বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নৃত্যময়ী নৃত্যকালী নিত্য নাচে হেলে দুলে
নৃত্যময়ী নৃত্যকালী নিত্য নাচে হেলে দুলে।
তার রূপের ছটায়, নাচের ঘটায় শম্ভু লুটায় চরণ-মূলে॥
সেই নাচেরি ছন্দ-ধারা,
চন্দ্র, রবি, গ্রহ, তারা,
সেই, নাচনের ঢেউ খেলে যায় সিন্ধু জলে পত্রে ফুলে॥
সে মুখ ফিরায়ে নাচে যখন
ধরায় দিবা হয় রে তখন,
এ বিশ্ব হয় তিমির-মগন মুক্তকেশীর এলোচুলে॥
শক্তি যথায়, যথায় গতি;
মা সেথাই নাচে মূর্তিমতী
কবে দেখব সে নাচ অগ্নি-শিখায় আমার শবে চিতার কূলে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে কালী-কে বিশ্বসৃষ্টির চিরন্তন গতিশক্তি ও মহাজাগতিক নৃত্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তাঁর নৃত্য কেবল একটি পৌরাণিক ঘটনা নয়; বরং সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি, পরিবর্তন ও লয়ের অনন্ত ছন্দের প্রতীক। কবি দেখিয়েছেন যে, বিশ্বজগতের সমস্ত গতি, শক্তি ও প্রাণস্পন্দনের উৎস এই নিত্যনৃত্যময়ী আদ্যাশক্তি।
গানের শুরুতেই দেবীকে 'নৃত্যময়ী নৃত্যকালী' নামে অভিহিত করা হয়েছে। কবি
দেবীর সকল কর্ম-লীলাকে নৃত্যের সাথে তুলনা করেছেন। নৃত্যরতা এই দেবীর অপরূপ রূপমাধুর্য ও নৃত্যাবেশে শিব তাঁর চরণে আত্মহারা হয়ে লুটিয়ে আছেন। এখানে শিবের চরণে লুটিয়ে থাকা শক্তির প্রতি পরম আত্মসমর্পণ এবং শিব-শক্তির অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের প্রতীক। শক্তি ছাড়া শিব যেমন নিষ্ক্রিয়, তেমনি শিব ছাড়া শক্তির পূর্ণ প্রকাশও সম্ভব নয়।
গানের পরবর্তী অংশে কবি উপলব্ধি করেছেন- এই দেবীর নৃত্যের ছন্দেই চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্র নিরন্তর গতিশীল। সমুদ্রের ঢেউ, বৃক্ষের পাতা, ফুলের দোলন—প্রকৃতির প্রতিটি স্পন্দন তাঁর নৃত্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
এরপর নৃত্যরতা এই দেবীকে মুখ ফেরানো রূপকতায় উপস্থাপন করেছেন। কবি মনে করেন-
দেবী যখন মুখ ফিরিয়ে নাচেন, তখন পৃথিবীতে দিন আসে; আবার তাঁর মুক্তকেশের আবরণে বিশ্ব অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। এখানে দিন-রাত্রির আবর্তন, আলো-অন্ধকারের পরিবর্তন এবং সৃষ্টির চক্রকে দেবীর লীলারূপে প্রকাশ করা হয়েছে। কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তনই মহাশক্তির ইচ্ছার প্রকাশ
ঘটে নৃত্যের ছন্দে।
গানের শেষাংশে গানের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য সর্বাধিক গভীর হয়ে উঠেছে। কবি উপলব্ধি করেন যে, যেখানে শক্তি, সেখানে গতি; আর যেখানে গতি, সেখানেই দেবীর নৃত্য। তাই তিনি প্রার্থনা করেন, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে চিতার অগ্নিশিখার মধ্যেও যেন সেই মহাজাগতিক নৃত্যের দর্শন লাভ করতে পারেন। এখানে চিতার আগুন কেবল মৃত্যুর প্রতীক নয়; বরং দেহের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে চিরন্তন শক্তির সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রতীক। কবির কামনা, মৃত্যুকেও যেন তিনি দেবীর মহালীলার এক অংশ হিসেবে উপলব্ধি করতে পারেন।
- রচনাকাল ও স্থান: ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ
১৩৪৯) মাসে এইচএমভি প্রথম এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের
বয়স ছিল ৪৩ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮।
ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৯৮৫ গান।
- রেকর্ড: এইএমভি। জুলাই ১৯৪২ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪৯)। শিল্পী: মৃণালকান্তি
ঘোষ। রেকর্ডটি বাতিল হয়েছিল।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। পরমসত্তা