বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: যে আল্লার পথা শোনে তারি কথা শোনে লোকে
যে আল্লার কথা শোনে তারি কথা শোনে লোকে।
আল্লার নূর যে দেখেছে পথ পায় লোক তার আলোকে॥
যে আপনার হাত দেয় আল্লায়
জুল্ফিকার তেজ সেই পায়,
যার চোখে আছে খোদার জ্যোতি রাত্রি পোহায় তারি চোখে॥
ভোগের তৃষ্ণা মিটেছে যার খোদার প্রেমের শিরনি পেয়ে,
যায় বাদ্শা-নবাব গোলাম হ'য়ে সেই ফকিরের কাছে যেয়ে।
আসে সেই কওমের ইমাম সেজে কওমকে পেয়েছে যে,
তারি কাছে খোদার দেওয়া শান্তি আছে দুখে-শোকে॥
- ভাবসন্ধান: আল্লাহর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ এবং নৈতিক জীবনই মানুষের প্রকৃত শক্তি ও মর্যাদার উৎস। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রেম ও হেদায়েত লাভ করে, সে নিজে আলোকিত হয় এবং অন্যদেরও সত্য, ন্যায় ও শান্তির পথে পরিচালিত করতে পারে।
এই ভাবনার আলোকে এই গানে কবি আল্লাহভীরু, আত্মশুদ্ধ মানুষ এবং প্রকৃত আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা সামাজিক প্রতিপত্তিতে নয়; বরং আল্লাহর প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ এবং নৈতিক চরিত্রে নিহিত। যে ব্যক্তি আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে, সে নিজে যেমন আলোকিত হয়, তেমনি অন্যের জীবনেও আলোর দিশা দেখাতে সক্ষম হয়।
গানের শুরুতেই কবি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর বাণী অনুসরণ করে এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলে, মানুষেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার কথা গ্রহণ করে। কারণ তার কথার মধ্যে সত্য, সততা ও আন্তরিকতার শক্তি থাকে। আবার যে ব্যক্তি আল্লাহর নূর বা হেদায়েতের আলো হৃদয়ে ধারণ করেছে, সে নিজে সঠিক পথ খুঁজে পায় এবং অন্যদেরও সেই পথের দিশা দিতে পারে। এখানে আল্লাহর নূর বলতে আধ্যাত্মিক জ্ঞান, ঈমান এবং নৈতিক প্রজ্ঞাকে বোঝানো হয়েছে।
পরবর্তী স্তবকে কবি বলেন, যে ব্যক্তি নিজের হাত আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে, অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে তাঁর ওপর নির্ভর করে এবং তাঁর আদেশ মেনে চলে, সে জুলফিকার-এর মতো শক্তি লাভ করে। এখানে জুলফিকার কোনো সাধারণ অস্ত্রের প্রতীক নয়; এটি সত্যের পক্ষে অটল সাহস, ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল থাকার মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক। আর যার চোখে আল্লাহর জ্যোতি রয়েছে, সে অজ্ঞতা ও অন্ধকার দূর করে মানুষের জীবনে জাগরণ আনে। তাই কবি বলেন, তার চোখেই যেন রাতের অবসান হয়ে নতুন ভোরের সূচনা ঘটে।
এরপর কবি প্রকৃত ফকিরের পরিচয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রেমের শিরনি লাভ করেছে, তার অন্তরের সমস্ত পার্থিব লোভ ও ভোগের তৃষ্ণা মিটে গেছে। ফলে সে ধন-সম্পদ বা ক্ষমতার মোহে আবদ্ধ থাকে না। এমন আধ্যাত্মিক মহিমাসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে রাজা-বাদশাহ পর্যন্ত শ্রদ্ধাভরে আসে। এখানে বোঝানো হয়েছে যে, আত্মিক মহত্ত্ব পার্থিব ক্ষমতার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
সবশেষে কবি বলেন, প্রকৃত নেতা বা ইমাম সেই ব্যক্তি, যিনি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন এবং তাঁদের কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর কাছে আল্লাহপ্রদত্ত শান্তি রয়েছে, যা দুঃখ-কষ্টের সময় মানুষকে সান্ত্বনা ও সাহস দেয়। অর্থাৎ নেতৃত্বের প্রকৃত ভিত্তি ক্ষমতা নয়, বরং নৈতিকতা, আত্মত্যাগ, মানবপ্রেম এবং আল্লাহভীতি।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়
১৩৪৮), টুইন রেকর্ড কোম্পানি এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ
(নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। গান সংখ্য ৫৪৪।
- রেকর্ড: টুইন। জুন ১৯৪১ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৮)। এফটি ১৩৫৯৬। শিল্পী:
আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
নীলিমা দাস। [নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, একত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন,
১৩৯৭ বঙ্গাব্দ/ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ] ২২ সংখ্যক গান।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর
গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। হামদ
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য