বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
নাটুয়া ঠমকে যায় রহিয়া রহিয়া চাল
নাটুয়া ঠমকে যায় রহিয়া রহিয়া চাল – কনক
পুতলী-র সময় রে।
যত রূপ যত বেশ নয়নে প্রেমাবেশ (নদীয়ায়) দিন হ’ল
চাঁদের উদয় রে॥
চাঁদ উঠেছে নদীয়ায় অপরূপ চাঁদ উঠেছে, চাঁদ উঠেছে।
বিজলি জড়িত যেন চাঁদে কণিকা গো, চরণ-নখর রাঙা
হিঙ্গুল রাগে;
মনোবনের পাখি পিয়াসে মরয়ে গো উহারি পরশ-রস মাগে।
অপরূপ বঙ্কিম চূড়ার টালনে গো, ললাট শোভিত চন্দন
তিলকে,
ইন্দুলেখার মাঝে তারার বিন্দু যেন – এ সাজে এ
মনোহরে সাজায়ে দিল কে।
ত্রিলোক ভুলাইতে তিলক দিল কে, চন্দন তিলকে এ শচী
নন্দনে সাজায়ে দিল কে।
রতন কুঁদিয়া কে যতন করিয়া গো, নিরমিল গোরা দেহখানি॥
হবে যোগিনী তারি ধ্যানে, মনের সহিত মোর, এ পাঁচ
পরানী, এ পাঁচ পরানী
-
ভাবসন্ধান: নজরুল ইসলামের রচিত
শ্রীশ্রী
চৈতন্য-লীলা কীর্তন-এর এই গানে
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-এর অপরূপ
রূপমাধুর্য, প্রেমময় ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর দর্শনে ভক্তহৃদয়ের আত্মবিস্মৃত অবস্থার
চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। কবি তাঁকে এমন এক দিব্য সৌন্দর্যের আধার হিসেবে দেখিয়েছেন,
যার আবির্ভাবে সমগ্র নদীয়া প্রেম, আনন্দ ও আধ্যাত্মিক জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
গানের শুরুতে কবি বলেন, শ্রীগৌরাঙ্গের মনোহর গমনভঙ্গি দেখে নর্তকও যেন বিস্ময়ে থমকে যায়। তাঁর দেহ স্বর্ণপুতুলের মতো উজ্জ্বল ও লাবণ্যময়। তাঁর আবির্ভাবে নদীয়ায় যেন দিনের বেলাতেই চাঁদের উদয় হয়েছে। এখানে “চাঁদ” শ্রীগৌরাঙ্গের শীতল, নির্মল ও মোহনীয় রূপের প্রতীক। তাঁর সৌন্দর্য এতই অতুলনীয় যে, জাগতিক সব রূপ ও সাজসজ্জা তাঁর সামনে ম্লান হয়ে যায়।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি শ্রীচৈতন্যের শারীরিক সৌন্দর্যের সূক্ষ্ম বর্ণনা করেছেন। তাঁর পদনখ হিঙ্গুলের মতো রক্তিম, যেন বিদ্যুতের ঝলক চাঁদের কিরণের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তাঁর স্পর্শলাভের আকাঙ্ক্ষায় ভক্তের মনরূপ বনভূমির পাখি ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এখানে “পরশ-রস” বলতে ঈশ্বরীয় সান্নিধ্যের আনন্দ ও প্রেমানুভূতিকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ভক্ত তাঁর দর্শন ও স্পর্শের মাধ্যমে আত্মিক পরিতৃপ্তি লাভ করতে চান।
এরপর কবি শ্রীগৌরাঙ্গের কেশবিন্যাস, চন্দনতিলক ও অলঙ্কারের বর্ণনার মাধ্যমে তাঁর দিব্য রূপকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছেন। তাঁর বঙ্কিম চূড়া, ললাটের চন্দনতিলক এবং তার মধ্যকার অলংকার যেন চাঁদের মাঝে তারকার বিন্দুর মতো শোভা পাচ্ছে। কবি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেন—এমন অতুলনীয় সৌন্দর্যে তাঁকে কে সাজিয়েছেন? তাঁর এই রূপ এমনই মোহনীয় যে, তিনটি লোক (স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল) পর্যন্ত তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। এখানে বোঝানো হয়েছে, তাঁর সৌন্দর্য মানবীয় সীমা অতিক্রম করে ঐশ্বরিক মহিমায় উন্নীত।
শেষে কবি বলেন, যেন অমূল্য রত্নকে নিপুণ কারিগর অত্যন্ত যত্নে খোদাই করে সৃষ্টি করেছেন শ্রীগৌরাঙ্গের শুভ্র, উজ্জ্বল দেহ। তাঁর এই রূপ ও প্রেমময় ব্যক্তিত্ব ভক্তকে সম্পূর্ণ আত্মহারা করে তোলে। কবি নিজের মন ও পাঁচ প্রাণকে তাঁর ধ্যানে নিবেদিত করার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন। “হবে যোগিনী তারি ধ্যানে”—এই উক্তির মাধ্যমে ভক্তের একাগ্র সাধনা, আত্মসমর্পণ ও প্রেমভক্তির চরম আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে “যোগিনী” শব্দটি নারীসত্তার পরিচয় নয়; বরং এমন এক সাধকসত্তার প্রতীক, যিনি সর্বস্ব ত্যাগ করে একমাত্র প্রিয়তম ঈশ্বরের ধ্যানেই নিমগ্ন থাকেন।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মার্চ (রবিবার ২১ ফাল্গুন ১৩৪৫) বেতারে 'শ্রীশ্রী চৈতন্য লীলা কীর্তন' নামক নজরুলের একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানে গানটি ছিল। এই সময়
নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান
সংখ্যা ১৯৭৫। পৃষ্ঠা: ৫৯৪]
- রেকর্ড:
টুইন [মে ১৯৩৯ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬)। এফটি ১২৮০৬। শিল্পী নারায়ণ
দাশগুপ্ত]
- বেতার: শ্রীশ্রী চৈতন্য-লীলা কীর্তন। [৫ মার্চ ১৯৩৯ (রবিবার ২১ ফাল্গুন
১৩৪৫)]
- সূত্র
- বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা: ১৭৯
- The Indian-listener Vol
IV, No.5. p. 357
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। শ্রীচৈতন্য। বন্দনা