বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ভিখারিনী করে পাঠাইলি মোরে
ভিখারিনী করে পাঠাইলি মোরে, (মাগো) কি দিয়ে পূজিব বল।
হাতে আছে শুধু শূন্য প্রণাম, চোখে আছে শুধু জল॥
পূজা ধূপ নাই, চন্দন নাই, মাগো, লাজে মরি দিতে ভয় পাই
চুরি করে আনা দুটি জবা ফুল, একটি বিল্বদল॥
তোর ধনী ছেলে মেয়ে ঘটা করে তোর পূজা করে কত রূপে,
মাগো ভিখারি মেয়ের বেশে তুই কেন দাঁড়াইলি এসে, মোর কাছে চুপে চুপে
কিছু নাই মাগো হাতে দিতে তোর, শুধু নামখানি সম্বল মোর,
যদি চাস তুই ঐ রাঙা পায়ে দিব নামের সে শতদল॥
- ভাবসন্ধান: মাতৃরূপিণী শ্যামা বা কালীখর কাছে পূজার বাহ্যিক ঐশ্বর্য নয়, ভক্তের অন্তরের নিষ্ঠা, অশ্রু, আত্মসমর্পণ ও ভালোবাসাই প্রকৃত অর্ঘ্য। ধনী ভক্তের জাঁকজমকপূর্ণ পূজার বিপরীতে দরিদ্র ভক্তের শূন্য হাত, দুটি জবা, একটি বিল্বদল এবং মায়ের নাম—এই সামান্য উপকরণই আন্তরিক ভক্তির অসীম
পূজার্ঘ্য। এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি মাতৃরূপিণী দেবীকে সম্বোধন করে এক দরিদ্র ভক্তের গভীর আত্মসমর্পণ ও ভক্তি
উপস্থাপন করেছেন। এখানে ভক্তের কাছে পূজার বাহ্যিক উপকরণ নেই; আছে শুধু শূন্য হাতে প্রণাম, চোখের জল এবং মায়ের নাম। এই নিঃস্বতার মধ্যেও তার ভক্তি যে কত গভীর ও আন্তরিক, গানটির প্রতিটি পংক্তিতে তা ফুটে উঠেছে।
কবি মাতৃরূপিণী দেবীকে সম্বোধন করে
এক দরিদ্র ভক্তের গভীর আত্মসমর্পণ ও ভক্তির কথা প্রকাশ করেছেন। এখানে ভক্তের
কাছে পূজার বাহ্যিক উপকরণ নেই; আছে শুধু শূন্য হাতে প্রণাম, চোখের জল এবং
মায়ের নাম। এই নিঃস্বতার মধ্যেও তার ভক্তি যে কত গভীর ও আন্তরিক,
গানটির প্রতিটি পংক্তিতে তা ফুটে উঠেছে।
ভক্ত মনে করেন- দেবী তাঁকে ভিখারিনী করে পাঠিয়েছেন। পূজার জন্য মহার্ঘ কিছু নাই
তার কাছে। তাই তাঁর স্বগোক্তি- 'মাগো, কি দিয়ে পূজিব বল?' তার কাছে শুধু আছে
-শূন্য প্রণাম আর চোখে আছে শুধু জল। পূজার উপকরণ না থাকায় তার লজ্জা হচ্ছে; তবু মায়ের প্রতি আকুলতা তাকে নিবৃত্ত করতে পারছে না। তাই সে ‘চুরি করে আনা দুটি জবা ফুল’ এবং ‘একটি বিল্বদল’ মায়ের চরণে নিবেদন করতে চায়। শাক্ত পূজায় জবা ফুল ও বিল্বপত্রের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে; কিন্তু এখানে এগুলোর মূল্য নয়, ভক্তির আন্তরিকতাই মুখ্য।
এরপর কবি সামাজিক বৈষম্যের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। মায়ের ‘ধনী ছেলে-মেয়েরা’ বিপুল আয়োজন ও নানা উপাচারে জাঁকজমক করে তাঁর পূজা করে। কিন্তু এই দরিদ্র ভক্তের কাছে মা নিজেই যেন ‘ভিখারি মেয়ের বেশে’ চুপিচুপি এসে দাঁড়িয়েছেন। এর মধ্যে গভীর একটি ভাব নিহিত আছে—দেবী ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক আড়ম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; তিনি নিঃস্ব ও দরিদ্রের মধ্যেও উপস্থিত। ধনীর জাঁকজমকপূর্ণ পূজার চেয়ে দরিদ্র ভক্তের অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাঁর কাছে অধিক মূল্যবান।
গানের শেষে ভক্ত জানায়, মাকে দেওয়ার মতো তার আর কিছুই নেই। তার একমাত্র সম্বল মায়ের নাম। তাই সে প্রার্থনা করে—মা যদি তার এই সামান্য নামস্মরণও গ্রহণ করেন, তবে সে সেই নামকেই ‘শতদল’, অর্থাৎ শতদল পদ্মের মতো পবিত্র ও মূল্যবান অর্ঘ্য করে মায়ের রাঙা চরণে নিবেদন করবে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়
না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুলাই (৮ শ্রাবণ ১৩৪৭) কলকাতা বেতারকেন্দ্র
থেকে 'এস মা' শ্যামা বিষয়ক গীতিআলেখ্য প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল
৪১ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ ১৪১৭, ফেব্রুয়ারি ২০১১) নামক গ্রন্থের
৬২২ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ১৮৯]
- রেকর্ড: কলম্বিয়া [সেপ্টেম্বর ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭)]।
জিই ২৫৫৪। শিল্পী: উত্তরা দেবী। সুর নজরুল
ইসলাম।
-
বেতার: এস মা
(শ্যামা-সঙ্গীত বৈচিত্র্য)
- প্রথম প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
চতুর্থ অধিবেশন। ২৪ জুলাই ১৯৪০ (বুধবার ৮ শ্রাবণ ১৩৪৭)। সন্ধ্যা ৮-৮.৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১১শ বর্ষ ১৪শ সংখ্যায়। ১৬ জুলাই ১৯৪০। পৃষ্ঠা ৭৬৮]
- The Indian Listener, Vol, V No.1
page 1081]
দ্বিতীয় প্রচার: কলকাতা
বেতারকেন্দ্র-ক। তৃতীয় অধিবেশন। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ (শনিবার ২৬ মাঘ ১৩৪৭)।
প্রচার সময়: রাত ৮.০০-৮-৩৯টা।
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ৩য় সংখ্যা। ১ ফেব্রুয়ারি,
১৯৪১। পৃষ্ঠা: ১৫২
- The Indian Listener, Vol, VI No 3
page 59]
তৃতীয় প্রচার: কলকাতা বেতারকেন্দ্র ক।
তৃতীয় অধিবেশন। ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪১ (বৃহস্পতিবার ৯ আশ্বিন। ১৩৪৮)। প্রচার সময়: রাত
৭.৫৫-৮.২৯টা
[সূত্র:
The Indian Listener, Vol, V No.1
page 71]
পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। শ্যমা। আত্মনিবেদন