্রীরমেশ ঘোষের উদ্যোগে ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে লখ্নৌতে মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রথম বাঙালি স্কুল 'হিন্দু গার্লস কলেজ' স্থাপিত হয়েছিল। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই স্কুলের সভাপতি হন।
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বারাণসীতে কংগ্রেস অধিবেশনে তিনি লখ্নৌর প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার দিনে, জাতীয় শোক দিবস হিসাবে পালন করা হয়। এই দিনে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে– হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধনের প্রতীক হিসাবে 'রাখিবন্ধন'-এর ব্যবস্থা করা হয়। অতুলপ্রসাদ এই অনুষ্ঠানের জন্য কলকাতায় আসেন এবং ‘রাখিবন্ধন অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। লখ্নৌতে ফিরে এসে তিনি স্বদেশী চেতনায় ভারতীয় যুবকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য, 'মুষ্ঠিভিক্ষা সংগ্রহ'-এর সূচনা করেন। পরে এই সূত্রে প্রতিষ্ঠিত হয় 'আউধ সেবাসমিতি'।
এই সময় অতুলপ্রসাদের আত্ময়স্বজনেরা, বিশেষ
করে তাঁর মা সব ভুলে গিয়ে সম্পর্ককে উন্নত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই কারণে তাঁর
মা লখ্নৌতে আসেন। অতুলপ্রসাদও সব ভুলে গিয়ে সম্পর্ক দৃঢ় করায় আগ্রহ প্রকাশ করেন।
কিন্তু তাঁর স্ত্রী হেমকুসুম অতীতের লাঞ্ছনাকে ভুলতে পারেন নি। তাই তিনি কোনো ভাবেই
সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে মেনে নিতে পারেন নি। ফলে অনিবার্যভাবে পারিবারিক সংঘাত
শুরু হয়। পরম অশান্তি নিয়ে অতুলপ্রসাদ ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে তৃতীয় বার ইংল্যান্ডে যান।
১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ব্রাহ্মসমাজের প্রচারের কাজে হাত দেন। এরপর তিনি ক্যানিং
কলেজের ছাত্রদের নিয়ে গঠন করেন 'গোখলে স্টুডেন্ট সোসাইটি'। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে
লখনৌতে ভয়াবহ বন্যা হলে, তিনি তাঁর গঠিত সমিতিগুলো থেকে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করে,
বন্যার্তদের সেবা করেন।
১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত 'খামখেয়ালী সভা'র সূত্রে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে
তাঁর সখ্য গড়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে
রবীন্দ্রনাথ হিমালয় ভ্রমণের পর রামগড় এলে, তিনি অতুলপ্রসাদকে আমন্ত্রণ জানান।
এবং তিনি রামগড়ে গিয়ে কিছুদিন রবীন্দ্রনাথের সাথে কাটান। পারবারিক সংঘাতের কারণে স্ত্রী হেমকুসুমের
সাথে তাঁর সাময়িক বিচ্ছেদ ঘটে। এর কিছুদিন পর তিনি লখ্নৌ ছেড়ে কলকাতা হাইকোর্টে
যোগদান করেন এবং কলকাতার একটি ফ্লাট বাড়িতে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন শুরু করেন।
১৯১৬
খ্রিষ্টাব্দে লখ্নৌতে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে লখ্নৌবাসীর আমন্ত্রণে যান। ১৯১৭
খ্রিষ্টাব্দে তিনি পুনরায় লখ্নৌতে ফিরে আসার উদ্যোগ নেন। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন
সভাসমিতি, সাহিত্য আসর, রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যস্ততার মধ্যে কাটান। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে
লখ্নৌতে রবীন্দ্রনাথ এলে, তাঁর স্ত্রী হেমকুসুম পুত্রকে সাথে নিয়ে অতুলপ্রসাদের
কাছে আসেন এবং একসাথে কবিকে সম্বর্ধনা দেন। সম্বর্ধনা শেষে রবীন্দ্রনাথ বোম্বে চলে
যান। এরপরই হেমকুসুম পুত্রকে সাথে নিয়ে অন্যত্র চলে যান।
১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে
লখ্নৌতে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনে তিনি সভাপতি হন। এই অধিবেশনে একটি সাহিত্য
পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অতুলপ্রসাদ এর নামকরণ করেন 'উত্তরা'। এই সময়
হেমকুসুম দেরাদুনে যান। সেখানে টাঙ্গা থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর পেলভিস্ বোন ভেঙ্গে যায়।
অতুলপ্রসাদ দেরাদুনে গিয়ে তাঁর চিকিৎসার সকল ব্যবস্থা করে লখ্নৌতে ফিরে আসেন। এরপর
কলকাতা থেকে তাঁর অসুস্থ মাকে লখ্নৌতে নিয়ে আসেন। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২২ মে-তে
তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন।
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের
নির্ধারিত সভাপতি
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অসুস্থ হয়ে পড়লে, অতুলপ্রসাদ সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩৩
খ্রিষ্টাব্দে এলাহাবাদ লিবারেল পার্টির উত্তরপ্রদেশ শাখার অষ্টম অধিবেশনে তিনি
সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে, স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য
কার্শিয়াং যান। ডিসেম্বরে গোরক্ষপুরের প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের বার্ষিক
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। এরপর তিনি সুস্থবোধ করায় লখ্নৌতে ফিরে আসেন।
১৯৩৪
খ্রিষ্টাব্দের ১৫ এপ্রিলে পুরী যান।
গান্ধী (মহাত্মা) এই
সময় পুরীতে আসেন। গান্ধীজীর অনুরোধে অতুলপ্রসাদ তাঁকে গান গেয়ে শোনান। ২৫শে আগষ্ট
তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৬শে আগষ্ট দিবাগত গভীর রাতে মৃত্যবরণ করেন।
[অতুল
প্রসাদ সেনের রচিত গানের তালিকা]
তথ্যসূত্র