বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
কালানুক্রমিক সংখ্যা: ৮৪
নজরুল সংগ্রহ:  ১৮৪৭

শিরোনাম:
দুরন্ত বায়ু পূরবইয়াঁ বহে অধীর আনন্দে।

             াগ: কাফি-সিন্ধু। তাল কাহারবা

দুরন্ত বায়ু পূরবইয়াঁ বহে অধীর আনন্দে।
তরঙ্গে দুলে আজি নাইয়াঁ রণ-তুরঙ্গ-ছন্দে॥

অশান্ত অম্বর-মাঝে মৃদঙ্গ গুরুগুরু বাজে,
আতঙ্কে থরথর অঙ্গ মন অনন্তে বন্দে॥

ভূজঙ্গী দামিনীর দাহে দিগন্ত শিহরিয়া চাহে,
বিষন্ন ভয়-ভীতা যামিনী খোঁজে সেতারা চন্দে॥

মালঞ্চে এ কি ফুল-খেলা,  আনন্দে ফোটে যূথী বেলা,
কুরঙ্গী নাচে শিখী-সঙ্গে মাতি' কদম্ব-গন্ধে।।

একান্তে তরুণী তমালী অপাঙ্গে মাখে আজি কালি,
বনান্তে বাঁধা প'ল দেয়া কেয়া-বেণীর বন্ধে।।

দিনান্তে বসি' কবি একা, পড়িস কি জলধারা-লেখা
হিয়ায় কি কাঁদে কুহু-কেকা, আজি অশান্ত দ্বন্দ্বে।।

ভাবসন্ধান:
এই গানকে এক কথায় বলা যায়, বাণীর সুরে গাঁথা বর্ষার এক চিত্রময় রূপ। নানা উপমায়, নানা রূপকল্পের ভিতর দিয়ে কবি এই গানের ভিতর দিয়ে বর্ষার রূপ তুলে এনেছেন নিপুণ চিত্রকরের মতো।

বর্ষার প্রবল বাতাস বারিধারা বুকে নিয়ে অধীর আনন্দে প্রবাহিত হচ্ছে। যোদ্ধা ঘোড়া যেমন রণক্ষেত্রে ছুটে চলে, তেমনি যেন নদীর ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করে নৌকা ছুটে চলেছে। আকাশের মেঘমালায় বাজছে মৃদঙ্গের গুরুগুর ধ্বনি। আর তারই শব্দে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে দেহ-মন। আকাশে সাপের মতো বিদ্যুৎরেখা প্রাবল্যে দিগন্ত ভয়ে শিহরিত। তাই আলোহীন অন্ধকার রাত্রিও যেন ভয় পেয়ে, আলোর আশায় আকাশের চন্দ্র-তারকার খোঁজ করছে। আবার এরই ভিতরে আনন্দের খেলায় মেতে উঠেছে বর্ষার ফুল- যূথী, বেলি। আর কদম্বের গন্ধে হরিণী নাচছে ময়ূরের সাথে। আবার কবি নতুন ভাবে অনুভব করেন যেন- নিভৃতে তমাল তরুণী বিরহিনী কাঁদছে। তার চোখে যেন বেদনার কালি। এইভাবে বাধা পড়েছে বনবনান্তে বরষা, প্রেমিকা কেয়া তরুণীর বেণীর ফাঁদে।

সবশেষ কবি ফিরে আসেন নিজের ভুবনে। সেখানে তিনি এমন বর্ষায়, নিজের চাওয়া-পাওয়ার খুঁজে পেতে চেয়েছেন অবিরাম জলধারার গল্পের ভিতরে। সেখানে তিনি অনুভব করেন মনের পাওয়া না পাওয়ার 'কুহু-কেকা' অশান্ত দ্বন্দ্বকে। কবি অশান্ত বর্ষার রূপ দেখতে পান, নিজের মনের গভীরে। এই তাঁর মন আর প্রকৃতির রূপ একাকার হয়ে গেছে শেষের দুটি পঙ্‌ক্তিতে।

 

রচনাকাল ও স্থান: সওগাত পত্রিকার 'ফাল্গুন ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ' সংখ্যাপ্রকাশিত গানটির সাথে রচনার স্থান ও তারিখ উল্লেখ আছে- 'কৃষ্ণনগর, ১ পৌষ ১৩৩৩'। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ২৭ বৎসর ৭ মাস।

গানটির পাদটীকায় উল্লেখ ছিল-  'উর্দু গজল নাজ্‌ভি হোতা রহে হোতি রহে বে-দাদ্-ভি'-সুর। উল্লেখ্য,
১৩৩৩ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে মিশরের নৃত্যশিল্পী মিস্ ফরিদা কলকাতার আলফ্রেড রঙ্গমঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করতে এসেছিলেন। সেই নৃত্যানুষ্ঠান নজরুল দেখেছিলেন। উক্ত অনুষ্ঠানর শ্রুত উর্দু গজলের সুরে তিনি এই গানটি রচনা করেছিলেন