সলীল চৌধুরী
(১৯২৩-১৯৯৫)
গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং কথা সাহিত্যিক।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত রাজপুর সোনারপুর অঞ্চলের গাজিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের নাম বিভাবতী দেবী। তাঁর পিতা নাম জ্ঞানেন্দ্রময় চৌধুরী ছিলেন আসামের লতাবাড়ি চা বাগানে ডাক্তার। চা বাগানের ইংরেজ ম্যানেজার তাঁকে "কাম হিয়ার ডার্টি নিগার" বলায় তিনি ঘুষি মেরে সাহেবের তিনটে দাঁত ফেলে দেন। বলাই বাহুল্য তিনি শুধু ওই চাবাগানের চাকরিই নয়, গাজিপুর ত্যাগ করতে হয়। এই সময় তাঁর সখের গানের রেকর্ড এবং কলের গান ছাড়া সকল সম্পত্তি নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় করে, আসাম ত্যাগ করেন। কথিত আছে গান্ধীজির সত্যাগ্রহের সময় তিনি নাকি জ্ঞানেন্দ্রময় চৌধুরী দু তিন
ট্রাঙ্ক ভর্তি দামি ইউরোপীয় পোশাক পুড়িয়েছিলেন।
 
সলীল চৌধুরী ছিলেন আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর শৈশবের বেশির ভাগ সময় কেটেছে আসামের চা বাগানে। পরে পরিবারের সাথে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সুভাষগ্রামে, (পুরাতন নাম কোদালিয়া) মামার বাড়িতে চলে আসেন। এই অঞ্চলের হারিনাভি বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং উচ্চ মাধ্যমিক (আইএসসি) পাশ করেন।

বাবার কাছেই সলিল চৌধুরীর সংগীত শিক্ষার শুরু। পের তাঁর পিতৃব্য নিখিল চৌধুরীর কাছেও সংগীতের তালিম গ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা ছিলেন পাশ্চাত্য চিরায়ত সঙ্গীতের অনুরাগী। এই সূত্রে পিতার সংগৃহীত রেকর্ড থেকে পাশ্চাত্য চিরায়ত সঙ্গীতের নানা বিষয় শোনার অভিজ্ঞতা জন্মে। তাঁর দাদার একটি অর্কেস্ট্রা ক্লাব ছিল। এই দলে থেকে তিনি নানান বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অভিজ্ঞতা হয়। এক সাথে পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র এবং বাদনরীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়ে উঠেন। তবে বাঁশী বাজানোতে তিনি বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন।

১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে স্নাতক শ্রেণিতে লেখাপড়ার জন্য কলকাতায় আসেন এবং কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। বঙ্গবাসীতে লেখাপড়া করার সময় তিনি  ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক দল ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আইপিটিএ-এ
(Indian Peoples Theater Association) যোগ দেন। এ সময় থেকে তাঁর লেখার শুরু। আইপিটিএ এর সাংস্কৃতিক দলটি বিভিন্ন শহর এবং গ্রামগঞ্জে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার করতে থাকলে, তাঁর গান সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে সুভাষগ্রামে মজে যাওয়া বিদ্যাধরী নদীর সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন হয়, তাতে তিনি সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। এই সময় এই নদীর বন্যায় আক্রান্ত কৃষকদের উপর প্রশাসনের অত্যাচারের প্রতিবাদে রচনা করেন
‘দেশ ভেসেছে বানের জলে ধান গিয়েছে মরে।’ এই সময় পার্টির জেলা নেতা শ্রী নিত্যানন্দ চৌধুরীর উৎসাহে তিনি প্রায় প্রত্যেকটি সভার জন্য একটি করে গান বা কবিতা রচনা করতেন। সেই সময়কার কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সলিল চৌধুরীর আরেকটি গণসংগীত হলো ‘কৃষক সেনাদের মুষ্টি তোলে আকাশে’

১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে, বঙ্গবাসী কলেজে পড়াকালীন সময়ে রংপুরের ছাত্র সম্মেলনে যোগ দেন। এই সময় আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দীদের বিচারের প্রতিবাদে তিনি গণ সংগীত, 'বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা' রচনা করেন।
 
১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে জুলাই, নৌ বিদ্রোহের সময়  রচনা করেছিলেন 'ঢেউ উঠেছে কারা টুটেছে'। আর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময়ে লিখেছিলেন 'ও মোদের দেশবাসীরে, আয়রে পরাণ ভাই, রহিম ভাই'।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে "পরিচয়" পত্রিকা তাঁর প্রথম কবিতা "শপথ" প্রকাশিত হয়। এই বৎসরে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এই সময় এদের স্লোগান ছিল ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’। নিষিদ্ধ দল করার কারণে অনেক কৃষকনেতা ও কর্মী জেল খাটেন। এই সময় সলিল চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ছিল, তবে তাঁকে শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা সম্ভব হয় নি।

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর পরিচালিত 'পরিবর্তন' মুক্তি পায়।
১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিমল রায় পরিচালিত 'দো ভিঘা জামিন' চলচ্চিত্রে প্রথম সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে শম্ভূমিত্র ও অমিত মৈত্র পরিচালিত 'একদিন রাত্রে' ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে মালায়ম ভাষায় রচিত ' চিম্মিন' ছবি পরিচালনা করেন।
১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্য গ্রন্থ "সলিল চৌধুরির কবিতা"।

১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর মৃত্যবরণ করেন।

[সলিল চৌধুরীর গানের তালিকা]