বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: পাঠাও বেহেশত হ’তে হজরত্ পুন সাম্যের বাণী
পাঠাও বেহেশত হ’তে হজরত্ পুন সাম্যের বাণী,
(আর) দেকিতে পারি না মানুষে মানুষে এই হীন হানাহানি॥
বলিয়া পাঠাও, হে হজরত
যাহারা তোমার প্রিয় উম্মত,
সকল মানুষে বাসে তা’রা ভালো খোদার সৃষ্টি জানি’ –
সবারে খোদারই সৃষ্টি জানি॥
আধেক পৃথিবী আনিল ঈমান (তোমার) যে উদারতা-গুণে,
শিখিনি আমরা সে-উদারতা, (কোরানে হাদিসে) কেবলি গেলাম শুনে’।
তোমার আদেশ অমান্য ক’রে
লাঞ্ছিত মোরা ত্রিভুবন ভ’রে,
আতুর মানুষে হেলা ক’রে বলি, ‘আমার খোদারে মানি’॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে ইসালামী আদরশে মানবসমাজে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, উদারতা ও মানবপ্রেম পুনঃপ্রতিষ্ঠার
জন্য বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। মানুষের মধ্যে বিভেদ, হিংসা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার দৃশ্য দেখে কবি ব্যথিত হয়ে নবীজির কাছে প্রার্থনা করেছেন, যেন তাঁর সাম্যের চিরন্তন বাণী আবার মানবজাতিকে আলোকিত করে।
মানুষের মধ্যে বিভেদ, হিংসা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার দৃশ্য দেখে হতাশগ্রস্থ কবি
এইগানের মাধ্যমে কবি বেহেশতে অধিষ্ঠিত বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অনুরোধ করেছেন-
যেন তিনি সাম্যের বাণী পুনরায় পৃথিবীতে পাঠান। যাতে তিনি আবার মানুষকে সত্য, ন্যায়, সাম্য ও শান্তির পথ দেখান। এখানে নবীজির পুনরাগমনের কথা আক্ষরিক অর্থে নয়; বরং তাঁর আদর্শ, শিক্ষা ও মানবকল্যাণের বাণীর পুনর্জাগরণের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
গানের পরবর্তী অংশে কবি স্মরণ করিয়ে দেন যে, নবীজির প্রকৃত উম্মত সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টিকে ভালোবাসে। কারণ প্রত্যেক মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি। তাই জাতি- বর্ণ-ধর্মের ভেদাভেদ না করে সকল মানুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। মানবপ্রেমই আল্লাহ'র প্রেমের অন্যতম প্রকাশ—এই সত্যই এখানে ব্যক্ত হয়েছে।
এরপর কবি স্মরণ করেছেন নবীর মহিমাকে। যাঁর অসাধারণ উদারতা, ন্যায়বোধ ও মানবিক গুণের আকর্ষণে বিশ্বের অর্ধেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাঁর অনুসারীদের অনেকেই সেই উদারতার আদর্শ বাস্তব জীবনে ধারণ করতে পারেন নি। তাঁরা কেবল ধর্মগ্রন্থের বাণী শুনেছেন, কিন্তু তার প্রকৃত শিক্ষা—মানবপ্রেম, সহিষ্ণুতা ও ন্যায়পরায়ণতা—জীবনে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
গানের শেষাংশে কবি আত্মসমালোচনার সুরে বলেন, নবীজির আদেশ অমান্য করার কারণেই মুসলমানরা বিশ্বে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছে। অথচ তারা অসহায় ও দুঃখী মানুষের প্রতি অবহেলা করে মুখে বলে,
'আমরা আল্লাহকে মানি।' কবি এখানে স্পষ্টভাবে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষের সেবা, দুঃখী ও অসহায়ের প্রতি সহমর্মিতা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা ছাড়া কেবল মুখে ধর্মের দাবি করা প্রকৃত ঈমানের পরিচয় নয়।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৫) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ:
- বনগীতিকা
- দ্বিতীয় সংস্করণ [১৩৫৯ বঙ্গাব্দের
১১ই জ্যৈষ্ঠ (২৫ মে, ১৯৫২)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক
১৪১৯, নভেম্বর ২০১২।
বনগীতি দ্বিতীয় খণ্ড। ৫।
পৃষ্ঠা ১১৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
১৫৫৪ সংখ্যক গান]
- রেকর্ড: এইচএমভি [মার্চ ১৯৩৯ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৫)। এন ১৭২৬৪। শিল্পী
আব্দুল গফুর। সুর: নজরুল]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল। প্রার্থনা