বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: হে প্রবল দর্পহারী কৃষ্ণ-মুরারি
হে প্রবল দর্পহারী কৃষ্ণ-মুরারি।
শরণাগত আর্ত-পরিত্রাণ-পরায়ণ-
যুগ যুগ সম্ভব নারায়ণ দানবারি॥
ভূ-ভার হরণে এসো জনার্দন হৃষিকেশ,
কল্কীরূপে অধর্ম নিধনে এসো দনুজারি-
কংসারি গিরিধারী ডাকে ভয়ার্ত নরনারী॥
দুর্বল দীনের বন্ধু, জন-গণ ত্রাতা
নিঃস্বের সহায় পরমেশ বিশ্ব-বিধাতা,
তিমির-বিদারি এসো মহা-ভারত-বিহারী॥
এসো উৎপীড়িতের নীরব রোদনে এসো
এসো বীরের আত্মদানে প্রাণ-উদ্বোধনে এসো,
দেশ-দ্রৌপদীর লজ্জাহারী, দৈত্য-গর্ব-খর্ব-কারী-
শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মা-ধারী॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটি মূলত অত্যাচার, অধর্ম, ভয় ও দুর্বলতার অবসান ঘটিয়ে ন্যায়, সাহস ও মুক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রীকৃষ্ণের কাছে এক তীব্র আহ্বান। এখানে কৃষ্ণ কেবল পৌরাণিক দেবতা নন; তিনি অত্যাচারিতের আশ্রয়, দুর্বলের শক্তি, অধর্মবিনাশী এবং ন্যায়প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
এই গানে কবি কৃষ্ণকে অত্যাচারী ও অহংকারী শক্তির দর্পচূর্ণকারী হিসেবে আহ্বান করেছেন। যিনি অন্যায় ও শক্তির অহংকার বিনষ্ট করেন, সেই কৃষ্ণই শরণাগত ও বিপন্ন মানুষের রক্ষাকর্তা।
কবি মনে করেন যে মানুষ অসহায় হয়ে তাঁর শরণ নেয়, তাকে রক্ষা করাই তাঁর ধর্ম।
তিনি যুগে যুগে অবতার
রূপে আবির্ভুত হয়েছেন। যখন পৃথিবীতে অধর্ম ও অশান্তি বৃদ্ধি পায়, তখন
তিনি নানারূপে আবির্ভূত হয়ে ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন।
কবি পৃথিবী যখন অত্যাচারী ও অধার্মিক শক্তির ভারে ভারাক্রান্ত, তখন সেই ভার লাঘব করার জন্য কৃষ্ণের আবির্ভাব কামনা করেছেন। বিষ্ণুর দশাবতারের শেষ অবতার কল্কির প্রসঙ্গ এনে কবি সমকালীন অধর্ম ও অন্যায়ের বিনাশের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। কংসারি, গিরিধারী প্রভৃতি কৃষ্ণের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর অত্যাচার-বিনাশী ও রক্ষাকর্তা রূপ স্মরণ করা হয়েছে।
কৃষ্ণ এ গানে রাজশক্তির প্রতীক নন; তিনি বিশেষভাবে দুর্বল, দরিদ্র, নিঃস্ব ও নিপীড়িত মানুষের আশ্রয়। যাদের কোনো পার্থিব শক্তি বা সহায় নেই, তাদের জন্য
বিষ্ণুই পরম অবলম্বন।
কৃষ্ণকে তিনি 'তিমির-বিদারি এসো মহা-ভারত-বিহারী'
নামে আখ্যায়িত করেছেন। 'তিমির' এখানে শুধু অন্ধকার নয়; এটি অজ্ঞতা, ভয়, অন্যায়, পরাধীনতা ও হতাশার প্রতীক।
এখানে কৃষ্ণের আলো সেই অন্ধকার বিদীর্ণ করুক-
কবি এই প্রার্থনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
'মহাভারত-বিহারী' শব্দবন্ধে কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণের স্মৃতি জাগ্রত হয়েছে।
যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনকে কর্তব্য ও ধর্মের পথ দেখিয়েছিলেন।
গানের পরের অংশে পৌরাণিক আবেদনটি স্পষ্টভাবে সমকালীন দেশাত্মবোধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
'এসো উৎপীড়িতের নীরব রোদনে এসো'
বলে কৃষ্ণকে আহবান করা হয়েছ। তিনি মনে করেন- অত্যাচারিত মানুষের কান্না
হয়তো উচ্চকণ্ঠ নয়, কিন্তু সেই নীরব আর্তনাদও যেন কৃষ্ণের কাছে পৌঁছায়। কবি সেই কান্নার মধ্যেই কৃষ্ণের আবির্ভাব কামনা করছেন।
তিনি সবাইকে আহ্বান করেছেন- এসো বীরের আত্মদানে প্রাণ-উদ্বোধনে এসো'।
মূলত এখানে প্রার্থনা করা হয়েছে তাদের কাছে- যারা দেশ ও মানুষের জন্য আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত, তাদের আত্মদানে নতুন প্রাণশক্তি জাগুক। কৃষ্ণের আবির্ভাব এখানে বাহ্যিক কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং মানুষের অন্তরে সাহস, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের চেতনা জাগ্রত হওয়াও কৃষ্ণের আবির্ভাবের একটি রূপ।
সবচেয়ে শক্তিশালী দেশাত্মবোধক প্রতীকটি এসেছে—
মহাভারতের উপমা উপস্থাপন করে বলেছেন- দেশ-দ্রৌপদীর লজ্জাহারী'।
মহাভারতের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের মতোই কবি মাতৃভূমিকে এক অপমানিত
'দ্রৌপদী' হিসেবে কল্পরূপে
উপস্থাপন করেছেন। যেমন কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করেছিলেন, তেমনি তিনি যেন অপমানিত ও বিপন্ন দেশমাতৃকার মর্যাদা রক্ষা করেন। একই সঙ্গে
'দৈত্য-গর্ব-খর্ব-কারী' অত্যাচারী শক্তির অহংকার যেন তিনি চূর্ণ করেন।
সবশেষে 'শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মা-ধারী' কৃষ্ণের চতুর্ভুজ বিষ্ণুরূপের স্মরণ
করা হয়েছে। শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম এখানে প্রতীকী অর্থও বহন করে।
এখানে এই প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে- জাগরণ, অধর্মবিনাশ, শক্তি ও পবিত্রতা
অর্থে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের
ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৩) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড
কোম্পানি প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ
(নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪) নামক গ্রন্থের
১৭৯৮ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা:
৫৩৩-৫৩৪।
-
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি,
আটচল্লিশতম খণ্ড। স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী। [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট,
কার্তিক ১৪২৬। নভেম্বর ২০১৯। পৃষ্ঠা: ৭৩-৭৭]
[নমুনা]
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [ডিসেম্বর ১৯৩৮ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৩)।
এন ১৭২৮৮। শিল্পী: ললিতমোহন মুখোপাধ্যায়। রাগেশ্রী-সুরফাঁক্তাল]
- এইচএমভি [আগষ্ট ১৯৫০ (শ্রাবণ-ভাদ্র
১৩৫৭)। এন ৩১২৪২। শিল্পী: সত্য চৌধুরী। সুর: নজরুল ইসলাম। বৃন্দাবনী
সারং-একতাল]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- ইদ্রিস আলী। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের
ডিসেম্বর মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের [ শিল্পী:
ললিতমোহন মুখোপাধ্যায়ে] সুরানুসারে স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি
আটচল্লিশতম
খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন
হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব,
কৃষ্ণ। জাগরণ
- সুরাঙ্গ: ধ্রুপদাঙ্গ