বিষয়: নজরুলসঙ্গীত
কালানুক্রমিক সংখ্যা ১৩৯
গান সংখ্যা: ২০৯
শিরোনাম:
এ নহে বিলাস বন্ধু ফুটেছি জলে কমল
রাগ: মান্দ, তাল: কাহার্‌বা।
এ নহে বিলাস বন্ধু ফুটেছি জলে কমল
এ যে ব্যথা রাঙা হৃদয় আঁখি জলে টলমল॥
কমল মৃণাল দেহ ভরেছে কণ্টক ঘায়
শরণ লয়েছি গো তাই শীতল দীঘির জল॥
ডুবেছি আজ কালো জলে কত যে জ্বালা স'য়ে
শত ব্যথা ক্ষত লয়ে হইয়াছি শতদল॥
কবি রে কোন্ ক্ষত মুখে ফোটে যে তোর গীত সুর
সে ক্ষত দেখিল না কেউ দেখিল তোরে কেবল
সে গীতি দেখিল না কেউ শুনিল গীতি কেবল॥

ভাবসন্ধান: কবির বেদনাবিধুর অভিমানী কবির আত্মকথনমূলক গান। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কবি, শতদলের মতো বিকশিত হয়েছেন, এটি সহজাত আনন্দে সরোবরে ফুটে উঠা পদ্মফুলের মতো নয়। নানা ঘাত প্রতিঘাতের ভিতর দিয়ে তাঁর এই প্রকাশ। তাঁর ব্যথাতুর হৃদয়বেদনা তাঁকে অশ্রুজল করেছে। তিনি তাঁর চারপাশের গুণমুগ্ধ শ্রোতাদের 'বন্ধু' সম্বোধনে সেই অভিমানের কথাই এই গানে উপস্থাপন করেছেন।

গানটির প্রথম ও দ্বিতীয় অন্তরাতে ফুটে উঠেছে, বেদনার সরোবরে বিকশিত পদ্মফুলের রূপকতায় তাঁর সৃজনশীল সত্তার উদ্ভাসনের কথা। কবি তাঁর পদ্মফুল হয়ে ফুটে ওঠার অবলম্বনকে মৃণাল দেহের (পদ্মফুলের ডাঁটা) সাথে তুলনা করেছেন। যে জীবনযাপনের ভিতর দিয়ে কবি বিকশিত হয়েছেন, তা আনন্দময় কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বহুবিধ আঘাতের দ্বারা তিনি জর্জরিত হয়েছেন। সে আঘাতের যন্ত্রণা সহ্য করার জন্য তিনি শীতল দীঘির মতো প্রশান্তিময় জীবনকে বেছে নিয়েছেন। তারপরেও বেদনাদগ্ধ জীবনের শতযন্ত্রণার ক্ষত নিয়ে, কবি নিজেকে সৃষ্টির শত পাপড়িতে মেলে দিয়েছেন। তাই নিজেকে শতদল (পদ্মফুলের অপর নাম) নামে অভিহিত করেছেন।

শেষ অন্তরাতে, অভিমানী কবির ভিন্নতর যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে। নানাভিত যন্ত্রণার অভিঘাতে তিনি রচনা করেছেন নানা সুরের গান। কিন্তু সে বেদনাকে কউ অনুভব করে না। সে বেদনার সুরটুকু কেউ উপলব্ধিতে আনে না। শুধু তাঁর গানটুকু শুনেই পরিতৃপ্ত হয়।

সুরের বিচারে গানটি গজল আঙ্গিকের। পারশ্যের মরমীকবিদের গভীর আত্মদর্শনের ভিতর দিয়ে স্রষ্টাকে চেনার গম্ভীর চলন এই গানে পাওয়া যায়। নজরুল সে ভঙ্গীটি তুলে এনেছেন এই গানে, শুধু বিষয় আলাদা। এই গানে রয়েছে মৃদু কোমল দোলা, যা বেদনাকে তরঙ্গিত প্রবাহের সঞ্চালিত করে।

ক. রচনাকাল ও স্থান:  গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে প্রকাশিত হয়েছিল 'বুলবুল' নামক সঙ্গীত-সংকলনের দ্বিতীয় সংস্করণ। এই সংস্করণে নতুন গান হিসেবে এই গানটি যুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ২৯ বৎসর ১০ মাস।