বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম : তোর নামেরই কবচ দোলে দোলে আমার বুকে
তোর নামেরই কবচ দোলে দোলে আমার বুকে,
হে শঙ্করী।
কি ভয় দেখাস্? আমি তোকেও ভয় করি না, ভয় করি না
ভয়ঙ্করী॥
মৃত্যু প্রলয় তাদের লাগি
নয় যারা তোর অনুরাগী।
(মাগো) তোর শ্রীচরণ আশ্রয় মোর (দেখে) মরণ আছে ভয়ে
মরি’॥
তোর যদি না হয় মা বিনাশ, আমিও মা অবিনাশী;
(আমি) তোরই মাঝে ঘুমাই জাগি, তোরই কোলে কাঁদি হাসি।
তোর চরণ ছেড়ে পলায় যারা (মা)
মায়ার জালে মরে তারা
তোর মায়া-জাল এড়িয়ে গেলাম মা তোর অভয়-চরণ ধরি, মা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মাতৃরূপিণী আদ্যাশক্তি শঙ্করী তথা দুর্গার প্রতি এক ভক্তের অটল বিশ্বাস, নির্ভীকতা এবং সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের ভাব প্রকাশিত হয়েছে। ভক্ত অনুভব করেন যে, যিনি মহাশক্তির আশ্রয়ে অবস্থান করেন, তাঁর জীবনে ভয়, মৃত্যু কিংবা প্রলয়ের কোনো প্রকৃত ক্ষমতা নেই। তাই এই গানটি মূলত মাতৃরূপিণী দেবীর কৃপায় অভয়লাভ, আত্মবিশ্বাস এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির উপলব্ধির এক গভীর প্রকাশ।
গানের সূচনায় ভক্ত এক অমোঘ অভয় শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছ- তাঁর বক্ষে সদা
দোলায়মান মায়ের নামের কবচের কথা। এখানে 'কবচ' বলতে বোঝানো হয়েছে দেবীর অভয়প্রদায়িনী কৃপাশক্তিকে, যা তাঁকে সকল বিপদ, ভয় ও অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করবে। এই কারণেই তিনি ভয়ঙ্করী দেবীর সামনেও নির্ভীক। তিনি জানেন, যিনি তাঁর জননী, তিনি কখনো সন্তানের অকল্যাণ চান না। তাই জগৎ যতই ভয় প্রদর্শন করুক না কেন, তাঁর অন্তরে কোনো আতঙ্কের স্থান নেই।
গানটির অন্তরাতে অভয় প্রদায়িনী দেবীর করুণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভক্ত উপলব্ধি করেন যে মৃত্যু ও প্রলয় কেবল তাদের জন্যই ভয়ের কারণ, যারা দেবীর
অনুরাগী নয়। কিন্তু যিনি মায়ের শ্রীচরণে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁর কাছে মৃত্যুও ভীতসন্ত্রস্ত। এখানে মৃত্যু জড়জগতের সীমাবদ্ধতা ও নশ্বরতার প্রতীক, আর দেবীর চরণ চিরন্তন সত্য ও অমরত্বের প্রতীক। ভক্তের বিশ্বাস, দেবীর আশ্রয়ে থেকে তিনি মৃত্যুকে অতিক্রম করার শক্তি লাভ করেছেন।
গানটির আভোগে ভক্ত নিজেকে অবিনাশীরূপ উপস্থাপন করেছেন। তাঁর যুক্তি যদি মা অবিনশ্বর হন, তবে তাঁর সন্তানও অবিনাশী।
কারণ তাঁর সমস্ত অস্তিত্ব মায়ের সত্তার সঙ্গেই অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তিনি
মায়ের মধ্যেই জাগ্রত হন, মায়ের মধ্যেই নিদ্রিত হন এবং মায়ের কোলে
হাসি-কান্নার সমস্ত অনুভূতি প্রকাশ করেন। এই উপলব্ধির মাধ্যমে ভক্ত ঘোষণা
করেছেন যে, তাঁর জীবন ও সত্তার কোনো স্বতন্ত্র পরিচয় নেই; তিনি দেবীমাতার
মহাশক্তিরই এক অংশমাত্র।
গানটির সঞ্চারীতে কবি মায়া ও মুক্তির তত্ত্বকে তুলে ধরেছেন। যারা দেবীর চরণ
ত্যাগ করে সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হয়, তারা জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবর্তিত হয়ে
দুঃখভোগ করে। কিন্তু ভক্ত সেই মায়াবন্ধন অতিক্রম করে দেবীর অভয়চরণে আশ্রয়
গ্রহণ করেছেন। এখানে ‘অভয়চরণ’ কেবল আশ্রয়ের প্রতীক নয়; এটি মুক্তি, নির্ভয়তা
এবং চিরশান্তিরও প্রতীক। ভক্তের বিশ্বাস, দেবীর শরণ গ্রহণের মধ্য দিয়েই সকল ভয়,
মোহ ও বন্ধন থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের
মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৩)
মাসে
এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৪৩ বৎসর
৯ মাস।
-
গ্রন্থ:
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান
১৯৩৬। পৃষ্ঠা ৫৮৩
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [মার্চ ১৯৪৩ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৯)]।
এন ২৭৩৫৮। শিল্পী:
ভবানী দাস।
- সুরকার: সুবল দাশগুপ্ত
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার: সেলিনা হোসেন
[নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, তেতাল্লিশতম খণ্ড, আষাঢ় ১৪২৫] গান সংখ্যা ১১। পৃষ্ঠা:
৫৬-৫৮ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম, শাক্ত। দুর্গা।
মতৃরূপিণী। আত্মনিবেদন
- সুরাঙ্গ: রাগাশ্রয়ী