বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: পিও শরাব পিও
পিও শরাব পিও!
তোরে
দীর্ঘ সে কাল গোরে হবে ঘুমাতে
সে তিমির-পুরে
তোর বন্ধু স্বজন প্রিয়া রবে না সাথ॥
পিও নিমেষ-মধু!
পুনঃ গাহিব না কাল আজি যে গীত গাহি।
শোনো শোনো মোর গান-
রাতে শুকাল যে গুল হাসিবে না সে
প্রাতে॥
ওরা কহিছে সদাই-
'পাবি মোহিনী হুরি', শোনো
আমার বাণী
ওরে মধুরতর
এই আঙুর-পানি এই পানশালাতে॥
ধর নগ্দা যা পাস,
মিছে রসনে বসে বাকি পাওনা-আশায়,
দূরে মৃদঙ বাজে
শুধু
ফাঁকা আওয়াজে তোর মন ভোলাতে’॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কবি
পার্থিব জীবনের অনিত্যতা কে
উপস্থাপন করা হয়েছে- সুফিবাদী দর্শনের রূপকতায়। মরণশীল মানুষের দেহের শেষগতি হয়
কবরে। মৃত্যুর পর কি হবে, কবি তা ভাবেন না। তাই ভবিষ্যতের
অনিশ্চিত প্রত্যাশার পরিবর্তে বর্তমান জীবনকে উপভোগ দর্শন কে উপস্থাপন করা হয়েছে ।
এই ভাবধারা মূলত ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত-এ প্রতিফলিত জীবনদর্শনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
গানের শুরুতে কবি ইসালমী ধর্মদর্শনের আদর্শে স্মরণ
সকল মানুষকে করিয়ে দিয়েছেন-
মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল তাকে কবরের অন্ধকারে নিদ্রিত থাকতে হবে। তখন প্রিয়জন, বন্ধু বা স্বজন কেউই সঙ্গে থাকবে না। তাই জীবিত অবস্থায় বর্তমান মুহূর্তের আনন্দ, ভালোবাসা ও সৌন্দর্যকে অবহেলা না করে উপভোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এখানে
' পিও শরাব ' বলতে মূলত জীবনের অমৃতসুধা পান করার প্রতীকী আহ্বান বোঝানো হয়েছে।
সুফিবাদী দর্শনে শরাব আধ্যাত্মিক জ্ঞান-দর্শনও বটে।
গানের
পরবর্তী অংশে যাপিত
জীবনের বর্তমানকে উপভোগ করার আহ্বান করা হয়েছে। কারণ আজ যে গান গাওয়া হচ্ছে, আগামীকাল হয়তো তা আর গাওয়া হবে না; আজ যে ফুল ফুটে আছে, রাত পেরোলেই তা শুকিয়ে যাবে। এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে মানবজীবনের অনিত্যতা ও সময়ের অপ্রতিরোধ্য গতিকে তুলে ধরা হয়েছে। তাই বর্তমানের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যবান হিসেবে গ্রহণ করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
এরপর কবি স্বর্গের হুর-পরীর প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতির চেয়ে বর্তমানের নিশ্চিত আনন্দ ও সৌন্দর্য অনেক বেশি বাস্তব।
' আঙুর-পানি ' এবং
' পানশালা ' এখানে পৃথিবীর সহজ, স্বাভাবিক ও প্রত্যক্ষ জীবনানন্দের প্রতীক। অর্থাৎ, কল্পিত ভবিষ্যতের আশায় বর্তমান জীবনকে বিসর্জন না দিয়ে, এই জীবনের সৌন্দর্য ও আনন্দকে উপলব্ধি করাই অধিক অর্থবহ।
গানের শেষাংশে কবি নগদ
প্রাপ্তির উপমা ব্যবহার করে বলেন, যা এখন হাতে আছে, সেটিই সত্য; ভবিষ্যতের
অনিশ্চিত পাওনার আশায় বর্তমানের নিশ্চিত প্রাপ্তিকে অবহেলা করা বুদ্ধিমানের
কাজ নয়। দূরের মৃদঙ্গের শব্দ যেমন কেবল ফাঁকা প্রতিধ্বনি হয়ে মনকে ভুলিয়ে
রাখে, তেমনি অদেখা ভবিষ্যতের মোহও মানুষকে বর্তমানের সত্য ও সৌন্দর্য থেকে
বিচ্যুত করতে পারে। তাই তিনি বর্তমান বাস্তব জীবনকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার
আহ্বান জানিয়েছেন।
- রচনাকাল
ও স্থান: : গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত 'নজরুল গীতিকা' গ্রন্থে গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, একই সময়ে গানটি উত্তরা পত্রিকায় (ভাদ্র ১৩৩৭) গানটি
প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
-
নজরুল-গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০।
ওমর খৈয়াম-গীতি। ২। ভৈঁরো-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা: ২]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা
ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল
গীতিকা। ওমর খৈয়াম-গীতি। ২। ভৈঁরো-কাওয়ালী। পৃষ্ঠা:
১৭১-১৭২]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২২৫।
- পত্রিকা: উত্তরা [ভাদ্র ১৩৩৭ আগষ্ট-সেপ্টেম্বর ১৯৩০]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মদর্শন। ইসলাম ধর্ম। সুফিবাদ