বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হায় ভিখারি কাহার কাছে হাত পাতিলে হায়
হায় ভিখারি কাহার কাছে হাত পাতিলে হায়।
তোমার চেয়েও আমি যে দীন কাঙাল অসহায়॥
আমার হয়ত কিছু ছিল কভু
সব নিয়েছেন
কেড়ে প্রভু
আমায় তিনি নেননি তবু তাঁহার রাঙা পায়॥
তোমায় তিনি পথ দেখালেন ভাবনা কিসের ভাই
তোমার আছে ভিক্ষা ঝুলি আমার তাহাও নাই।
চাইনে তবু আছি
পড়ে
সংসারেরে
জড়িয়ে ধরে
কবে তোমার মতন পথের ধূলি মাখ্ব সারা গায়॥
- ভাবসন্ধান: প্রকৃত দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়, পরমসত্তার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত থাকা। একজন ভিখারি বাহ্যিকভাবে দরিদ্র হলেও
পরমসত্তার উপর নির্ভর- মুক্ত জীবন লাভ করতে পারে। বিপরীতে সংসারী মানুষ সম্পদ ও সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ থেকে অন্তরে আরও বেশি অসহায় হয়ে উঠতে পারে।
এখানে ভিখারি আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রতীক, আর সংসার হলো বন্ধনের প্রতীক। এই ভাবদর্শে
রচিত এই গানে- এক আত্মদরিদ্র মানুষের সঙ্গে এক ভিখারির কথোপকথনের মধ্য দিয়ে পার্থিব সম্পদ ও আধ্যাত্মিক সম্পদের পার্থক্য এবং
পরমসত্তার চরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
গানের শুরুতে আত্মনিবেদিত সর্বহারা একজন তাঁর আত্মোপলব্ধি থেকে- এক ভিখারিকে দেখে সমবেদনা প্রকাশ করছেন।
'হায় ভিখারি কাহার কাছে হাত পাতিলে হায়' এটি তার আক্ষেপ। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি উপলব্ধি করেন, বাহ্যিকভাবে ভিখারি হলেও তাঁর নিজের দারিদ্র্য আরও গভীর। ভিখারির কাছে অন্তত একটি ভিক্ষার ঝুলি আছে, কিন্তু বক্তার কাছে সেটুকুও নেই। তাই
সে বলে, 'তোমার চেয়েও আমি যে দীন কাঙাল অসহায়।'
বক্তা উপলব্ধি করে- একসময় তার কিছু সম্পদ আশা বা সুখ ছিল। কিন্তু মহাপ্রভু- সবকিছু তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন। অথচ সেই প্রভুর
'রাঙা পা' তিনি লাভ করতে পারেন নি। এখানে তাঁর প্রকৃত দুঃখ বস্তুগত সম্পদ হারানো নয়; বরং
পরমসত্তাকে না-পাওয়াই তাঁর সবচেয়ে বড় বঞ্চনা।
এরপর বক্তা ভিখারির প্রতি ঈর্ষামিশ্রিত মমতায় বলে- 'তোমার তো তিনি পথ দেখিয়েছেন; তুমি পথের মানুষ হয়ে তাঁর আশ্রয়ে চলতে পারছ, তাই তোমার চিন্তা কী? তোমার কাছে অন্তত একটি ভিক্ষার ঝুলি আছে। অর্থাৎ ভিখারির বাহ্যিক দারিদ্র্যের মধ্যেও এক ধরনের স্বাধীনতা ও
পসরমসত্তার প্রতি নির্ভরতা আছে, যা সংসারী মানুষের নেই। বক্তা নিজেকে সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ মনে করে।
সে হয়তো জাগতিক সম্পদ চায় না। তবু আছি সে পড়ে আছে সংসারের মায়ায়। তাই তার আকাঙ্ক্ষা- কবে
সে সেই ভিখারির মতো সংসারের বন্ধন ছিন্ন করে পথের ধূলি সারা গায়ে মেখে পরমসত্তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে পারবেন?
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়
না। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২) মাসে এইচএমভি গানটির রেকর্ড করেছিল।
এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৬ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৪৮৪। রাগ: ধানি মিশ্র, তাল: দাদ্রা। পৃষ্ঠা:
১৪৮]
-
নজরুলের হারানো গানের খাতা
[নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা। আষাঢ় ১৪০৪/জুন ১৯৯৭। গান সংখ্যা ১৩৬।
for
Ashalata Roy
।
ভজন। পৃষ্ঠা ১৬৩]
রেকর্ড:
- রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের চুক্তি [১২ ডিসেম্বর ১৯৩৫
(বৃহস্পতিবার
২৬ অগ্রহায়ণ ১৩৪২)।
- টুইন। অক্টোবর
১৯৩৫ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪২)। এফটি ৪১০৫। শিল্পী: আশালতা রায়
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, পঞ্চদশ খণ্ড। ভাদ্র ১৪০৩। আগষ্ট
১৯৯৬। ২৫ সংখ্যাক গান। রেকর্ডে আশালতা রায়-এর গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। আত্মনিবেদন
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের গান
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: ধণা