মোতাহার হোসেন-কে

পদ্মা
২৪.২.২৮ সন্ধ্যা
(
Vulture স্টিমার)

প্রিয় মোতাহার!
    আমার কেবলই মনে পড়ছে (বোধ হয় ব্রাউনিং-এর) একটি লাইন, –
'So very mad, so very bad, so very sad it was, – yet it was sweet!"
   
আর, মনে হচ্ছে, ছোট্ট দুটি কথা – ‘সুন্দর’ ও ‘বেদনা’। এই দুটি কথাতেই আমি সমস্ত বিশ্বকে উপলব্ধি করতে পারি।...
    ‘সুন্দর’ ও ‘বেদনা’ , এ দুটি পাতার মাঝখানে একটি ফুল – বিকশিত বিশ্ব। একটি মক্ষী-রাণী, তাকে ঘিরেই বিশ্বের মধুচক্র
    বাগানের মালি রাতদিন লাঠি নিয়ে বাগান আগলে আছে? বেচারা মানুষ তাকে ডিঙিয়ে যেতে পারে না। মমাছি তার মাথার ওপর দিয়ে গজল-গান গেয়ে বাগানে ঢোকে, সুন্দরের মধুতে ডুবে যায়, অস্ফুট কুঁড়ির কানে বিকাশের বেদনা জাগায়, প্রস্ফুটিত যে – তাকে ঝরে পড়ার গান শোনায়; তার এতটুকু বাধে না, দেহে না, মনেও না। বেচারা মালি – যেন অঙ্কশাস্ত্রী মশাই! হাঁ করে তাকিয়ে দেখে, আর ম-মক্ষীর চরিত্রের এবং ‘আরো কত কি’-র সমালোচনা জুড়ে দেয়। ম-মক্ষী কিছু শোনে না, সে কেবলই গান করে – সুন্দরের স্তব সে গান। তাকে মারো, সে সুন্দরের স্তব করতে করতেই মরবে।
    কোনো দ্বিধা নেই, ভয় নেই। তাকে আবার বাঁচিয়ে ছেড়ে দাও, সে আবার সুন্দরের স্তব করবে, আবার বাগানে ঢুকে ফুলের পরাগে অন্ধ হয়ে ভগ্নপক্ষ হয়ে মরবে।
    সুষমা-লক্ষ্মীর বাগান আগলে বসে আছে নীতিবিদ বুড়ো সামাজিক হিতকামীর দল, - স্টার্ন, রিজার্ভ, রিজিড, ডিউটিফুল! কত বড়ো বড়ো বিশেষণ তাদের সামনে ও পেছনে! তারা সর্বদা এই ‘পোজ’ নিয়ে বসে আছে যে, তারা যদি না থাকত, তাহলে একদিনে এই জগৎটা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ত, একটা ভীষণ ওলটপালট হয়ে যেত। - বেচারা! দেখলে দয়া হয়।
    এদের মাঝেই – হয়তো কোটির মাঝে একটি – আসে সুন্দরের ধেয়ানী, কবি। সে রিজার্ভ নয়, ডিউটিফুল নয়, সে কেবলই ভুল করে, সে কেবলই
Falls upon the thorns of life, he bleeds! সে সমস্ত শাসন সমস্ত বিধি নিষেধের ঊর্ধ্বে উঠে সুন্দরের স্তব গান করে skylark-এর মতো। সে কেবলই বলে, ‘সুন্দর – বিউটিফুল!’ মিলটনের স্বর্গের পাখির মতো তার পা নেই, সে ধুলার পৃথিবী স্পর্শও করে না।...
    কবি এবং ম-মক্ষী। বিশ্বের মধু আহরণ করে মধুচক্র রচনা করে গেল এরাই।
    কোকিল, পাপিয়া, ‘বউ-কথা-কও’, ‘নাইটিঙ্গেল’, ‘বুলবুল’ – ডিউটিফুল বলে এদের কেউ বদনাম দিতে পারেনি। কোকিল তার শিশুকে রেখে যায় কাকের বাসায়, পাপিয়া তার শিশুর ভার দেয় ছাতার পাখিকে, ‘বউ-কথা-কও’ শৈশব কাটায় তিতির পাখির পক্ষপুটে! তবু, আনন্দের গান গেয়ে গেল এরাই। এরা ছন্নছাড়া, কেবলই ঘুরে বেড়ায়, শ্রী নাই, সামঞ্জস্য নাই, ব্যালেন্স-জ্ঞান নাই; কোথায় যায়, কোথায় থাকে – ভ্যাগাবন্ড একের নম্বর! ইয়ার ছোকরার দল! তবু এরাই তো স্বর্গের ইঙ্গিত এনে দিল, সুন্দরের বৈতালিক, বেদনার ঋত্বিক – এই এরাই, শুধু এরাই! কবি আর বুলবুল
    কবি আর বুলবুল পাপ করে, তারা পাপের অস্তিত্বই মানে না বলে। ভুল করে – ভুলের কাঁটায় ফুল ফোটাতে পারে বলে।
    আমার কেবলই সেই হতভাগিনির কথা মনে পড়ছে – যার ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে ‘ডিউটিফুল’, আর পায়ের তলায় প্রস্ফুটিত শতদলের মতো ‘বিউটিফুল’। পায়ের তলার পদ্ম – তার মৃণাল কাঁটায় ভরা, দুর্দিনে তার দল ঝরে যায়, পাপড়ি শুকিয়ে পড়ে – তবু সে সুন্দর! দেবতা গ্রেট হতে পারে – কিন্তু সুন্দর নয়। তার আর সব আছে, চোখে জল নেই।
    তুমি মনে করতে পার মোতাহার – আমারই চিরজনমের কবি-প্রিয়া আমারই বুকে শুয়ে কাঁদছে তার স্বর্গের দেবতার জন্য! মনে করো – সে বলছে আমায় – মাটির ফুল, আর তার দেবতাকে – আকাশের চাঁদ! আচ্ছা এমনি করে তোমায় কেউ বললে তুমি কী করতে বলো তো!
    আমার কথা স্বতন্ত্র। আমি এক সঙ্গে কবি এবং নজরুল। কথা শুনে কবি খুশি হয়ে উঠল – বললে – এই বেদনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ তুমি, ‘তোমায়’ –এর ঊর্ধ্বে, তোমার দেবতারও ঊর্ধ্বে নিয়ে যাব আমি – আমি তোমায় সৃষ্টি করব।
    কিন্তু নজরুল কেঁদে ভাসিয়ে দিলে। মনে হল সারা বিশ্বের অশ্রুর উৎসমুখ যেন তার ওই দুটো চোখ। নজরুলের চোখে জল! খুব অদ্ভুত শোনাচ্ছে, না? এই চোখের দু-ফোঁটা জলের জন্য কত চাতকই না বুক ফেটে মরে গেল! চোখের সামনে!
    তুমি ভাবছ – আমি কী হেঁয়ালি! কী সব বলছি – যার মাথামুণ্ডু কিছু খুঁজে পাবে না। সত্যিই পাবে না। বুকের গোলকধাঁধায় কখনও ঢুকেছ কি বন্ধু? ওর পথ নেই, সমাধান নেই, মাথামুণ্ডু মানে – কিচ্ছু না!
    ওর মাঝে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে শিশুর মতো কাঁদা ছাড়া আর কোনো কিছু করবার নেই! তুমি হয়তো পরজন্ম মান না, তুমি সত্যান্বেষী গণিতজ্ঞ। কিন্তু আমি মানি – আমি কবি।
    আমি বিশ্বাস করি যে, আমায় এমন করে চোখের জলে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে – সে আমার আজকের নয়, সে আমার জন্ম-জন্মান্তরের, লোক-লোকান্তরের দুখ-জাগানিয়া। তার সাথে নব নব লোকে এই চোখের জলে দেখা এবং ছাড়াছাড়ি।
    তুমি হয়তো মনে করছ – বেচারা শেলি, বেচারা কিটস, বেচারা নজরুল! কেঁদেই মরল।
    রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন, ‘দেখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলির মতো, কিটস-এর মতো খুব বড়ো একটা
tragedy আছে, তুই প্রস্তুত হ!’ জীবনে সেই ট্র্যাজেডি দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারণে অন্যের জীবনকে অশ্রুর বরষায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছি, কিন্তু আমারই জীবন রয়ে গেছিল বিশুষ্ক মরুভূমির মতো তপ্ত-মেঘের ঊর্ধ্বে শূন্যের মতো। কেবল হাসি কেবল গান! কেবল বিদ্রোহ – যে বিপুল সমুদ্রের উপরে এত তরঙ্গোচ্ছ্বাস, এত ফেনপুঞ্জ, তার নিস্তরঙ্গ নিথর অন্ধকার-তলার কথা কেউ ভাবে না। তাতে কত বড়ো বড়ো জাহাজ-ডুবি হল, সেইটেরই হিসেবে রাখলে শুধু, – আর সে যে কত বড়ো বড়ো জাহাজ-ডুবি হল, সেইটেরই হিসেবে রাখলে শুধু, – আর সে যে কত যুগ ধরে আপনার অতল তলায় বসে কেবলই শুক্তির পর শুক্তির বুকে মুক্তামালা রচনা করে গেল এবং আজ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে রইল তার সেই মুক্তামালা , – এ খবর কেউ রাখলে না।
    ফরহাদ, মজনু, চন্দ্রাপীড়, শাজাহান – এরা যেন এক একটা দৈত্য-শিশু। কিন্তু স্বর্গকে আজও ম্লান করে রেখেছে এরাই। – ফরহাদ পাগলটা শিরিঁর কথায় একটা গোটা পাহাড়কেই কেটে ফেললে। পাহাড়ের সব পাথর শিরিঁ হয়ে উঠল। প্রেমিকের ছোঁয়ায় পাহাড় হয়ে উঠল ফুলের স্তবক। পাষাণের স্তবগান উঠল ঊর্ধ্বে। কোথায় স্বর্গ! কোন তলায় রইল পড়ে!
    লায়লি – সাধারণ মেয়ে, মজনুঁ তাকে এমন করে সৃষ্টি করে গেল, যেমন করে – দেবতা তো দূরের কথা, ভগবানও সৃষ্টি করতে পারে না!
    শাজাহান – আরেক ফরহাদ! মোমতাজকে শিরিঁর মতো অমর করে গেল তাজমহলের মহাকাব্য রচনা করে। তাজমহল – যেমন নির্বাক ভাস্করের পাষাণ স্তব! মর্মরের মহাকাব্য!
    এইখানেই মানুষ স্রষ্টাকে হার মানিয়েছে।
    আমি চাচ্ছিলাম এই দুঃখ, এই বেদনা। কত দেশ-দেশান্তরে, গিরি-নদী-বন-পর্বত-মরুভূমি ঘুরেছি আমার এই অশ্রুর দোসরকে খুঁজতে। কোথাও ‘দেখা পেয়েছি – এই আনন্দের বাণী উচ্চারিত হয়নি আমার মুখ দিয়ে।
    তাই তো এবারকার তীর্থযাত্রাকে আমি বারেবারে নমস্কার করেছি। এতদিনে আমি যেন আপনাকে খুঁজে পেলাম। এবারে আমি পেয়েছি – প্রাণের দোসর বন্ধু তোমায় এবং চোখের জলের প্রিয়াকে।
    আর আজ লিখতে পারলাম না বন্ধু! বালিশ চেপে বুকের যন্ত্রণার উপশম হয়?

তোমার
– নজরুল