বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
সকল জাতির সব মানুষের বন্ধু
সকল জাতির সব মানুষের বন্ধু, হে মোহসীন।
এ যুগে তুমিই শোধ করিয়াছ এক আল্লার ঋণ॥
ভোগ করনি ক’ বিপুল বিত্ত পেয়ে
ভিখারি হইলে শুধু আল্লারে চেয়ে,
মহাধনী হ’লে আল্লার কৃপা পেয়ে -
দুনিয়ায় তাই রহিলে কাঙাল দীন॥
মানুষের ভালোবাসায় দেখিলে আল্লার ভালোবাসা,
সৃষ্টির তরে কাঁদিয়া পুরালে তব স্রষ্টার আশা।
তব দান তাই ফুরায়ে নাহি ফুরায়
বিত্ত হইলে নিত্য এ দুনিয়ায়,
শিখাইয়া গেলে, মুসলিম তারে কয় -
অর্থ যাহারে কিনিতে পারে না যে নহে লোভ-মলিন॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মানবপ্রেম, দানশীলতা, সংযম, আত্মত্যাগ এবং লোভমুক্ত আদর্শ জীবনের প্রশংসা করা হয়েছে। মানুষের সেবা, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা এবং পার্থিব সম্পদের মোহ ত্যাগ করে নৈতিক আদর্শে জীবন গঠনই এই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসাধারণ মানবপ্রেম, উদারতা, আত্মত্যাগ এবং বৈরাগ্যময় জীবনাদর্শকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তিনি নবীকে কেবল মুসলমানদের নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির বন্ধু ও কল্যাণকামী হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
গানের শুরুতে কবি মহানবী (সা.)-কে ‘মোহসীন’ (মহান উপকারী, পরম কল্যাণকামী) বলে সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, নবী (সা.) এমন এক জীবনযাপন করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি এক আল্লাহর প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতার আদর্শকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর জীবন ছিল সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণের জন্য নিবেদিত।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি নবীর অনাসক্ত ও সংযমী জীবনের কথা স্মরণ করেন। মহানবী (সা.)-এর সামনে ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের সুযোগ থাকলেও তিনি কখনো ভোগবিলাসের পথ বেছে নেননি। বরং তিনি নিজেকে আল্লাহর মুখাপেক্ষী এক বিনয়ী বান্দা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে আধ্যাত্মিক মহিমা, সম্মান ও মর্যাদায় সর্বশ্রেষ্ঠ করেছিলেন, কিন্তু তিনি পার্থিব ঐশ্বর্যের মোহে আবদ্ধ হননি। তাই পৃথিবীর দৃষ্টিতে তিনি সহজ-সরল ও নিরহংকার জীবনযাপন করেছেন।
এরপর কবি নবীর মানবপ্রেমের মূল উৎস ব্যাখ্যা করেন। তিনি মানুষের প্রতি ভালোবাসার মধ্যেই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ দেখেছিলেন। মানুষের দুঃখ, কষ্ট ও দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। তিনি সমগ্র সৃষ্টির কল্যাণ কামনা করে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। এভাবেই তিনি তাঁর স্রষ্টার ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন। এখানে বোঝানো হয়েছে যে, প্রকৃত ঈমান কেবল ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সেবা ও কল্যাণেও তার প্রকাশ ঘটে।
গানটির শেষাংশে কবি বলেন, নবীর দান ও শিক্ষা কখনো নিঃশেষ হওয়ার নয়। তাঁর আদর্শ যুগে যুগে মানবসমাজকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। তিনি মানুষকে শিখিয়ে গেছেন যে, প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র লোভ, স্বার্থপরতা ও সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত। অর্থ দিয়ে যাকে কেনা যায় না, যে সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার কাছে অবিচল থাকে—সেই মানুষই প্রকৃত মুসলমান।
-
রচনাকাল ও স্থান:গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪১
খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে নভেম্বর (১৩ অগ্রহায়ণ ১৩৪৮), কলকাতায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম
ছাত্রলীগের উদ্যোগে ৮৬ নম্বর কলেজ স্ট্রিটস্থ ওভারটুন হলে (ওয়াইএমসিএ)
দানবীর
হাজী মোহাম্মদ মহসিনের (১৭৩২-১৮১২ খ্রিষ্টাব্দ) মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়।
উক্ত স্মরণ-সভায় আব্বাসউদ্দীন এই গানটি পরিবেশন করেছিলেন। এছাড়া গানটি
দৈনিক নবযুগ পত্রিকার '২৯শে নভেম্বর ১৯৪১, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৩৪৮' সংখ্যার
সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার তৃতীয় ও চতুর্থ কলামের মাঝখানে বক্স করে গানটি ছাপানো
হয়েছিল। ধারণা করা হয়, গানটি নজরুল এই স্মরণ-সভা'র জন্যই অগ্রহায়ণ মাসেই
রচনা করেছিলেন। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ:
-
শেষ সওগাত
- প্রথম সংস্করণ [২৫শে বৈশাখ ১৩৬৫ (বৃহস্পতিবার, ৪ মে ১৯৫৮)। শিরোনাম:
মহসিন স্মরণে। গান]
- নজরুল রচনাবলী ষষ্ঠ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, জুন ২০১২। শেষ সওগাত।
শিরোনাম: মহসিন স্মরণে। গান। পৃষ্ঠা ১০৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৭৫৫। পৃষ্ঠা: ৫২২]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল