বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হেরা হতে হেলে দুলে নূরানী তনু ও কে আসে হায়
হেরা হতে হেলে দুলে
নূরানী তনু ও কে আসে হায়,
সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা
খুলে খুলে যায়
—
সে যে আমার কমলিওয়ালা কমলিওয়ালা॥
তার ভাবে বিভোল রাঙা পায়ের তলে
পর্বত জঙ্গম টলমল টলে,
খোরমা খেজুর বাদাম জাফরানি ফুল
ঝ'রে ঝ'রে যায়
॥
আসমানে মেঘ চলে ছায়া দিতে,
পাহাড়ের আঁসু গলে ঝরনার পানিতে,
বিজলি চায় মালা হতে,
পূর্ণিমার চাঁদ তার মুকুট হতে চায়॥
সে যে আমার কমলিওয়ালা
— কমলিওয়ালা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নূরানী মহিমা, হেরা থেকে ওহির আলো নিয়ে তাঁর আবির্ভাব এবং তাঁর প্রতি প্রকৃতির শ্রদ্ধা ও আকর্ষণকে রূপক-চিত্রকল্পে প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর আগমনে অজ্ঞতার পর্দা সরে গিয়ে সত্য ও হেদায়েতের পথ উন্মুক্ত হয়েছে- এই আধ্যাত্মিক ভাবই গানটির কেন্দ্রীয় বক্তব্য।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নূরানী আবির্ভাব, তাঁর প্রতি প্রকৃতির আকর্ষণ এবং তাঁর আধ্যাত্মিক মহিমাকে অপূর্ব রূপক ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
'কমলিওয়ালা' বলতে নবীজীর পরিচিত সরল পোশাক- কমলি বা চাদর' পরিধানকারী রূপকে বোঝানো হয়েছে। গানটির ভাষায় নবীপ্রেমের সঙ্গে সুফি ভাবধারার কাব্যিক কল্পনা গভীরভাবে মিশে আছে।
গানের শুরুতে কবি হেরা পর্বত থেকে নূরানী দেহে মহানবী (সা.)-এর আগমনের একটি কল্পিত দৃশ্য এঁকেছেন। হেরা সেই পবিত্র স্থান, যেখানে মহানবী (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি অবতীর্ণ হয়েছিল। তাঁর আগমনের সঙ্গে সঙ্গে যেন পৃথিবীর সমস্ত অন্তঃপুরের পর্দা খুলে যাচ্ছে। এর অর্থ- তাঁর মাধ্যমে অজ্ঞতা, অন্ধকার ও সত্যের আড়াল দূর হয়ে মানুষের সামনে হেদায়েত ও সত্যের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, মহানবী (সা.)-এর মহিমায় তাঁর পদতলের কাছে পর্বত ও স্থাবর-জঙ্গম সবকিছুই যেন টলমল করে ওঠে। চারদিকে খেজুর, বাদাম ও জাফরানি ফুল ঝরে পড়ে। এগুলো বাস্তব দৃশ্যের বর্ণনা নয়; বরং নবীজীর প্রতি প্রকৃতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাকে প্রকাশ করার কাব্যিক মানবায়ন।
'রাঙা পা'-ও এখানে নবীর পবিত্র ও মহিমান্বিত পদযুগলের প্রতীক।
এরপর কবি আকাশ ও প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে নবীপ্রেমে আকৃষ্ট হিসেবে কল্পনা করেছেন। মেঘ যেন তাঁর ওপর ছায়া দিতে চায়, পাহাড়ের অশ্রু ঝরনার পানিতে পরিণত হয়। বিদ্যুৎ তাঁর গলায় মালা হতে চায় এবং পূর্ণিমার চাঁদ তাঁর মাথার মুকুট হতে চায়। এই অতিশয়োক্তিপূর্ণ কল্পনার মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন- মহানবী (সা.)-এর সৌন্দর্য ও মর্যাদার সামনে প্রকৃতির সৌন্দর্যও যেন নিজেকে তাঁর অলংকার হিসেবে উৎসর্গ করতে চায়।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৯) মাসে
টুইন
রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪৩ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
-
জুলফিকার
- দ্বিতীয় সংস্করণ [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)]
২৬ সংখ্যক গান।
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক
১৪১৯, নভেম্বর ২০১২।
জুলফিকার দ্বিতীয় খণ্ড।
২ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ৯১]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)।
৫৬৬ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড: টুইন [সেপ্টেম্বর ১৯৪২ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৯)। এফটি ১৩৮২৪। শিল্পী:
আব্বাসউদ্দীন আহমদ। সুর: দেলওয়ার হোসেন।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
নীলিমা দাস।
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, ঊনত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। শ্রাবণ ১৪১৩/আগষ্ট
২০০৬] ২৫ সংখ্যক গান।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর রেকর্ডে গাওয়া গান অনুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ রসুল। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য