বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:বাজিছে দামামা, বাঁধ রে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান
বাজিছে দামামা, বাঁধ রে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান।
দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার ভাঙা কিল্লায় ওড়ে নিশান॥
মুখেতে কল্মা হাতে তলোয়ার
বুকে ইসলামী জোশ্ দুর্বার,
হৃদয়ে লইয়া এশ্ক্ আল্লার –
চল্ আগে চল বাজে বিষাণ।
ভয় নাই তোর গলায় তাবিজ বাঁধা যে রে তোর পাক কোরান॥
নহি মোরা জীব ভোগ বিলাসের
শাহাদত ছিল কাম্য মোদের,
ভিখারির সাজে খলিফা যাদের –
শাসন করিল আধা জাহান।
তা’রা আজ প’ড়ে ঘুমায় বেহোঁশ্ বাহিরে বহিছে ঝড় তুফান॥
ঘুমাইয়া কাজা করেছি ফজর
তখনো জাগিনি যখন জোহর,
হেলা ও খেলায় কেটেছে আসর –
মাগরিবের আজ শুনি আজান।
জমাত-শামিল হও রে এশাতে এখনো জামাতে আছে স্থান॥
শুকনো রুটিরে সম্বল ক’রে
যে ঈমান আর যে প্রাণের জোরে,
ফিরেছি জগৎ মন্থর ক’রে –
সে-শক্তি আজ ফিরিয়ে আন।
আল্লাহু আকবর রবে পুন কাঁপুর বিশ্ব দূর বিমান॥
- ভাবসন্ধান: গানটি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামী জাগরণধর্মী রচনাগুলোর অন্যতম। এতে তিনি মুসলিম সমাজকে আত্মসমালোচনা, আত্মজাগরণ এবং আদর্শ ইসলামের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ধর্মীয় প্রতীক, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও রূপকের মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের অতীতের গৌরব স্মরণ করিয়ে বর্তমানের অবক্ষয় থেকে মুক্ত হয়ে নতুন যুগের নেতৃত্ব গ্রহণের ডাক দিয়েছেন।
গানের শুরুতেই কবি বিশ্ব জুড়ে মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনার যে জোয়ার এসেছে, কবি
যেন তাঁরই সঙ্কেত পেয়েছেন অন্তর্লোকে। তারই প্রেরণায় কবি অনুভব করেছেন যুদ্ধের
দামামা (রণবাদ্য) বাজছে। মুসলমানদের মাথায় পাগড়ি বেঁধে যুদ্ধের জন্য শির উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। এখানে "নয়া জামানার দাওয়াত" বলতে পরিবর্তিত সময়ের চ্যালেঞ্জ ও নতুন দায়িত্বকে বোঝানো হয়েছে। "ভাঙা কিল্লায় ওড়ে নিশান" রূপকটি মুসলিম সমাজের দুর্বল ও বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেও পুনর্জাগরণের সম্ভাবনার প্রতীক।
গানের পরবর্তী অংশে যোদ্ধাদের মুখে কালিমা, হাতে তলোয়ার এবং হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা- এই তিনের সমন্বয়ে আদর্শ ঈমান, সাহস ও আত্মত্যাগের শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে।
একই সাথে অভয় তাবিজ হিসেবে কোরআনকে আছে তাঁদের সাথে- এই বার্তা ঘোষণা করা হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি ইসলামের প্রথম যুগের আদর্শ মুসলমানদের স্মরণ করেছেন। তাঁরা ভোগ-বিলাসে নয়, বরং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গকে (শাহাদত) কাম্য মনে করতেন। ইসলামের খলিফাগণ ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত সরল ও সংযমী, অথচ ন্যায়, আদর্শ ও চরিত্রের শক্তিতে তাঁরা বিশ্বের বিরাট অংশে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে আজকের মুসলিম সমাজ আত্মতুষ্টি ও উদাসীনতায় নিমগ্ন- এই বাস্তবতার প্রতি কবি আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।
এরপর নামাজের সময়সূচিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে তিনি জীবনের অপচয়ের কথা বলেছেন। ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব ও এশা—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এখানে মানুষের জীবনপর্বের প্রতীক। কবি বোঝাতে চেয়েছেন, দীর্ঘ অবহেলায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়েছে; কিন্তু এখনও সম্পূর্ণ দেরি হয়ে যায়নি।
'এশার জামাতে এখনো স্থান আছে'- এই বাক্যে আশা ও অনুতাপের মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগের কথা বলা হয়েছে।
গানের শেষাংশে কবি ইসলামের প্রথম যুগের সংগ্রামী জীবনাদর্শের কথা স্মরণ করেন। অল্প আহার, অটল ঈমান, আত্মবিশ্বাস এবং ত্যাগের শক্তিতেই মুসলমানরা একসময় বিশ্বসভ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কবি সেই নৈতিক শক্তি, আত্মসংযম ও কর্মপ্রেরণা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন।
'আল্লাহু আকবর' ধ্বনি এখানে বিজয়, সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
মোহাম্মদী পত্রিকার 'ফাল্গুন ১৩৩৯' [চৈত্র ১৩৩৯ (মার্চ-এপ্রিল ১৯৩৩)] সংখ্যায় গানটি
প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩
বৎসর ১০
মাস।
- গ্রন্থ:
-
গুলবাগিচা
- প্রথম সংস্করণ [১৩ আষাঢ় ১৩৪০, ২৭ জুন ১৯৩৩। ইমন মিশ্র-একতালা। পৃষ্ঠা:
১০২-১০৩]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা।
জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গুল-বাগিচা। গান সংখ্যা ৮১। ইমন মিশ্র-একতালা। পৃষ্ঠা ২৭৬-২৭৭]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৬৩০। রাগ: ইমন মিশ্র, তাল: একতাল। পৃষ্ঠা:
৪৮৭-৪৮৮।]
- পত্রিকা
- মোহাম্মদী [চৈত্র ১৩৩৯ (মার্চ-এপ্রিল১৯৩৩)]
- মাসিক মোহম্মদী [৩০শ বর্ষ, ৮ম সংখ্যা।
জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৬ (মে-জুন
১৯৫৯)। কওমী গীতি। কথা ও সুর:
কাজী নজরুল ইসলাম। স্বর ও স্বরলিপি: মফিজুল ইসলাম। পৃষ্ঠা:
৬৪৯-৬৫০]
- রেকর্ড: মেগাফোন [মার্চ ১৯৩৪
(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০)। এন ৭২১২। শিল্পী
মোহাম্মদ কাসেম]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। উদ্দীপনা