বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ফিরি পথে পথে মজনুঁ দীওয়ানা হয়ে
ফিরি পথে পথে মজনুঁ দীওয়ানা হয়ে।
বুকে মোর এয়্ খোদা তোমারি এশ্ক ল'য়ে॥
তোমার নামের তস্বিহ্ ল'য়ে ফিরি গলে
দুনিয়াদার বোঝে না মোরে পাগল বলে,
ওরা চাহে ধনজন, আমি চাহি প্রেমময়ে॥
আছ সকল ঠাঁয়ে শু'নে বলে সবে
এমনি চোখে তোমার দিদার কবে হবে
আমি মনসুর নহি যে পাগল হব 'আনাল্ হক' ক'য়ে॥
তোমার হবিরের আমি উম্মত্ এয়্ খোদা
তাই ত দেখিতে তোমায় সাধ জাগে সদা,
আমি মুসা নহি যে বেহোঁশ্ হয়ে পড়ব ভয়ে॥
তোমারি করুণায় যাবই তোমায় জেনে
বসাব মোর হেদে তোমার আর্শ এনে,
আমি চাই না বেহেশ্ত, র'র বেহেশতের মালিক ল'য়ে॥
- ভাবনুসন্ধান: এই গানে একজন সত্যসন্ধানী সুফি-সাধকের অন্তর্জগতের প্রেম, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহ্র সান্নিধ্যলাভের আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে কবি নিজেকে মজনুঁ-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন মজনুঁ লাইলার প্রেমে সংসারবিস্মৃত হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, তেমনি কবিও আল্লাহ্র প্রেমে আত্মহারা হয়ে তাঁর প্রেম (ইশ্ক-ই-ইলাহী) বুকে ধারণ করে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়ান। এ প্রেম কোনো পার্থিব প্রেম নয়; এটি সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিবেদিত আত্মার গভীরতম ভালোবাসা।
কবি গলায় তসবিহ ধারণ করে সর্বদা আল্লাহ্র নাম জপ করেন। কিন্তু জাগতিক মানুষ তাঁর এই আধ্যাত্মিক অবস্থাকে বুঝতে পারে না; তারা তাঁকে পাগল বলে উপহাস করে। কারণ সাধারণ মানুষ ধন-সম্পদ, মান-সম্মান ও ভোগ-বিলাসের আকাঙ্ক্ষায় জীবন কাটালেও কবির একমাত্র কামনা আল্লাহ্র প্রেম। এখানে পার্থিব আকাঙ্ক্ষা ও আধ্যাত্মিক প্রেমের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে।
এরপর কবি আল্লাহ্র সর্বব্যাপী অস্তিত্বের প্রসঙ্গ এনেছেন। সবাই বলে, আল্লাহ্ সর্বত্র বিরাজমান; কিন্তু তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করা কীভাবে সম্ভব- সেই প্রশ্ন কবির অন্তরে জাগে। এ প্রসঙ্গে তিনি সুফি সাধক মানসুর আল-হাল্লাজ-এর বিখ্যাত উক্তি
'আনাল হক' (আমিই সত্য)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। মানসুর ঈশ্বরপ্রেমে আত্মবিস্মৃত হয়ে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেন। কিন্তু কবি বিনম্রভাবে বলেন, তিনি মানসুরের মতো সেই দাবি করতে চান না; তাঁর পথ অহংকারের নয়, বরং বিনয়, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের।
পরবর্তী স্তবকে কবি নিজেকে মহানবী মুহাম্মদ-এর একজন উম্মত বা অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। সেই কারণেই আল্লাহ্কে দেখার আকাঙ্ক্ষা তাঁর অন্তরে সদা জাগ্রত।
একই সঙ্গে তিনি মূসা-এর ঘটনাকে স্মরণ করেন। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, নবী মূসা আল্লাহ্র তাজাল্লি বা মহিমার আভাস সহ্য করতে না পেরে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। কবি বলেন, তিনি মূসার মতো ভয়ে অচেতন হতে চান না; বরং প্রেম ও করুণার মাধ্যমে আল্লাহ্কে জানতে ও উপলব্ধি করতে চান।
গানের শেষাংশে কবি তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য ব্যক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আল্লাহ্র করুণার দ্বারাই একদিন তিনি তাঁকে সত্যভাবে জানতে পারবেন এবং তাঁর আরশের নূর বা ঐশী সান্নিধ্য নিজের হৃদয়ে ধারণ করতে সক্ষম হবেন। তাঁর কামনা জান্নাতের ভোগ-বিলাস নয়; বরং জান্নাতের মালিক আল্লাহ্র সান্নিধ্য। এই ভাবনা সুফিবাদের অন্যতম মৌলিক আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে জান্নাত নয়, বরং আল্লাহ্র প্রেম ও তাঁর নৈকট্যই সাধকের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। '
গুলবাগিচা'
গীতি-সংকলনের প্রথম সংস্করণে [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩] গানটি
প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১ মাস
- গ্রন্থ:
-
গুলবাগিচা
- প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। পিলু-মিশ্র-কার্ফা। পৃষ্ঠা:
১০০]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা।
জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গুল-বাগিচা। গান সংখ্যা ৮১। পিলু-মিশ্র-কার্ফা। পৃষ্ঠা ২৭৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৫৭৪। রাগ: পিলু মিশ্র, তাল: কাহার্বা। পৃষ্ঠা:
৪৭১।]
- রেকর্ড: টুইন [জুলাই ১৯৩৩
(আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪০)। এফটি ২৬৭০। শিল্পী: তকরীমুদ্দীন আহমদ।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। সুফিবাদ। সাধক