বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
নিঠুর কপট সন্ন্যাসী
নিঠুর কপট সন্ন্যাসী – ছি ছি, লাজের
নাহিক লেশ।
এক দেশ তুমি জ্বালাইয়া এলে জ্বালাইতে আর দেশ॥
নীলাচলে এসে রাজ-রাজ হয়ে নদীয়া গিয়াছ ভুলে
কত কুলে তুমি কালি দিয়া শেষে আসিলে সাগর-কূলে।
(ওহে গুণের সাগর আসিলে সাগর-কূলে)
কোন্ কূজ্বায় কু বুঝাইয়া নদীয়ার চাঁদে আনিল হরিয়া,
কারে কাঁদাইয়া পাপক্ষয় লাগি’ মুড়ালে মাথার কেশ॥
তোমারে দণ্ড দিল কে ওহে দণ্ডধারী, তোমার হাতে দণ্ড
দিল কে।
কোন সে নদীয়া-বাসিনীর লাগি’, যৌবনে তুমি হয়েছ
বিবাগী,
নব-যৌবনে সে বিষ্ণুপ্রিয়া ধরেছে যোগিনী বেশ॥
-
ভাবসন্ধান: নজরুল ইসলামের এই শ্রীকৃষ্ণলীলাকীর্তন-এর গানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-এর সন্ন্যাস গ্রহণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর ভক্তদের, বিশেষত নদীয়াবাসী ও বিষ্ণুপ্রিয়া দেবী-এর হৃদয়বিদারক বিরহবেদনা প্রকাশ করা হয়েছে। কবি অভিমান, অভিযোগ ও গভীর প্রেমের মিশ্র অনুভূতিতে মহাপ্রভুর প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। এই অভিযোগ প্রকৃতপক্ষে বিরাগের নয়; বরং বিচ্ছেদের অসহনীয় যন্ত্রণার কাব্যিক প্রকাশ।
গানের শুরুতেই কবি মহাপ্রভুকে “নিঠুর কপট সন্ন্যাসী” বলে সম্বোধন করেছেন। এটি কোনো বাস্তব নিন্দা নয়; বরং প্রিয়জনকে হারানোর বেদনায় ভক্তের অভিমানমিশ্রিত উক্তি। তিনি বলেন, নদীয়ার মানুষকে প্রেমের আগুনে দগ্ধ করে মহাপ্রভু এবার অন্য দেশকেও সেই প্রেমবিরহে জ্বালাতে বেরিয়েছেন। অর্থাৎ, তাঁর প্রস্থান নদীয়াবাসীর হৃদয়ে অসীম শূন্যতা ও বেদনার সৃষ্টি করেছে।
এরপর কবি বলেন, মহাপ্রভু নীলাচলে গিয়ে সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সমাদৃত হলেও যেন নিজের জন্মভূমি নদীয়াকে ভুলে গেছেন। এখানে “রাজ-রাজ” বলতে জাগতিক রাজত্ব নয়; বরং নীলাচলে তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও সর্বজনীন প্রভাবকে বোঝানো হয়েছে। কবি আরও বলেন, তিনি অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে প্রেমের চিহ্ন এঁকে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রতীরের নীলাচলে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর প্রেমের আদর্শ মানুষের পাপক্ষয় ও আত্মশুদ্ধির পথ হলেও, সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে আপনজনদের গভীর দুঃখ দিয়ে গৃহত্যাগ করতে হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে, পরবর্তী অংশে কবি সন্ন্যাসজীবনের প্রতীক
ও মুণ্ডিত মস্তকের
প্রসঙ্গ তুলে গভীর আবেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন—যিনি সমগ্র জগতের
পথপ্রদর্শক, তাঁকে আবার কে দণ্ড ধারণের আদেশ দিল? এই প্রশ্নের মধ্যে ভক্তের
বিস্ময় ও বেদনা নিহিত। একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, কোন্ আহ্বান বা আদর্শের টানে
তিনি সংসার, মা এবং নববধূ বিষ্ণুপ্রিয়াকে ছেড়ে বৈরাগ্যের পথ বেছে নিলেন।
গানের শেষাংশে বিষ্ণুপ্রিয়ার করুণ পরিণতির চিত্র ফুটে উঠেছে। নবযৌবনেই স্বামীবিরহে তিনি সংসারের সমস্ত সুখ ত্যাগ করে যোগিনীর ন্যায় কঠোর বৈরাগ্য ও সাধনার জীবন গ্রহণ করেন। তাঁর এই ত্যাগ ও বিরহ গৌড়ীয় বৈষ্ণবধারায় প্রেমভক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কবি তাঁর বেদনাকে সমগ্র মানবহৃদয়ের বেদনার সঙ্গে একাত্ম করেছেন।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ মার্চ (রবিবার ২১ ফাল্গুন ১৩৪৫) বেতারে 'শ্রীশ্রী চৈতন্য লীলা কীর্তন' নামক নজরুলের একটি সঙ্গীতানুষ্ঠান প্রচারিত হয়। এই অনুষ্ঠানে গানটি ছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান
সংখ্যা ১৯৭৯। পৃষ্ঠা: ৫৯৪]
- রেকর্ড:
টুইন [মে ১৯৩৯ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬)। এফটি ১২৮০৬। শিল্পী নারায়ণ
দাশগুপ্ত]
- বেতার: শ্রীশ্রী চৈতন্য-লীলা কীর্তন। [৫ মার্চ ১৯৩৯ (রবিবার ২১ ফাল্গুন
১৩৪৫)]
- সূত্র
- বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা: ১৭৯
- The Indian-listener Vol
IV, No.5. p. 357
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। শ্রীচৈতন্য। বন্দনা