ভাষাংশ | কাজী নজরুল ইসলাম |
কাজী নজরুল ইসলামের রচনাসংগ্রহের সূচি



*৮০১. তাল: ফের্‌তা (দ্রুত-দাদ্‌রা ও কাহার্‌বা)
আবৃত্তি: কুমারী রাধিকা ঘোষের প্রতি শ্রীমৎ ক্যাগ বিমাতার উক্তি:
বলি মাথা খাস্ রাধে ওলো কথা শোন্।
বলি কুল আর তুই খাস্‌নে (রাধে কুল আর তুই খাস্‌নে)
ওলো গোকুল ঘোষের কন্যা যে তুই কুল গাছ পানে চাস্‌নে
(পরের কুল গাছ পানে চাস্‌নে)।
ও কুল গাছে বড় কাঁটা
গায়ে অথবা পায়ে বিঁধিলে দায় হবে পথ হাঁটা
(রাধে গায়ে অথবা পায়ে বিঁধিলে দায় হবে পথ হাঁটা)
কলঙ্ক দিলি (কলঙ্ক দিলি)
গোকুলের কুলে কলঙ্ক দিলি (কুলে কলঙ্ক দিলি)
তুই যারি তারি কুল চুরি করে খেলি
গোকুলের কুলে কলঙ্ক দিলি (কুলে কলঙ্ক দিলি) রাধে গো।
ওলো ভাবিস এখনও বয়েস হয়নি কারণ বেড়াস ফ্রক পরে।
ওই কুল গাছ আগলায় ভীমরুল চাক
(ওই কুল গাছ আগলায় ভীমরুলচাক)
তোর কুল খাওয়া বের হবে ফুলে হবি ঢাক
বলি পড়তে নাকি কুল খেতে যাস রোজ রোজ ইস্কুলে
(রাধে পড়তে নাকি কুল খেতে যাস রোজ রোজ ইস্কুলে)
ওই কুলেরি কাঁটায় দুকুল ছিঁড়িস বেণী আঁটিস খুলে
(রাধে বেণী আঁটিস খুলে)
খাস তুই টোপা কুল খাস নারকুলে কুল
(খাস তুই টোপা কুল খাস নারকুলে কুল)
অত কুল খেয়ে রাতে পেট ডাকে কুল কুল কুল কুল।
ওলো কুলোতে নারি (কুলোতে নারি)
ওলো তোর কুল দিয়ে আর কুলোতে নারি (দিয়ে কুলোতে নারি)
ছিল কুলুঙ্গীতে কুলের আচার তাও খেয়েছিস কুল খোয়ারী
(কুলুঙ্গীর ও কুলের আচার তাও খেয়েছিস কুল খোয়ারী)।
ওই কুল গাছ ধরে (সখি গো রাধে গো)
(বহুত আচ্ছা দাদা বহুত আচ্ছা বহুত আচ্ছা)
ওই কুল গাছ ধরি কোলাকুলি করি ফ্যাসাদ বাধাবি শেষে
আর কুল ত্যাগিনী হবে কি নাশিনী কুল গাছ ভালোবেসে
(আর কুল ত্যাগিনী হবে কি নাশিনী কুল গাছ ভালোবেসে)॥
*৮০২. রাগ: তিলং, তাল: একতাল
ব্রজগোপাল শ্যাম সুন্দর
যশোদা দুলাল শিশু নটবর॥
নন্দ নন্দন নয়নানন্দ
চরণে মধুর সৃজন ছন্দ
ভুবন মোহন কৃষ্ণচন্দ্র
অপরূপ রূপ হেরে চরাচর॥
কোটি গ্রহতারা চরণে নূপুর
ওঙ্কার ধ্বনি বাঁশরির সুর।
বঙ্কিম আঁখি বাঁকা শিখীপাখা
বাঁকা শ্রীচরণ ভঙ্গিমা বাঁকা
কৃষ্ণময় শ্রীঅঙ্গ ডাকা
করাল মধুর প্রভু গিরিধর॥
*৮০৩. তাল: কাহার্‌বা
পুরুষ : যাও হেলে দুলে এলোচুলে কে গো বিদেশিনী
: কাহার আশে কাহার অনুরাগিনী।
স্ত্রী : আমি কনক চাঁপার দেশের মেয়ে
এনু ঊষার রঙের গান গেয়ে
আমি মল্লিকা গো পল্লীবাসিনী।
পুরুষ : চিনি চিনি ওই চুড়ি কাঁকনের রিনিকি রিনি
তুমি ভোর বেলা দাও স্বপনে দেখা।
স্ত্রী : তোমার রঙে কবি আঁক আমারি ছবি
তুমি দেবতা রবি আমি তব পূজারিণী।
পুরুষ : এসো ধরণীর দুলালী আলোর দেশে
যথা তারার সাথে চাঁদ আমি যাই গো ভেসে
দ্বৈত : চলো যাই ধরণী ধূলির ঊর্ধে
পুরুষ : যথা বয় অনন্ত
স্ত্রী : প্রেম মন্দারিণী
পুরুষ : যথা বয় অনন্ত
দ্বৈত : প্রেম মন্দারিণী॥
*৮০৪. চলচ্চিত্র: ‘বিদ্যাপতি’, তাল: দাদ্‌রা
রাই বিনোদিনী দোলো ঝুলন দোলায়॥
একা লাগে না ভালো
সাথে এসে দোলো শ্যামরায়॥
রাঙা চরণ দেখিতে পাব বলে
ওগো দাঁড়াইয়া এই তরুতলে
শ্যাম বাঁধিয়া বাহু ডোরে
আশ্রয় দাও মোরে একা বড় ভয় পায়॥
*৮০৫. তাল: কাহার্‌বা
দ্বৈত : শ্রী রঘুপতি রাম
লহ প্রণাম শ্রী রঘুপতি রাম
নব দূর্বাদল শ্যাম অভিরাম।
স্ত্রী : সুরাসুর কিন্নর যোগী ঋষি নর
পুরুষ : চরাচর যে নাম জপে অবিরাম॥
স্ত্রী : সরযূ নদীর জল ছল ছল কান্তি
পুরুষ : ঢল ঢল অঙ্গ ললাটে প্রশান্তি
স্ত্রী : নাম স্মরণে টোটে শোক তাপ ভ্রান্তি
দ্বৈত : পদারবিন্দে মূরছিত কোটি কাম॥
স্ত্রী : জানকী বল্লভ সুঠাম অঙ্গ
পুরুষ : পরশে নিমেষে হয় হরধনু ভঙ্গ
দ্বৈত : রাবণ ভয় হবে যাঁহার নাম॥
স্ত্রী : পিতৃ সত্যবৃত পালনকারী
পুরুষ : চির বল্কলধারী কাননচারী
দ্বৈত : প্রজারঞ্জন লাগি সর্বসুখ ত্যাগী
যে নামে ধরা হল আনন্দধাম॥
*৮০৬. তাল: দাদ্‌রা
হরি হে তুমি তাই দূরে থাক স’রে
হরি প্রভু বলে মোরা দূরে রাখি
পাষাণ দেউলে রাখিয়াছি হায় তোমারে পাষাণ করে॥
তোমায় চেয়েছিল গোপিনীরা
সেদিনও চেয়েছি মীরা ডেকে প্রিয়তম বলে
