পথে পথে ফের সাথে মোর বাঁশরিওয়ালা।
নওলকিশোর বাঁশরিওয়ালা॥
তোমার নূপুর আমার চরণে
আপনি সাধিয়া পরালে কালা॥
নিভাইয়া মোর ভবন-প্রদীপ
দেখালে নিখিল ভুবনে আলা॥
কুল লাজ মান সকল হরি’
হরি করিলে মোরে ব্রজের বালা॥
- ভাবসন্ধান:এই গানে ভক্তের সঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিরন্তন সঙ্গ, আত্মসমর্পণ এবং জাগতিক জীবন থেকে আধ্যাত্মিক প্রেমের জগতে উত্তরণের অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে। এখানে শ্রীকৃষ্ণকে নওলকিশোর বাঁশরিওয়ালা—অর্থাৎ চিরনবীন, মধুর বাঁশিবাদক কৃষ্ণরূপে কল্পনা করা হয়েছে, যিনি ভক্তের জীবনের প্রতিটি পথে সঙ্গী হয়ে চলেন।
গানের শুরুতেই ভক্তের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে—জীবনের প্রতিটি পথে যেন কৃষ্ণ তাঁর সঙ্গী হয়ে থাকেন। তাঁর বাঁশির সুর ভক্তকে সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং জীবনের পথকে প্রেম ও আনন্দে পূর্ণ করে তোলে। এখানে বাঁশরিওয়ালা কৃষ্ণ পথপ্রদর্শক, রক্ষাকর্তা এবং চিরসঙ্গীর প্রতীক।
গানের পরবর্তী অংশে তোমার নূপুর আমার চরণে আপনি সাধিয়া পরালে কালা”—এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, ভক্তের জীবনযাত্রা এখন আর নিজের ইচ্ছায় পরিচালিত হয় না; শ্রীকৃষ্ণ নিজেই তাঁর পদক্ষেপকে পরিচালিত করছেন। কৃষ্ণের নূপুর ভক্তের চরণে পরিয়ে দেওয়ার অর্থ, ভক্তের চলাফেরা, কর্ম ও জীবনধারা এখন কৃষ্ণপ্রেম ও ভক্তির ছন্দে পরিচালিত হচ্ছে।
এরপর কবি বলেন, কৃষ্ণ তাঁর 'ভবন-প্রদীপ' নিভিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি 'নিখিল ভুবনে আলো' দেখিয়েছেন। এখানে ‘ভবন-প্রদীপ’ বলতে সংসারের সীমাবদ্ধ সুখ, অহংকার, মায়া ও ক্ষুদ্র আত্মপরিচয়ের আলোকে বোঝানো হয়েছে। কৃষ্ণ সেই ক্ষুদ্র আলোককে নিভিয়ে ভক্তকে সমগ্র বিশ্বজুড়ে বিরাজমান পরম সত্য, চিরজ্যোতি ও কৃষ্ণচেতনার উপলব্ধি দান করেছেন। অর্থাৎ, জাগতিক সীমাবদ্ধতা ত্যাগ করেই ভক্ত অসীম সত্যের আলো লাভ করেছেন।
গানের শেষাংশে ভক্ত ঘোষণা করেন যে, কৃষ্ণ তাঁর কুল, লজ্জা, মান-অভিমান ও সমস্ত সামাজিক পরিচয় হরণ করে তাঁকে ব্রজের বালা করে তুলেছেন। এর অর্থ, ভক্ত সম্পূর্ণরূপে কৃষ্ণপ্রেমে আত্মবিস্মৃত হয়ে গোপীদের মতো একনিষ্ঠ প্রেম ও ভক্তির আদর্শ গ্রহণ করেছেন। এখানে ‘ব্রজের বালা’ কোনো লৌকিক পরিচয় নয়; বরং এমন এক ভক্তসত্তার প্রতীক, যার একমাত্র পরিচয় কৃষ্ণপ্রেম।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। উত্তরা পত্রিকার 'আষাঢ় ১৩৩৭ সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩১ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল গীতিকা
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০। গজল । ৪। সিন্ধু-কাফি- কাহারবা। পৃষ্ঠা ৬০]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭] নজরুল গীতিকা। গজল। ৪৯। সিন্ধু-কাফি- কাহারবা। পৃষ্ঠা: ২০৫]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২]। গান সংখ্যা ১৮৫৬।
- পত্রিকা:
- উত্তরা [আষাঢ় ১৩৩৭ (জুন-জুলাই ১৯৩০)]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ।