বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: সকাল হ'ল শোন্ রে আজান, ওঠ্ রে শয্যা ছাড়ি'
সকাল হ'ল শোন্ রে আজান, ওঠ্ রে শয্যা ছাড়ি'।
তুই মস্জিদে চল্ দ্বীনের কাজে, ভোল্ দুনিয়াদারি॥
ওজু করে ফেল্ রে ধূয়ে নিশীথ রাতের গ্লানি,
সিজ্দা করে জায়নামাজে ফেল্ রে চোখের পানি;
খোদার নামে সারাদিনের কাজ হবে না ভারী॥
নামাজ প'ড়ে দু'হাত তুলে প্রার্থনা
কর তুই —
ফুল-ফসলে ভ'রে উঠুক সকল চাষির ভূঁই;
সকল লোকের মুখে হোক আল্লার নাম জারী॥
ছেলে-মেয়ে সংসার-ভার সঁপে দে আল্লারে,
নবীজীর দোয়া ভিক্ষা কর্, কর্ রে বারে বারে;
তোর হেসে নিশি প্রভাত হবে সুখে দিবি
পাড়ি॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে দিনের শুরুতে নামাজ, দোয়া, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং মানবকল্যাণের জন্য প্রার্থনার মাধ্যমে আদর্শ জীবন গঠনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। ইবাদত ও কর্মের সমন্বয়ে শান্তি, সাফল্য ও কল্যাণময় জীবন লাভই এই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শে এই গানে কবি একজন মুসলমানকে দিনের সূচনালগ্নে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, প্রার্থনা এবং কর্মমুখর জীবনের আহ্বান জানিয়েছেন। ধর্মীয় অনুশাসন ও পার্থিব দায়িত্বের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় ঘটিয়ে কীভাবে জীবন পরিচালনা করতে হয়, সেই শিক্ষাই এখানে কাব্যিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
গানের শুরুতে কবি ফজরের আজানের ধ্বনি শুনে ঘুম থেকে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অলসতা ও ঘুম ত্যাগ করে মসজিদে যেতে হবে এবং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ ভুলে আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমে দিনের শুরু যেন ঈমান, শৃঙ্খলা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে হয়—এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, ওজুর মাধ্যমে মানুষ শুধু শরীরই পরিষ্কার করে না, বরং রাতের অলসতা, গ্লানি ও পাপবোধ থেকেও নিজেকে পবিত্র করার প্রতীকী প্রস্তুতি গ্রহণ করে। জায়নামাজে সিজদা করে অশ্রুসজল চোখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও করুণা প্রার্থনা করলে মন প্রশান্ত হয়। তখন আল্লাহর নামে শুরু করা সারাদিনের কাজ আর কঠিন বা ভারী মনে হয় না; বরং ইবাদত ও কর্ম একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।
এরপর কবি শেখান, নামাজ শেষে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের পাশাপাশি সমগ্র সমাজের কল্যাণের জন্যও দোয়া করতে হবে। তিনি চান, সকল কৃষকের জমি ফুলে-ফসলে ভরে উঠুক, মানুষের জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসুক এবং সর্বত্র আল্লাহর নাম উচ্চারিত হোক। এতে ইসলামের সামাজিক চেতনা, মানবকল্যাণ ও সর্বজনীন মঙ্গলকামনার দিকটি সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
গানের শেষাংশে কবি বলেন, সংসারের সব দুশ্চিন্তা ও দায়িত্ব আল্লাহর ওপর ভরসা করে অর্পণ করতে হবে এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দোয়া ও সুপারিশ কামনা করতে হবে। আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা, নবীর আদর্শ অনুসরণ এবং আন্তরিক প্রার্থনার মাধ্যমে মানুষের জীবন শান্তিময় ও আনন্দময় হয়ে ওঠে। তখন দিন ও রাত উভয়ই প্রশান্তি ও সুখের মধ্যে অতিবাহিত হয়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪৫)
মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৫ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৫৬৪। পৃষ্ঠা:
১৭২]
- জুলফিকার
- দ্বিতীয় সংস্করণ [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২।
জুলফিকার দ্বিতীয় খণ্ড। ২৪ [২৩]। পৃষ্ঠা ১০৩]
- রেকর্ড:
- টুইন [নভেম্বর ১৯৩৮ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪৫)। এফটি ১২৫৯৭। শিল্পী:
আশরাফ আলী]
- এইচএমভি [মে ১৯৪৯ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৬)। শিল্পী: মফিজুল
ইসলাম]
- স্বরলিপিকার:
- সুধীন দাশ [নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
চৌত্রিশতম খণ্ড, (একুশে
বই মেলা। ফাল্গুন ১৪১৮/ফেব্রুয়ারি ২০১২)]। ৩য় গান। পৃষ্ঠা:
৪-৭]। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর
(কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪৫) মাসে টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত গানের
সুরানুসারে কৃত স্বরলিপি।
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। ধর্মাঙ্গ
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: সা।