তোমায় গোপাল বলিয়া ডাকিয়া পাইল যশোদা মা শচী কোলে
অন্তরতম হতে নিশিদিন থাক তুমি অন্তরে॥
দেবতা ভাবিয়া পূজা দিই মোরা তুমি তাহা নাহি খাও
তুমি লুকায়ে ভিখারি সাজিয়া মোদের পাতের অন্ন চাও।
রাখাল ছেলের আধ খাওয়া ফল
কেড়ে খাও তুমি হে চির সজল
মোরা ভয় করি তাই লুকাইয়া থাক তুমি অভিমান ভরে॥
*৮০৭. রাগ: ভৈরবী মিশ্র, তাল: দাদ্‌রা
আনন্দ রে আনন্দ, আনন্দ আনন্দ,
দশ হাতে ঐ দশ দিকে মা ছড়িয়ে এলো আনন্দ।
ঘরে ফেরার বাজল বাঁশি, বইছে বাতাস সুমন্দ॥
আমার মায়ের মুখে হাসি, শরত-আলোর কিরণরাশি,
কমল বনে উঠছে ভাসি, মায়ের গায়ের সুগন্ধ॥
উঠলো বেজে দিগ্বিদিকে ছুটির মাদল মৃদঙ্গ,
মনের আজি নাই ঠিকানা, যেন বনের কুরঙ্গ।
দেশান্তরী ছেলেমেয়ে, মায়ের কোলে এলো ধেয়ে,
শিশির নীরে এলো নেয়ে স্নিগ্ধ অকাল বসন্ত॥
*৮০৮. রাগ; ভৈরবী, তাল: দাদ্‌রা
আমার বুকের ভেতর জ্বলছে আগুন, দমকল ডাক ওলো সই।
শিগ্‌গির ফোন কর বঁধুরে, নইলে পুড়ে ভস্ম হই॥
অনুরাগ দিশ্‌লাই নিয়ে
চোখের লম্প জ্বালতে গিয়ে,
আমার প্রাণের খোড়ো ঘরে লাগল আগুন ওই লো ওই॥
প্রেমের কেরোসিন যে এত
অল্পে জ্বলে জানিনে তো,
কি দাবানল জ্বলছে বুকে জানবে না কেউ আমা বই॥
প্রণয় প্রীতির তোষক গদি
রক্ষে করতে চায় সে যদি
মনে ক’রে আনতে বলিস (তারে) আদর সোহাগ বালতি মই॥
*৮০৯. তাল: কাহার্‌বা
আমার মুক্তি নিয়ে কি হবে মা, (মাগো) আমি তোরেই চাই
স্বর্গ আমি চাইনে মাগো, কোল্ যদি তোর পাই॥
(মাগো) কি হবে সে মুক্তি নিয়ে,
কি হবে সে স্বর্গে গিয়ে;
যেথায় গিয়ে তোকে ডাকার আর প্রয়োজন নাই॥
যুগে যুগে যে লোকে মা প্রকাশ হবে তোর
(আমি) পুত্র হয়ে দেখব লীলা এই বাসনা মোর।
তুই, মাখাস্ যদি মাখ্‌ব ধূলি,
শুধু তোকে যেন নাহি ভুলি;
তুই, মুছিয়ে ধূলি নিবি তুলি বক্ষে দিবি ঠাঁই॥
*৮১০. তাল: দাদ্‌রা
(মা) আয় মুক্তকেশী আয়
(মা) বিনোদ-বেণী বেঁধে দোব এলোচুলে।
প্রভাত রবির রাঙা জবা (মা) দুলিয়ে দোব বেণী মূলে॥
মেখে শ্মশান ভস্ম কালি,
ঢাকিস্ কেন রূপের ডালি
তোর অঙ্গ ধুতে গঙ্গাবারি আনব শিবের জটা খুলে॥
দেব না আর শ্মশান যেতে, সহস্রারে রাখব ধ’রে।
খেলে সেথায় বেড়াবি মা রামধনু রং শাড়ি প’রে।
ক্ষয় হলো চাঁদ কেঁদে কেঁদে
(তারে) দেব মা তোর খোঁপায় বেঁধে
মোর জীবন মরণ বিল্ব জবা দিব মা তোর পায়ে তুলে॥
*৮১১. তাল: দাদ্‌রা
একটুখানি দাও অবসর বসতে কাছে,
তোমায় আমার অনেক যুগের অনেক কথা বলার আছে॥
গ্রহ ঘিরে উপগ্রহ, ঘোরে যেমন অহরহ;
আমার আকুল এ বিরহ তেমনি প্রিয় তোমায় যাচে॥
চিরকালই রইলে তুমি আমার পাওয়ার বহুদূরে
আজকে ক্ষণিক কইব কথা সকরুণ গানের সুরে।
করব পূজা গানে গানে, চাইব না আর নয়ন পানে;
আমার চোখের অশ্রুলেখা দেখে তুমি চেন পাছে॥
*৮১২. তাল: দ্রত-দাদ্‌রা
এসো ঠাকুর মহুয়া বনে ছেড়ে বৃন্দাবন,
ধেনু দেব বেণু দেব মালা চন্দন॥
কেঁদে কেঁদে কয়লা খাদে যমুনা বহাব;
পলাশ বনে জাগরণে নিশি পোহাব
রাধা হয়ে বাঁধা দেব আমার প্রাণ মন॥
মোর নটকান রঙ শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে,
পীত ধড়া পরাব, নীল অঙ্গ ঘিরে।
পিয়াল ডালে দোলনা বেঁধে দুলিব দুজন॥
ভাসুর-শ্বশুর দ্যাখে যদি করব নাকো লাজ
বলব আমার শ্যামের বাঁশি বাজ রে আবার বাজ
শ্যাম তোমার লাগি জাতি কুল দিব বিসর্জন॥
*৮১৩. তাল: দাদ্‌রা
ওরে রাখাল ছেলে বল্ কি রতন পেলে
দিবি হাতের বাঁশি, তোর ঐ হাতের বাঁশি।
বাঁধা দিয়ে খাড়ু আনব ক্ষীরের নাড়ু
অম্‌নি হেলেদুলে এক্‌বার নাচ্ রে আসি॥
দেখ মাখাতে তোর গায়ে ফাগের গুড়া,
আমার আঙ্গিনাতে ঝরা কৃষ্ণচূড়া।
আমার গলার হার খুলে পরাব আয় কিশোর
তোর পায়ে ফাঁসি॥
যেন কালিদহের জলে শাপের মানিক জ্বলে,
চোখের হাসি, তোর ঐ চোখের হাসি,
ও তুই কি চাস্ চপল মোরে বল্
আমি মরেছি যে তোরে ভালোবাসি॥
আসিস্ আমার বাড়ি রাখাল দিন ফুরালে
আমার চুড়ির তালে দুলবি কদম ডালে।
ছেড়ে গৃহ-সংসার ওরে বাঁশুরিয়া, হব চরণ দাসী।
*৮১৪. রাগ: দারবারী-কানাড়া, তাল: ত্রিতাল
কেন মেঘের ছায়া আজি চাঁদের চোখে?
মোর বুকে মুখ রাখি ঝড়ের পাখি সম কাঁদে ওকে?
গভীর নিশীথের কণ্ঠ জড়ায়ে
শ্রান্ত কেশভার গগনে ছড়ায়ে,
হারানো প্রিয়া মোর এলো কি লুকায়ে
আমার একা ঘরে ম্লান আলোকে॥
গঙ্গায় তারি চিতা নিভেছে কবে,
মোর বুকে সেই চিতা আজো জ্বলে নীরবে;
স্মৃতির চিতা তার নিভিবে না বুঝি আর
কোন সে জনমে কোন সে লোকে॥
*৮১৫. তাল: কাহার্‌বা
চঞ্চল সুন্দর নন্দকুমার।
গোপী চিতচোর প্রেম-মনোহর নওল কিশোর
অন্তর মাঝে বাজে বেণু তার নন্দকুমার
নন্দকুমার, নন্দকুমার॥
শ্রাবণ আনন্দ নূপুর ছন্দ রুনুঝুনু বাজে
নন্দের আঙিনায় নন্দন চন্দ, নাচিছে হেলে দুলে গোপাল সাজে।
টলমল টলে রাঙা পদতলে লঘু হ’য়ে বিপুল ধরণীর ভার-
নন্দকুমার, নন্দকুমার, নন্দকুমার॥
রূপ নেহারিতে এলো লুকায়ে দেবতা
কেহ গোপগোপী হলো, কেহ তরুলতা;
আনন্দ-অশ্রু নদী হ’য়ে বয়ে যায়, উতল যমুনায়।
প্রণতা প্রকৃতি নিরালা সাজায়,
বনডালায় পূজা ফুল সম্ভার।
নন্দকুমার, নন্দকুমার, নন্দকুমার॥
*৮১৬. তাল: দ্রুত-দাদ্‌রা
জ্যোতির্ময়ী মা এসেছে আঁধার আঙিনায়।
ভুবনবাসী ছেলেমেয়ে আয় রে ছুটে আয়॥
আনন্দ আজ লুট হতেছে কে কুড়াবি আয়,
আনন্দিনী দশভুজা দশ হাতে ছড়ায়,
মা অভয় দিতে এলো ভয়ের অসুর’ দ’লে পায়॥
বুকের মাঝে টইটম্বুর ভরা নদীর জল,
ওরে দুলছে টলমল, ওরে করছে ঝলমল।
ঝিলের জলে ফুটল কত রঙের শতদল
ছুঁতে মায়ের পদতল।
দেব সেনারা বাইচ্ খেলে রে আকাশ গাঙের স্রোতে,
সেই আনন্দে যোগ দিবি কে? আয় রে বাহির পথে,
আর দেব না যেতে মাকে রাখব ধ’রে পায়
মাতৃহারা মা পেলে কি ছাড়তে কভু চায়॥
*৮১৭. বৈতালিক
তুমি দিয়েছ দুঃখ-শোক-বেদনা, তোমারি জয় তোমারি জয়।
ভালোবাস যারে কাঁদাও তাহারে ছলনাময়।
তোমারি জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়॥
তুমি কাঁদায়েছ বসুদেব দেবকীরে,
নন্দ যশোদা ব্রজের গোপীরে,
কাঁদাইলে তুমি শত শ্রীমতীরে হে নিরদয়।
তোমারি জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়॥
তোমারে চাহিয়া কোটি নয়নে বিরহ অশ্রু ঝুরে,
ধরণী যে আজ ডুবু ডুবু শ্যাম সাগর সলিলে পুরে।
ভক্তে কাঁদাতে হে ব্যথা বিলাসী,
যুগে যুগে আসি’ বাজাইলে বাঁশি
তবুও এ-প্রাণ তোমারি পিয়াসি মানে না ভয়।
তোমারি জয়, তোমারি জয়, তোমারি জয়।
*৮১৮. তাল: ফের্‌তা
স্ত্রী : তোমায় দেখি নিতুই চেয়ে চেয়ে
ওগো অচেনা বিদেশি নেয়ে॥
পুরুষ : যেতে এই পথে তরী বেয়ে
দেখি নদীর ধারে তোমায় বারে বারে
সজল কাজল বরণী মেয়ে॥
স্ত্রী : তোমার তরণীর আসার আশায়
বসে থাকি কূলে কলস ভেসে যায়।
পুরুষ : তুমি পরো যে শাড়ি ভিন গাঁয়ের নারী
আমি নাও বেয়ে যাই তারি সারি গান গেয়ে।
স্ত্রী : গাগরির গলায় মালা জড়ায়ে
দিই তোমার তরে বঁধু স্রোতে ভাসায়ে॥
পুরুষ : সেই মালা চাহি’, নিতি এই পথে গো
আমি তরী বাহি।
উভয়ে : মোরা এক তরীতে একই নদীর স্রোতে
যাব অকূলে ধেয়ে॥
*৮১৯. তাল: ফের্‌তা
পুরুষ : তোমারে চেয়েছি কত যুগ যুগ ধরি প্রিয়া।
স্ত্রী : এসেছি তাই ফিরে পুন পথিকের প্রীতি নিয়া॥
পুরুষ : তোমার নয়নে তাই চাহি ফিরে ফিরে,
স্ত্রী : হের তব ছবি প্রিয় মোর আঁখি নীরে।
উভয়ে : কত জনম শেষে এসেছি ধরণী তীরে
কার অভিশাপে ছিনু হায় চির পাশরিয়া॥
স্ত্রী : আরো প্রিয় আরো হাতে এ নব বাসর রাতে,
পুরুষ : যেয়ো না স্বপন সম মিশায়ে নিশীথ প্রাতে।
স্ত্রী : তারার দীপালি জ্বলে হের গো গগন তলে
পুরুষ : হের শুক্লা একাদশী চাঁদের তরণী দোলে,
উভয়ে : মোদের মিলন হেরি নিখিল ওঠে দুলিয়া॥
*৮২০. তাল: দাদ্‌রা
(মাগো) তোর কালো রূপ দেখতে মাগো, কাল হ’ল মোর আঁখি,
চোখের ফাঁকে যাস পালিয়ে মা তুই কালো পাখি॥
আমার নয়ন-দুয়ার বন্ধ ক’রে এই দেহ পিঞ্জরে,
চঞ্চলা গো বুকের মাঝে রাখি তোরে ধ’রে;
চোখ্ চেয়ে তাই খুঁজে বেড়াই পাই না ভুবন ভ’রে
সাধ যায় মা জন্ম জন্ম অন্ধ হ’য়ে থাকি॥
কালো রূপের বিজলি চমক কোটি লোকের জ্যোতি,
অনন্ত তোর কালোতে মা সকল আলোর গতি।
তোর কালো রূপ কে বলে মা ‘তমঃ’,
ঐ রূপে তুই মহাকালি মাগো নমঃ নমঃ
তুই আলোর আড়াল টেনে মাগো দিস্ না মোরে ফাঁকি॥
*৮২১. রাগ: সিন্ধু, তাল: কাহার্‌বা
দেখে যারে দুল্‌হা সাজে সেজেছেন মোদের নবী।
বর্ণিতে সে রূপ মধুর হার মানে নিখিল কবি॥
আওলিয়া আর আম্বিয়া সব পিছে চলে বরাতি,
আসমানে যায় মশাল জ্বেলে গ্রহ তারা চাঁদ রবি॥
হুর পরী সব গায় নাচে আজ, দেয় ‘মোবারকবাদ্’ আলম্,
আর্‌শ কুর্শি ঝুঁকে পড়ে দেখতে সে মোহন ছবি॥
আজ আরশের বাসর ঘরে হবে মোবারক রুয়ৎ,
বুকে খোদার ইশ্‌ক নিয়ে নওশা ঐ আল-আরবি॥
*৮২২. রাগ: খাম্বাজ মিশ্র, তাল: কাহার্‌বা
বকুল বনের পাখি ডাকিয়া আর ভেঙো না ঘুম
বকুল বাগানে মম, ফুরায়েছে ফুলের মরশুম॥
ওগো, প্রিয় মোর দূর বিদেশে কারে আর ডাকিছ পাখি
খুলিয়া পড়িছে হাতের, মলিন মালতী রাখি।
নিভিয়া গিয়াছে প্রদীপ রেখে গেছে স্মৃতির ধূম॥
ষোড়শী বাসন্তিকার রঙ দেহে মোর হয়েছে ম্লান।
খেলার সাথী পরদেশে, কারে দিই এ প্রীতির কুম্‌কুম্॥
*৮২৩. তাল: দাদ্‌রা
পরমাত্মা নহ তুমি মোর (তুমি) পরমাত্মীয় মোর।
হে বিপুল বিরাট! মোর কাছে তুমি, প্রিয়তম চিতচোর॥
তোমারে যে ভয় করে হে বিশ্বত্রাতা
তার কাছে তুমি রুদ্র দণ্ডদাতা,
প্রেমময় বলে তোমারে যে বাসে ভালো
তার কাছে তুমি মধুর লীলা কিশোর॥
দ্যাখে ভীরু চোখ আষাঢ়ের মেঘে বজ্র তব বিপুল,
মোর মালঞ্চে সেই মেঘে হেরি, ফোটায় নবমুকুল।
আকাশের নীল অসীম পদ্ম পরে
চরণ রেখেছ, হে মহান লীলা ভরে
সেই অনন্ত জানি না কেমন ক’রে
আমার হৃদয়ে খেল দিবানিশি ভোর॥
*৮২৪. তাল: দাদ্‌রা
যার মেয়ে ঘরে ফিরল না আজ তার ঘরে তুই যা মা উমা!
আজ ঘুম নাই যে মায়ের চোখে সেই মাকে তুই জড়িয়ে ঘুমা॥
(মা) এমন আনন্দেরই হাটে
কেঁদে যাহার দিবস কাটে
‘মা আমি এসেছি’ বলে, সেই জননীর খা মা চুমা॥
যে মা’র বুক শূন্য আজি, কাঁদে আয় রে গোপাল বলে,
মা! তোর দুই কুমার নিয়ে, তুলে দে সেই শূন্য কোলে।
ওমা! এই কটি দিন বিপুল স্নেহে
তুমি বিরাজ কর প্রতি গেহে;
সকল অভাব পূর্ণ ক’রে আনন্দ দে শান্তি দে মা॥
*৮২৫. তাল: কাহার্‌বা
রাধা শ্যাম কিশোর প্রিয়তম কৃষ্ণগোপাল বনমালী ব্রজের রাখাল।
কৃষ্ণ গোপাল শ্রীকৃষ্ণগোপাল শ্রীকৃষ্ণগোপাল
কভু শ্যাম রাঘব, কভু শ্যাম মাধব, কভু সে কেশব যাদব ভূপাল॥
যমুনা বিহারী মুরলীধারী, বৃন্দাবনে সখা গোপী মনহারী,
কভু মথুরাপতি কভু পার্থসারথি কভু ব্রজে যশোদা আনন্দ দুলাল॥
দোলে গলে তাহার মন বন ফুলহার,
বাজে চরণে নূপুর গ্রহ তারকার কোটি গ্রহ তারকার।
কালিয়-দমন কভু, করাল মুরারি কাননচারী শিখী পাখা ধারী;
শ্যামল সুন্দর গিরিধারীলাল।
কৃষ্ণগোপাল শ্রীকৃষ্ণগোপাল শ্রীকৃষ্ণগোপাল॥
*৮২৬. তাল: কাহার্‌বা
এলো শ্যামল কিশোর তমাল-ডালে বাঁধো ঝুলনা।
সুনীল শাড়ি পরো ব্রজনারী পরো নব নীপ-মালা অতুলনা॥
ডাগর চোখে কাজল দিও,
আকাশী রঙ প’রো উত্তরীয়,
নব-ঘন-শ্যামের বসিয়া বামে দুলে দুলে ব’লো, ‘বঁধু, ভুলো না’॥
নৃত্য-মুখর আজি মেঘলা দুপুর,
বৃষ্টির নূপুর বাজে টুপুর টুপুর।
বাদল-মেঘের তালে বাজিয়া বেণু,
পাণ্ডুর হ’ল শ্যাম মাখি’ কেয়া-রেণু,
বাহুতে দোলনায় বাঁধিবে শ্যামরায় ব’লো, ‘হে শ্যাম, এ বাঁধন খুলো না’॥
*৮২৭. তাল: দ্রুত-দাদ্‌রা
কে নিবি মালিকা এ মধু যামিনী,
আয় লো যুবতী কুল কামিনী॥
