বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বনে চলে বনমালি বনমালা দুলায়ে।
বনে চলে বনমালি বনমালা দুলায়ে।
তমালে কাজল-মেঘে শ্যাম-তুলি বুলায়ে॥
ললিত মধুর ঠামে
কভু চলে কভু থামে,
চাঁচর চিকুরে বামে -
শিখি-পাখা ঢুলায়ে॥
ডাকিছে রাখাল-দলে
'আয় রে কানাই' ব'লে,
ডাকে রাধা তরুতলে -
ঝুলনিয়া ঝুলায়ে॥
যমুনার তীর ধরি'
চলিছে কিশোর হরি,
বাজে বাঁশের বাঁশরি -
ব্রজনারী ভুলায়ে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে বৃন্দাবনের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে শ্রীকৃষ্ণের বনবিহার, তাঁর অপরূপ সৌন্দর্য, মধুর লীলাচাঞ্চল্য এবং বাঁশির সুরে সমগ্র ব্রজভূমির মোহিত হয়ে ওঠার চিত্র মাধুর্যরসের অপূর্ব ব্যঞ্জনায় প্রকাশিত হয়েছে। কবি শ্রীকৃষ্ণকে ‘বনমালী’ রূপে উপস্থাপন করেছেন—যিনি প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রেম, আনন্দ ও ভক্তির সুধা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
গানের শুরুতেই দেখা যায়, বনমালা ধারণ করে শ্রীকৃষ্ণ বনপথে বিচরণ করছেন। তমালবৃক্ষের শ্যামল ছায়ায় তাঁর নীলবর্ণ রূপ যেন কাজলমেঘের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। কবি এমন এক চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন, যেখানে কৃষ্ণ ও বৃন্দাবনের প্রকৃতির মধ্যে কোনো ভেদরেখা নেই। শ্যামবর্ণ কৃষ্ণ যেন প্রকৃতিরই এক জীবন্ত সৌন্দর্য।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি কৃষ্ণের মনোমুগ্ধকর গমনভঙ্গির বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি কখনও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেন, আবার কখনও থেমে যান। তাঁর কোঁকড়ানো কেশের পাশে শোভা পাচ্ছে ময়ূরপুচ্ছ। এই রূপলাবণ্য ও লাবণ্যময় ভঙ্গিমা কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়; বরং তা ঈশ্বরীয় মাধুর্যের প্রতীক, যা সকলের হৃদয়কে আকর্ষণ করে।
এরপর দেখা যায়, রাখালবন্ধুরা স্নেহভরে ‘আয় রে কানাই’ বলে তাঁকে ডাকছে। অন্যদিকে বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে রাধা ঝুলনদোল দুলিয়ে তাঁর প্রতীক্ষা করছেন। এই চিত্রে শ্রীকৃষ্ণের দুই ধরনের সম্পর্ক ফুটে উঠেছে—একদিকে রাখালসখাদের সহজ, নির্মল সখ্য, অন্যদিকে রাধার গভীর প্রেম ও প্রতীক্ষা। ঝুলনদোল এখানে মিলনের আহ্বান এবং প্রেমের আনন্দের প্রতীক।
গানের শেষাংশে শ্রীকৃষ্ণ যমুনার তীর ধরে বাঁশি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর বাঁশির সুরে ব্রজের নারীরা সংসারের সব কাজ ভুলে মুগ্ধ হয়ে পড়েন। বৈষ্ণব সাহিত্যে কৃষ্ণের বাঁশি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি পরমাত্মার আহ্বানের প্রতীক। সেই আহ্বান শুনে জীবাত্মা সংসারের মায়াবন্ধন ভুলে পরমপ্রেমের পথে আকৃষ্ট হয়। ব্রজনারীদের মোহিত হওয়া আসলে সেই আধ্যাত্মিক আকর্ষণেরই রূপক প্রকাশ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। 'গুলবাগিচা'
গীতি-সংকলনের প্রথম সংস্করণে [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩] গানটি
প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ১
মাস।
- গ্রন্থ:
-
গুলবাগিচা
- প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। কাফি-ঠুমরী। পৃষ্ঠা:
৬৬]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা।
জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গুল-বাগিচা। গান সংখ্যা ৫৯। কাফি-ঠুমরী। পৃষ্ঠা ২৬০]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৫৮০। রাগ: কাফি। পৃষ্ঠা: ৪৩৭।]
- রেকর্ড: মেগাফোন [জানুয়ারী ১৯৩৪ (পৌষ-মাঘ ১৩৪০)। জেএনজি ৯৪। শিল্পী
বাণী নিয়োগী]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা