বিষয়:
নজরুলসঙ্গীত
শিরোনাম: বেদনার সিন্ধু-মন্থন শেষ,
হে ইন্দ্রানী
বেদনার সিন্ধু-মন্থন শেষ,
হে ইন্দ্রানী,
জাগো, জাগো করে সুধা-পাত্রখানি॥
রোদন-সায়রে ধুয়ে পুষ্পতনু
এসো অশ্রুর বরষার ইন্দ্র-ধনু,
হের কুলে অনুরাগে জীবন-দেবতা জাগে
ধরিবে বলিয়া তব পদ্মপাণি॥
তব দুখ-রাত্রির তপস্যা শেষ
─
এলো শুভ দিন,
অতল তমসা-পারে প্রভাতের প্রায় জাগো অমলিন।
সুরলোক-লক্ষ্মী গো তুমি অমরার
এসো এসো পার হ'য়ে ব্যথার পাথার।
অশ্রুত অশ্রুর নীরবতা কর দূর
কূলে কূলে হাসির তরঙ্গ হানি'॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে গভীর দুঃখ, ত্যাগ ও তপস্যার পর আনন্দ, আশা ও নবজীবনের আবির্ভাবকে সমুদ্র-মন্থনের পৌরাণিক উপমার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এখানে ইন্দ্রানী কেবল দেবরাজ ইন্দ্রের পত্নী নন; তিনি সৌন্দর্য, কল্যাণ, বিজয় ও অমৃতময় জীবনের প্রতীক। কবির দৃষ্টিতে দীর্ঘ বেদনার পরিণতিতে যে শুভফল লাভ হয়, ইন্দ্রানীর আবির্ভাব সেই কল্যাণময় ফলেরই রূপক।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, বেদনার সমুদ্র-মন্থন শেষ হয়েছে; এখন অমৃতের পাত্র নিয়ে জেগে ওঠো, হে ইন্দ্রানী। এখানে 'সিন্ধু-মন্থন' পৌরাণিক কাহিনির স্মারক। দেবতা ও অসুরের সমুদ্র-মন্থনের ফলে যেমন বহু দুঃখ-কষ্টের পর অমৃত ও লক্ষ্মীর আবির্ভাব ঘটেছিল, তেমনি মানুষের জীবনেও দীর্ঘ দুঃখ ও সংগ্রামের পর আসে আনন্দ, শান্তি ও সার্থকতা।
এরপর কবি ইন্দ্রানীকে আহ্বান করেন—অশ্রুর সাগরে স্নাত হয়ে তিনি যেন বর্ষার আকাশে রামধনুর মতো আবির্ভূত হন। অর্থাৎ দুঃখের অশ্রুই শেষ পর্যন্ত আশার রঙধনু সৃষ্টি করে। কবি দেখেন, অনুরাগে উদ্বুদ্ধ জীবনদেবতা তাঁর পদ্মহস্ত ধারণ করার জন্য জেগে উঠেছেন। এখানে পদ্মপাণি পবিত্রতা, প্রেম ও শুভমিলনের প্রতীক।
গানের পরবর্তী অংশে কবি বলেন, দুঃখের দীর্ঘ রাত্রির তপস্যা শেষ হয়েছে; এখন শুভ প্রভাতের সূচনা। গভীর অন্ধকারের অতল পার হয়ে যেমন ভোরের আলো আসে, তেমনি বেদনা ও ত্যাগের পর জীবনে নতুন আশা ও আনন্দের সূচনা হয়। এই উপলব্ধি কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্য।
গানের শেষাংশে কবি ইন্দ্রানীকে স্বর্গের লক্ষ্মী বলে সম্বোধন করে আহ্বান জানান, তিনি যেন সমস্ত ব্যথার সাগর পার হয়ে পৃথিবীতে আসেন। তাঁর আগমনে দীর্ঘদিনের নীরব অশ্রু ও বেদনা দূর হোক এবং জীবনের তীরে তীরে হাসি, আনন্দ ও সুখের তরঙ্গ বয়ে যাক। অর্থাৎ দুঃখের অবসান ঘটিয়ে তিনি যেন মানবজীবনে কল্যাণ, সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতার বার্তা নিয়ে আসেন।
অতএব, এই গানে সমুদ্র-মন্থনের পৌরাণিক প্রতীককে অবলম্বন করে দুঃখ থেকে আনন্দ, অশ্রু থেকে হাসি, তপস্যা থেকে সিদ্ধি এবং অন্ধকার থেকে আলোর অভিযাত্রা অত্যন্ত কাব্যময় ও দার্শনিক ব্যঞ্জনায় প্রকাশিত হয়েছে। জীবনের গভীরতম বেদনাও একদিন অমৃতসম আনন্দ ও নবজাগরণের পথ উন্মোচন করে-
এটাই এই গানের মুখ্য বিষয়। ইন্দ্রানী রূপকাশ্রায় মাত্র।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না।
ভারতবর্ষ পত্রিকার আষাঢ় ১৩৪২ (জুন-জুলাই ১৯৩৬ সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৭ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল গীতি, অখণ্ড (আব্দুল আজীজ
আল-আমান, সম্পাদিত)। [হরফ প্রকাশনী, মাঘ ১৪১০। জানুয়ারি ২০০৪]।
রাগ-প্রধান গান (সিন্ধু-ত্রিতাল)। গান-৯১৮। পৃষ্ঠা: ২৩০।
- নজরুল-সঙ্গীত
সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ১৮৭
সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৫৯।
- নজরুল সুরলিপি, দশম খণ্ড, (নজরুল
একাডেমী, ডিসেম্বর ১৯৮৬) -এর ২য় গান।
পৃষ্ঠা: ৪-৫।
- বেণুকা,
(নজরুল ইন্সটিটিউট। জুন ২০০৬) -এর ৮
সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ১৯-২০।
- সন্ধ্যামালতী। নজরুল রচনাবলী জন্মশতবর্ষ সংস্করণ (বাংলা একাডেমী, ঢাকা মে
২০০৮), পৃষ্ঠা: ১৬৯।
- সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি,
তৃতীয় খণ্ড, (সাহিত্যম্, বৈশাখ ১৩৮৫) -এর ৭৩ সংখ্যক
গান। পৃষ্ঠা: ১৪৮-১৪৯।
-
নজরুলের হারানো গানের খাতা [নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। আষাঢ় ১৪০৪/জুন
১৯৯৭। গান সংখ্যা ১১২। for Kumari Juthica (HMV)
। -সিন্ধু-কার্ফা।
পৃষ্ঠা
১৩৯।]
পত্রিকা:
- ভারতবর্ষ, আষাঢ় ১৩৪২ সংখ্যা (জুন-জুলাই
১৯৩৬)।
কথা ও সুর: কাজী নজরুল ইসলাম। স্বরলিপি: জগৎ ঘটক। সিন্ধু-ত্রিতাল।
পৃষ্ঠা: ৪০-৪১] [নমুনা]
- রেকর্ড: এইচএমভি
[জুলাই ১৯৩৬
(আষাঢ়-শ্রাবণ
১৩৪৩)। এন. ৯৭৩৯।
শিল্পী:
কুমারী যূথিকা
রায়। সুর:
নজরুল
ইসলাম।
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
- স্বরলিপিকার:
- জগৎ ঘটক। ভারতবর্ষ, আষাঢ় ১৩৪২ সংখ্যা (জুন-জুলাই
১৯৩৬)।
পৃষ্ঠা: ৪০-৪১] [নমুনা]
- ড. রশিদুন্ নবী। নজরুল -সংগীত স্বরলিপি। নজরুল
ইন্সটিটিউট। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩/জুন ২০১৬। গান সংখ্যা ১২। পৃষ্ঠা: ৬৩-৬৫
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। ইন্দ্রাণী। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: রাগাশ্রয়ী