আমার বেল ফুলের মালা গুণ জানে গো,
পরবাসী বঁধুকে হরে আনে গো।
আমার মালার মায়ায় ভালোবাসা পায়
কেঁদে কাটায় রাতি যে অভিমানিনী॥
আমি রূপের দেশের মায়া পরী,
(সেই) আমার মালার গুণে কুরূপা যে সে হয় সুন্দরী।
যে চঞ্চলে অঞ্চলে বাঁধিতে চায়,
যার নিঠুর বঁধু সদা পালিয়ে বেড়ায়।
আমার মালার মোহে ঘরে রহে সে
ফোটে মলিন মুখে হাসির সৌদামিনী॥
*৮২৮. রাগ: কাফি, তাল: ঝাঁপতাল
গগনে পবনে আজি ছড়িয়ে গেছে রঙ
নিখিল রাঙিল রঙে অপরূপ ঢঙ॥
চিত্তে কে নৃত্যে মাতে দোল লাগানো ছন্দে,
মদির রঙের নেশায় অধীর আনন্দে,
নাচিছে সমীরে পুষ্প, পাগল বসন্ত, বাজে মেঘ মৃদঙ॥
প্রাণের তটে কামোদ নটে সুর বাজিছে সুমধুর-
দুলে অলকানন্দা রাঙা তরঙ্গে
শিখী কুরঙ্গ নাচে রঙিলা ভ্রুভঙ্গে,
বাজিছে বুকে সুর-সারং কাফির সঙ্গ্॥
*৮২৯. তাল: দ্রুত-দাদ্‌রা
তুমি নামো হে নামো শামো হে শামো কদম্ব ডাল ছাইড়া নামো।
দুপরি রৌদ্রে বৃথাই ঘামো ব্যস্ত রাধা কাজে, ওহে শামো হে শামো॥
আরে তোমার ললিতাদেবী কি করতেয়াছে জাননি? তোমার ললিতাদেবী?
আরে লতিতাদেবী সলিতা পাকায়, বিশাখা ঝোলে হিজল শাখায়।
আর বৃন্দাদুতী কি করছে জান? বৃন্দাদুতী? বৃন্দাদুতী পিন্দা ধুতি
গোষ্টে গেছেন তোমার ‘পোস্টে’ সাজিয়া রাখাল সাজে
আর চন্দ্রা গ্যাছেন অন্ধ্র দেশে মান্দ্রাজী জাহাজে॥
আবার ইতি উতি চাও ক্যা? ইতি উতি চাইবার লাগছ ক্যা? ত্র্যা?
আমি কমুনা কোন্‌খানে তোমার যমুনা-তা আমি কমু না?
আরে (তুমি) ইতি উতি চাও বৃথাই আমি কমু না কোথায় তোমার যমুনা
কইলকাতা আর ঢাকা রমনার লেকে পাবে তার নমুনা।
আরে তোমার যমুনা লেক হইয়া গ্যাছে গিয়া! বুঝলা?
হালার যমুনা ল্যাক হইয়া গ্যাছে গিয়া। কলেজে ফিরিছে শ্রীদাম সুদাম
শ্রীদাম সুদাম কলেজে যাইতেয়াছে, আর তুমি এখানে বাঁশি বাজাইতেয়াছ
অ্যাঁ! পোড়া কপাইল্যা-
কলেজে ফিরিছে শ্রীদাম সুদাম, মেরে মাল কোঁচা খুলিয়া বোতাম
লাঙ্গল ছাড়িয়া বলরাম ডাম্বেল মুঘার ভাঁজে।
ওহে শামো হে শামো আরে তুমি নামো, পোড়া কপাইল্যা নামো॥
*৮৩০. তাল: কাহার্‌বা
দেবতা গো, দ্বার খোলো।
অভিসার নিশি বাহির দুয়ারে দাঁড়ায়ে প্রভাত হ’ল॥
পাষাণের আবরণে তুমি যদি
এমনি গোপন রবে নিরবধি,
বেণুকার সুরে হৃদি যমুনায় কেন এ লহর তোলো॥
আর সহিতে পারি না একা,
প্রাণে কেন দিয়ে আশা এত ভালোবাসা
যদি নাহি দিবে দেখা।
বহিতে পারি না আর এই ভার,
এই ফুল সাজ পূজা-সম্ভার
তুমি দেখা দেও একবার দেখা দেও-
দেখা দিয়ে চিরতরে মোরে ভোলো॥
*৮৩১. রাগ: ভৈরবী-যোগিয়া, তাল: দাদ্‌রা
নিশি না পোহাতে যেয়ো না যেয়ো না দীপ নিভিতে দাও।
নিবু-নিবু প্রদীপ নিবুক হে পথিক ক্ষণিক থাকিয়া যাও॥
ঢুলিয়া পড়িতে দাও ঘুমে অলস আঁখি ক্লান্ত করুণ কায়,
সুদূর নহবতে বাঁশরি বাজিতে দাও উদাস যোগিয়ায়।
হে প্রিয় প্রভাতে ও-রাঙা পায়
বকুল ঝরিয়া মরিতে চায়,
তব হাসির আভায় তরুণ অরুণ প্রায় দিক রাঙিয়ে যাও॥
*৮৩২. তাল: ফের্‌তা
নীপ-শাখে বাঁধো ঝুলনিয়া,
কাজল-নয়না শ্যামলিয়া॥
মেঘ-মৃদঙ্গ তালে শিখী নাচে ডালে-ডালে।
মল্লার গান গাহিছে পবন পূরবিয়া॥
কেতকী কেশরে কুন্তল করো সুরভি,
পর কদম মেখলা কটি-তটে রূপ-গরবী।
নব-যৌবন জল-তরঙ্গে,
পায়ে পাঁয়জোর বাজুক রঙ্গে
কাজরি ছন্দে নেচে চল করতালি দিয়া॥
*
*৮৩৩. তাল: কাহার্‌বা
প্রিয়ে...বলি ও প্রিয়ে...তুমি দেখ...।
[কাঁপা-কণ্ঠে আবৃত্তির ঢঙে বলা হয়েছে]

পুরুষ : প্রিয়ে! বলি, ও প্রিয়ে! তুমি দেখ!
দেখ বিরহের দাবানল জ্বলে গোঁফ-দাড়িতে।
স্ত্রী : ও-স’রে যা, সে আগুন লেগে যাবে শাড়িতে॥
পুরুষ : একে ভীষণ ফাগুন মাস
স্ত্রী : ওগো তাই বুঝি হাঁসফাঁস?
