বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম : হে ব্রজকুমার শোনো শোনো মোর নিবেদন
হে ব্রজকুমার শোনো শোনো মোর নিবেদন।
অনুরাগ-আবির দিয়ে রাঙাব চরণ॥
শ্রীচরণ জড়ায়ে কাঁদিব নূপুর হয়ে
যে পথে যাইবে গোঠে, কাঁদিব সে পথে র’য়ে
চরণ-পরশে তব, হব হে মাধব, হরি-চন্দন!
হব হরি-চন্দন॥
হে বনের কিশোর!
যে বনে চরাও ধেনু সে বন-লতায়
ফুল হয়ে প্রেম মোর ঝরিবে ও-পায়।
নাচিব ময়ূর হয়ে হে ঘনশ্যাম,
শুকপাখি হয়ে সদা গাহিব ও নাম;
পূজার ফুল হয়ে তব মুখপানে চেয়ে লভিব চরণ॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটিতে ভক্তের শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং তাঁর চরণসেবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। ভক্তের একমাত্র কামনা—কৃষ্ণের সান্নিধ্য লাভ করা এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কোনো না কোনোভাবে তাঁর সেবায় নিজেকে নিবেদন করা। এখানে প্রেম এতই গভীর যে ভক্ত নিজের মানবসত্তাকেও তুচ্ছ করে নূপুর, হরি-চন্দন, বনফুল, ময়ূর, শুকপাখি ও পূজার ফুল হয়ে কৃষ্ণের কাছে থাকতে চায়।
গানের শুরুতে- ব্রজের কিশোর কৃষ্ণের কাছে ভক্তের আকুল নিবেদন। আবির দিয়ে যেমন প্রিয়জনকে রাঙানো হয়, তেমনি ভক্ত নিজের অনুরাগ বা প্রেমকেই আবির করে কৃষ্ণের চরণ রাঙাতে চায়। অর্থাৎ ভক্তির সবচেয়ে মূল্যবান অর্ঘ্য হলো তার নিখাদ প্রেম।
গানের পরের অংশে ভক্ত নিজেকে নূপুরে রূপান্তরিত করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে। কৃষ্ণ যখন চলবেন, তাঁর পায়ের সঙ্গে নূপুরও চলবে। তাই নূপুর হয়ে ভক্ত সর্বক্ষণ তাঁর চরণ জড়িয়ে থাকতে চায়। এখানে নূপুর হওয়া
হলো- চিরকাল কৃষ্ণের চরণসঙ্গী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
কৃষ্ণ যখন অন্যান্য গোপালকদের সঙ্গে গোরু চরাতে যাবেন, তখন তাঁর পথের ধূলিতেও ভক্ত নিজের অস্তিত্ব খুঁজে নিতে চান
কবি। কৃষ্ণ যে পথে চলবেন, সেই পথও তার কাছে পবিত্র। এখানে প্রেমের এমন এক চরম রূপ প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে প্রিয়ের সঙ্গে সরাসরি মিলন সম্ভব না হলেও তাঁর পদচিহ্ন ও পথই
যেন প্রেমিকের আরাধ্য। কৃষ্ণের চরণস্পর্শে নিজেকে চন্দনের মতো পবিত্র ও সুগন্ধময় করে তুলতে চায় ভক্ত। হরি-চন্দন হয়ে কৃষ্ণের শরীরে বা চরণে লেগে থাকা মানে তাঁর সেবায় সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করা।
গানের পরের অংশে ভক্তের এই আকাঙ্ক্ষা আরও বিস্তৃত হয়েছে। কৃষ্ণ যে বনে গরু চরান,
সেই বনের লতাগুল্মের মধ্যেও ভক্ত নিজের প্রেমকে ফুল হয়ে ঝরাতে চায়। অর্থাৎ কৃষ্ণের জীবনের সঙ্গে যুক্ত ব্রজের প্রতিটি উপাদান ভক্তের কাছে পবিত্র। সে চায়, সেই বনলতার ফুল হয়ে কৃষ্ণের চরণে নিজের প্রেম নিবেদন করতে।
কৃষ্ণের বাঁশির সুর, তাঁর সৌন্দর্য ও উপস্থিতির আনন্দে ময়ূরের নৃত্য বৈষ্ণব কাব্যে একটি পরিচিত চিত্র।
সেই ভাবধারায় এ গানে ভক্ত নিজেও ময়ূর হয়ে কৃষ্ণের সামনে নৃত্য করতে চায়। সে শুকপাখি হয়ে ভক্ত সর্বক্ষণ কৃষ্ণের নাম গাইতে চায়। এখানে নামস্মরণ ও নামকীর্তন ভক্তির প্রধান সাধনা হিসেবে এসেছে।
ভক্ত পূজার ফুল হয়ে কৃষ্ণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর চরণে নিবেদিত হতে চায়। এটি আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত প্রতীক।
যা কৃষ্ণপ্রেমে সম্পূর্ণ আত্মবিসর্জন ও চরণসেবার আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত
হয়েছে।
ভক্ত কৃষ্ণের কাছে কোনো পার্থিব সুখ, সম্পদ বা নিজের জন্য কোনো পুরস্কার চায় না। সে শুধু চায়—কৃষ্ণের জীবনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত থাকতে।
তাই কখনো সে নূপুর, কখনো হরি-চন্দন, কখনো বনফুল, কখনো ময়ূর, কখনো শুকপাখি, আবার কখনো পূজার ফুল হতে চায়। এই রূপান্তরগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ একটিই—নিজস্ব সত্তা বিসর্জন দিয়ে
কৃষ্ণের সেবা ও সান্নিধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করা।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল (চৈত্র ১৩৪৭-বৈশাখ
১৩৪৮) মাসে, মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময়
নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ১০ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২১৫২। পৃষ্ঠা: ৬৪৮।
- রেকর্ড: মেগাফোন [ এপ্রিল ১৯৪১
(চৈত্র ১৩৪৭-বৈশাখ ১৩৪৮) । জেএনজি ৫৫৪৫। শিল্পী:
কুমারী কুসুম। সূত্র:
রেকর্ড
বুলেটিন, এপ্রিল ১৯৪১ ।
এর জুড়ি গান ছিল-তোমা বিনা মাধব [তথ্য]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ।
আত্মনিবেদন
- সুরাঙ্গ: ভজন