পুরুষ : কাপাস ফলের মত ফেটে পড়ে হিয়া গো,
স্ত্রী : প্রেম-তুলো বের হয়ে পড়ে ছড়াইয়া গো,
উভয়ে : রব ওঠে ভোঁস্-ভাঁস্ হৃদি-রেলগাড়িতে॥
পুরুষ : আজি এ বিরহের কাঠ-ঠোক্‌রা, ঠোকরায় প্রেমের টাকে,
স্ত্রী : ওগো এ হেন বেয়াধি হলে টাকে, মধ্যম-নারায়ণ তেল মাখে।
পুরুষ : হায়-হায়-হায়-হায়-হায়
আমাদের মাঝে কে রচিবে মিলনের সাঁকো।
স্ত্রী : থাক্ থাক্ পুরুতঠাকুর ইঞ্জিনিয়ার
তারে তাড়াতাড়ি ডাকো, ডাকো, একবার ডাকো না?
উভয়ে : আগুন লাগিল ওরে দাড়ি আর শাড়িতে
যুগল মিলন হ’ল ধেড়ে আর ধাড়িতে॥
*৮৩৪. রাগ: জংলা, তাল: দ্রত-দাদ্‌রা
বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি যৃথী বেলী।
এসো এসো কুসুম সুকুমার শীতের মায়া-কুহেলি অবহেলি’ ॥
পরানে দেয় দোলা দেয় দোলা দুল্ দোলায়
(পরানে দেয় দোলা দেয় দোলা দেয় দোলন্)
উতলা দখিন হাওয়া
কোকিল কুহরে কুহু কুহু স্বরে মদির স্বপন-ছাওয়া।
হাসে গীত-চঞ্চল, জোছনা-উজল মাধবী রাতি
এসো এসো যৌবন সাথি
ফুল-কিশোর, হে চিতচোর, দেবতা মোর।
মম লাজ অবগুণ্ঠন ঠেলি’ ॥
*৮৩৫. রাগ: শিবরঞ্জনী মিশ্র, তাল: কাহার্‌বা
বল্ মা শ্যামা বল্ তোর বিগ্রহ কি মায়া জানে।
আমি যত দেখি তত কাঁদি ঐ রূপ দেখি মা সকলখানে॥
মাতৃহারা শিশু যেমন মায়ের ছবি দেখে,
চোখ ফিরাতে নারে মাগো, কাঁদে বুকে রেখে।
তোর মূর্তি মোরে তেমনি ক’রে টানে মাগো মরণ টানে॥
ও-মা, রাত্রে নিতুই ঘুমের ঘোরে দেখি বুকের কাছে,
যেন, প্রতিমা তোর মায়ের মত জড়িয়ে মোরে আছে।
জেগে উঠে আঁধার ঘরে
কাঁদি যবে মা তোরই তরে
দেখি প্রতিমা তোর কাঁদছে যেন চেয়ে চেয়ে আমার পানে॥
*৮৩৬. তাল: কাহার্‌বা
ব্রজে আবার আসবে ফিরে আমার ননী-চোরা
আর কাঁদিস্‌নে গো তোরা।
স্বভাব যে ওর লুকিয়ে থেকে কাঁদিয়ে পাগল করা-
আর কাঁদিস্‌নে গো তোরা॥
আমি যে তার মা যশোদা
সে আমারেই কাঁদায় সদা,
যেই কাঁদি সে যায় যে ভুলে বনে বনে ঘোরা॥
মথুতারে আমার গোপাল রাজা হ’ল নাকি,
যেখানে যায়, সে রাজা হয় (তোরে) ভুল দেখেনি আঁখি।
সে রাজা যদি হয়েই থাকে
তাই ব’লে কি ভুলবে মাকে,
আমি হব রাজ-মাতা, তাই ওর রাজবেশ পরা॥
*৮৩৭. রাগ: কাফি-সিন্ধু, তাল: যৎ (৮ মাত্রা)
মন দিয়ে যে দেখি তোমায় তাই দেখিনে নয়ন দিয়ে।
পরান আছে বিভোর হয়ে তোমার নামের ধেয়ান নিয়ে॥
হৃদয় জুড়ে আছ ব’লে,
এড়িয়ে চলি নানান ছলে।
আছ আমার অন্তরে, তাই অন্তরালে রই লুকিয়ে॥
আমার কথা শুনাই না গো তোমার কথা শোনার আশায়,
ভরে আছে অন্তর মোর বন্ধু তোমার ভালোবাসায়।
তোমায় ভালো বাসতে পেরে
পেয়েছি মোর আনন্দেরে
অমর হলাম হে প্রিয় মোর তোমার প্রেমের সুধা পিয়ে॥
*৮৩৮. তাল: দাদ্‌রা
মা এসেছে, মা এসেছে, মা এসেছে রে
মা এসেছে, মা এসেছে উঠ্‌ল কলরোল।
(ওরে) দিকে দিকে বেজে ওঠে সানাই কাঁসর ঢোল॥
ভরা নদীর কূলে কূলে, শিউলি শালুক পদ্মফুলে।
মায়ের আসার আভাস দুলে আনন্দ-হিল্লোল,
সেই খুশিতে পড়ল নিটোল নীল আমাশে টোল॥
বিনা কাজের মাতন রে আজ কাজে দে ভাই ক্ষমা,
বে-হিসাবী করব খরচ সাধ যা আছে জমা।
এক বছরের অতৃপ্তি ভাই, এই ক’দিনে কিসে মিটাই,
কে জানে ভাই ফিরব কিনা আবার মায়ের কোল্।
আনন্দে আজ আনন্দকে পাগল ক’রে তোল্॥
*৮৩৯. তাল: দাদ্‌রা
মা আমি আর কি ভুলি
মাগো আমি আর কি ভুলি।
চরণ যখন ধরেছি তোর মাগো আমি আর কি ভুলি।
আমায় বহু জনম ঘুরিয়েছিস্ মা পরিয়ে চোখে মায়ার ঠুলি॥
তোর পা ছেড়ে যে মোক্ষ যাচে,
তুই বর্ নিয়ে যা তাহার কাছে
ওমা আমি যেন যুগে যুগে পাই মা প্রসাদ চরণ-ধূলি॥
মোরে শিশু পেয়ে খেল্‌না দিয়ে, রেখেছিলি মা ভুলিয়ে
এখন খেল্‌না ফেলে কোলে নিতে মাকে ডাকি দু’হাত তুলি।
তোর ঐশ্বর্য যা কিছু মা
দে ভক্তগণে বিলিয়ে উমা,
তোর ভিখারি এই সন্তানে দিস্‌ মাতৃনামের ভিক্ষাঝুলি॥
*৮৪০. তাল: দাদ্‌রা
মুক্তি আমায় দিলে হে নাথ মোর যে প্রিয় তারে নিয়ে।
আমি কিছু রাখতে নারি দেখ্‌লে বারে বারে দিয়ে॥
যত্ন আদর পায়নি হেথা
স’য়ে গেল শত ব্যথা।
তোমার দান সইলো না মোর গেল বুঝি তাই হারিয়ে॥
তোমার প্রিয় এসেছিল অতীত হয়ে আমার দ্বারে,
ফিরে গেল অভিমানে বুঝি আমার অনাদরে।
যে ছিল নাথ মোর প্রাণাধিক
সে যে তোমার বুকের মানিক
(প্রভু) এবার সে আর হারাবে না বাঁচ্‌ল তোমার কাছে গিয়ে॥
*৮৪১. তাল: ফের্‌তা
যা সখি যা তোরা গোকুলে ফিরে।
যে পথে শ্যামরায় চ’লে গেছে মথুরায়
কাঁদিতে দে ল’য়ে সেই পথ ধুলিরে॥
এ তো ধূলি নয়, ধূলি নয়
হরি-চরণ-চিহ্ন, আঁকা এ যে হরি-চন্দন ধূলি নয়, ধূলি নয়
এই ধূলি মাখিয়া,
হ’য়ে পাগলিনী ফিরিব ‘শ্যাম শ্যাম’ ডাকিয়া।
হব যোগিনী এই ধূলি-তিলক-আঁকিয়া॥ (সখি গো)
শুনিয়াছি দূতি মুখে, প্রিয়াতম আছে সুখে সেই মম পরম প্রসাদ।
ভুলিয়া এ রাধিকায়, সে যদি সুখ পায় তার সে সুখে সাধিব না বাদ॥
আমার দীরঘ শ্বাসে উৎসব-বাতি তার যদি নিভে যায়।
তাই ওলো ললিতা আমি হব ধূলি-দলিতা যাব না লো তার মথুরায়॥
আমি মথুরায় যাব, না গেলে মথুরাতে মোর শ্যাম আর ফিরে পাব না। (সখি গো)
হারানো মানিক কভু ফিরে লোকে পায়
হারানো হৃদয় ফিরে নাহি পাওয়া যায়॥
*৮৪২. তাল: দাদ্‌রা
রক্ষাকালীর রক্ষা-কবচ আছে আমায় ঘিরে
মায়ের পায়ের ফুল কুড়িয়ে বেঁধেছি মোর শিরে॥
মা’র চরণামৃত খেয়ে
অমৃতে প্রাণ আছে ছেয়ে,
দুঃখ অভাব ভাবনার ভার দিয়েছি মা ভবানীরে॥
তারা নামের নামাবলী জড়িয়ে আমার বুকে,
মায়ের কোলে শিশুর মত ঘুমাই পরম সুখে।
মা’র ভক্তের চরণ ধূলি
নিয়েছি মোর বক্ষে তুলি
মায়ের পূজার প্রসাদ পেতে আমি আসি ফিরে ফিরে॥
*৮৪৩. তাল: কাহার্‌বা
লাম্ পম্ লাম্ পম্ লাম্ পম্ পম্ পম্ পম্ পম্ পম্ পম্।
দুর্বল ডান্সের লম্-ফম্, ফম্ ঝম্-ফম্ ভুড়ি কম্‌পম্
মারে ডম্‌ফাই দিল্লী বোম্বাই হনুলুলু হংকং॥
বাঁশের কঞ্চি এগার ইঞ্চি নাচে মেমের বোন্‌ঝি,
হ্যাঁদা-খ্যাঁদার পরান ছ্যাঁদা, ভিজল ঘামে গেঞ্জি,
তার ভিজল ঘামে গেঞ্জি।
কেৎরে চক্ষু দেখে মট্‌কু, আরে ও-চামারু ছক্‌কু-
সে চোম্‌ড়ায় দাড়ি গুম্‌ফম্॥
ল্যাংড়া-লেংড়ি হিল্লায় ঠেংরি, উস্‌খুস্ করে চ্যাংড়া-চেংড়ি।
যেন এই ট্যাংরার হাটে গল্‌দা চিংড়ি ঝুড়িতে খেলে পিং-পং॥
*৮৪৪. তাল: কাহার্‌বা
স্ত্রী : সই কই লো আমার ঘর নিকোবার ন্যাতা।
পুরুষ : আহা ন্যাতা নয় শীতের কাঁথা এই যে আমি হেথা॥
স্ত্রী : সই-লো ওলো সই, আমার ছাই ফ্যালবার ভাঙা কুলো কই?
পুরুষ : কুলোর বাতাস চুলোর ছাই
স্বামী বলো কিম্বা ভাই, (ওলো) এই যে তোমার আমি।
উভয়ে : মিলেছি রাজ যোটক দুয়ে
পুরুষ : গিঁটে বাত ওরে বাবা রে বাবা গিঁটে বাত
স্ত্রী : আর ফিকের ব্যথা, ওরে মা রে, মা আর ফিকের ব্যথা॥
ওলো সই বাপের বাড়ি যাব আমি এ ঘরে রব না,
পুরুষ : দেখো পুরুষের রাগ করে আনাগোনা
আমিও যাব শ্বশুর বাড়ি, ওরে রেমো নিয়ে আয় ব্যাগ ছাতা।
উভয়ে : নথে এবং নাথে এম্‌নি যুদ্ধ।
পুরুষ : গুঁতোগুতি
স্ত্রী : জড়াজড়ি
পুরুষ : ছাতা-ছড়ি
স্ত্রী : খুনতি-বেড়ী
উভয়ে : হাতা॥
*৮৪৫. তাল: ফের‌ িতা (দ্রুত-দাদ্‌রা ও কাহার্‌বা)
ওরে আজ ভারতের নব যাত্রা পথের
বাঁশি বাজলো, বাজলো বাঁশি
ফেলে তরুর ছায়া ভুলে ঘরের মায়া
এলো তরুণ পথিক ছুটে রাশি রাশি॥
তারা আকাশকে আজ চাহে লুটে নিতে
তারা মন্থর ধারায় চাহে দুলিয়ে দিতে
তারা তরুণ তরুণ প্রাণ জাগায় মৃতে
সাহস জাগায় চিতে তাদের অট্টহাসি॥
মোরা প্রাচীরের পরে রে প্রাচীর তুলে
ভাই হয়ে ভাইকে হায় ছিলাম ভুলে।
আজ ভেঙে প্রাচীর হল ঘরের বাহির
একই অঙ্গনে দাঁড়ালো উন্নত শির
এলো মুক্ত গগন তলে প্রাণ পিয়াসি
এলো তরুণ পথিক ছুটে রাশি রাশি॥
*৮৪৬. তাল: কাহার্‌বা
পুরুষ : কোথায় গেলে পেঁচা-মুখি একবার এসে খ্যাচ-খ্যাচাও
স্ত্রী : বলি, গাই-হারা বাছুরের মতন গোয়াল থেকে কে চ্যাঁচাও॥
পুরুষ : (বলি ও শাকচুন্নি, আহাহাহা)
অমন শ্যাওড়া বৃক্ষ ফেলে, আমার ঘাড়ে কেন এলে গো, ও হো হো
স্ত্রী : (বলি ও কালিয়া পেরেত)
তুমি উনুন-মুখো দেবতা যে তাই
ছাই-পাঁশের নৈবিদ্যি পাও।
পুরুষ : (মরি অরি অরি অরি মরি, কি যে রূপের ছিরি, আহাহাহাহা)
চন্দ্র-বদন ন্যাপা পোছা
কুতকুতে চোখ নাকটি বোঁচা গো, ও হো হো
স্ত্রী : (বলি ও বেরসো কাট, বলি ও কালো হুলো)
তুমি কাঁদলে চোখে কালি বোরোয় কয়লার ডিপোয় লজ্জা দাও
তুমি কয়লার ডিপোয় লজ্জা দাও।
পুরুষ : বলি ও জুজুবুড়ি
স্ত্রী : বলি ও ঝাঁকাভুঁড়ি
পুরুষ : ও বাবা জুজু
স্ত্রী : ও বাবা ঝাঁকা
পুরুষ : আহা, চাম্‌চিকে ওই ডানা কাটা
স্ত্রী : তুমি যেন পূজোর পাঁঠা
পুরুষ : আহা, হার মেনে যায় হাঁড়ি চাঁছা প্রিয়ে যখন খ্যাচ-খ্যাচাও।
স্ত্রী : (আ-মরি মরি, কি যে বচন সুধা)
পিঁপড়ে ধরবে ও প্রাণনাথ তুমি, শিগ্‌গির মুখে ফিনাল দাও॥
*৮৪৭. রাগ: মালগুঞ্জ, তাল: ত্রিতাল
গুঞ্জা মালা গলে কুঞ্জে এসো হে কালা
বনমালী এসো দুলায়ে বনমালা॥
তব পথে বকুল ঝরিছে উতল বায়ে
দলিয়া যাবে বলে অকরুণ রাঙা পায়ে
রচেছি আসন তরুণ তমাল ছায়ে
পলাশ শিমুলে রাঙা প্রদীপ জ্বালা॥
ময়ূরে নাচাও তুমি তোমারি নূপুর তালে
বেঁধেছি ঝুলনিয়া ফুলেল কদম ডালে
তোমা বিনা বনমালী বিফল এ ফুল দোল
বাঁশি বাজাবে কবে উতলা ব্রজবালা॥
*৮৪৮. তাল: ফের্‌তা
পুরুষ : ঘরে কে গো? বলি ঘরে কে, শালাজ নাকি?
এ যে মোর গোয়ালের গাই।
স্ত্রী : ও ছোট ঠাকুর ঝি, ওলো আয় আয়,
দেখে যা এসেছে নন্দাই। এ যে মোর ননদের ভাই।
পুরুষ : দেখ, রাত্রি জেগে গুনব কত চালের কড়ি কাঠ
স্ত্রী : তাইতো, আগে হয়নি সারা আমার ঘর কন্নার পাট।
পুরুষ : তোমার কাজের মাথায় মারো লাঠি
স্ত্রী : আমি নিয়ে শীতল পাটি মাস-শাশুড়ির পা টিপিতে যাই।
পুরুষ : ওগো শুনছো! শোনো শোনো শোনো না- সত্যি সত্যি চললে,
নতুনতর ঝুমকোর এক নমুনা এনেছি (আমি)।
স্ত্রী : অ্যা, তাই নাকি!
পুরুষ : হ্যা-গো-হ্যা।
স্ত্রী : কাল চাল ডাল বাছবো, চল এই আমি আসিতেছি
ওগো এই আমি আসিতেছি
পুরুষ : না না, ও তোমায় পা টিপিতে বলেছিলেন কি ভাবিবেন মাসি
স্ত্রী : আমার গা করছে বমি বমি তাকে বলে আসি।
পুরুষ : এমন শ্যাকরার মত বিন্দে দূতি কলিকালের বৃন্দাবনে নাই॥
বেঁচে থাক বাবা শ্যাকরার পো হুল্লোড় ঘটালে তবে ছাড়লে॥
*৮৪৯. রাগ: জয়জয়ন্তী-খাম্বাজ, বৈতালিক
ছাড়িতে পরান নাহি চায় তবু যেতে হবে হায়
মলয়া মিনতি করে তবু কুসুম শুকায়॥
রবে না এ মধুরাতি
জানি তবু মালা গাঁথি
মালা চলিতে দলিয়া যাবে তবু চরণে জড়ায়॥
যে কাঁটার জ্বালা সয়ে
উঠে ব্যথা ফুল হয়ে
আমি কাঁদিব সে-কাঁটা লয়ে নিশীথ বেলায়॥
নীরবে রবে যবে পরবাসে
আমি দূর নীল আকাশে
জাগিব তোমারি আশে নূতন তারায়॥
*৮৫০. রাগ: ভৈরবী, তাল: কাহার্‌বা
ডেকে ডেকে কেন তারে ভাঙালি ঘুমের ঘোর
কেন ভাঙালি
স্বপনে মোর এসেছিল, সখি, স্বপন কুমার মনচোর
কেন ভাঙালি ঘুমের ঘোর॥
সে যেন লো পাশে ব’সে কহিল হেসে হেসে
‘যাব না আর পরদেশে, সখি, মোছ মোছ আঁখিলোর’ ॥
দেখালো তার হৃদয় খুলি’, কহিল; হের প্রিয়ে
তোমার অধিক ব্যথা হেথায় তোমারে ব্যথা দিয়ে।’
জানি না মোর হিয়ার চেয়েও অধিক ক্ষত তার হৃদয়
সে হৃদয়ে আমার ছবি, সকল হিয়া আমি-ময়।
তাহার জীবন-মালারি মাঝে, সখি, আমি যেন সোনার ডোর॥
আমি কহিনু, বুঝেছি সখা তোমার এ দুখ দেওয়ার ছল,
ভালোবাসার ফুল না শুকায় তুমি তাই চাহ মোর চোখেরই জল’।
জেগে দেখি কেঁদে কেঁদে, সখি ভিজেছে বুকের আঁচল॥