বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: নিখিল ঘুমে অচেতন সহসা শুনিনু আজান
নিখিল ঘুমে অচেতন সহসা শুনিনু আজান
শুনি' সে তকবিরের ধ্বনি আকুল হল মন-প্রাণ
বাহিরে হেরিনু আসি বেহেশতী রৌশনীতে রে
ছেয়েছে জমিন ও আসমান
আনন্দে গাহিয়া ফেরে ফেরেশ্তা হুর গেলেমান
─
এলো কে, কে এলো ভুলোকে! দুনিয়া দুলিয়া উঠিল পুলকে॥
তাপীর বন্ধু, পাপীর ত্রাতা, ভয়-ভীত পীড়িতের শরণ-দাতা
মুকের ভাষা নিরাশার আশা, ব্যথার শান্তি, সান্ত্বনা শোকে
এলো কে ভোরের আলোকে॥
দরুদ পড় সবে : সাল্লে আলা, মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা।
কেহ বলে, এলো মোর কম্লিওয়ালা
─
খোদার হাবীব কেহ কয় নিরালা
মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা।
কেহ বলে, আহমদ নাম মধু ঢালা
─
মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা।
মজনুঁরও চেয়ে হল দীওয়ানা সবে, নাচে গায় নামের নেশায় ঝোঁকে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মগ্রহণে, তাঁর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা এবং সমগ্র বিশ্বজগতের আনন্দোচ্ছ্বাসকে অত্যন্ত আবেগময় ও কাব্যিক ভাষায়
উপস্থাপন করা হয়েছে। কবি মহানবীর আবির্ভাবকে এমন এক মহাকল্যাণের ঘটনা হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যেখানে মানবজাতির অন্ধকার থেকে আলো, হতাশা থেকে আশা এবং বিভ্রান্তি থেকে সত্যের পথে উত্তরণের উচ্ছ্বাস প্রতিফলিত হয়েছে।
কবি অনুভব করেন- যেন সমগ্র বিশ্ব অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারের মোহজ্বালে গভীর নিদ্রায় অচেতন ছিল। হঠাৎ আজানের ধ্বনি ও তাকবির
('আল্লাহু আকবার') শুনে তাঁর মন ও প্রাণ জেগে ওঠে। বাইরে এসে তিনি দেখেন, জান্নাতের নূরের মতো আলোয় পৃথিবী ও আকাশ ভরে গেছে। এই আলোকচ্ছটা মূলত মহানবীর আবির্ভাবের প্রতীক। তাঁর আগমনে ফেরেশতা, হুর ও গিলমান আনন্দগান গেয়ে সমগ্র সৃষ্টিজগতকে অভিনন্দিত করছে। এই
অভিব্যক্তিতে কবি বুঝাতে চেয়েছেন যে, তাঁর জন্ম কেবল মানবসমাজের নয়, সমগ্র সৃষ্টির জন্যই
ছিল আনন্দের সংবাদ।
গানটির
পরবর্তী অংশে কবি মহানবী (সা.)-এর মানবকল্যাণমূলক গুণাবলি তুলে ধরেছেন। তিনি
ছিলেন- দুঃখী ও নিপীড়িত মানুষের বন্ধু, পাপীর মুক্তির পথপ্রদর্শক, ভীত মানুষের আশ্রয়দাতা, বোবার ভাষা, নিরাশ মানুষের আশা এবং শোকাহত হৃদয়ের শান্তি। অর্থাৎ তিনি মানবতার মুক্তিদূত, যিনি মানুষের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনে আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
এরপর কবি দরুদ পাঠের আহ্বান জানিয়ে মহানবীর বিভিন্ন সম্মানসূচক উপাধি স্মরণ করেছেন। কেউ তাঁকে মোস্তফা (নির্বাচিত), কেউ কমলিওয়ালা (কমলি বা চাদরধারী), কেউ খোদার হাবীব (আল্লাহর প্রিয়তম), আবার কেউ আহমদ নামে ডাকছে। ভক্তদের কাছে তাঁর প্রতিটি নামই প্রেম, শ্রদ্ধা ও আশীর্বাদের উৎস।
গানের শেষাংশে কবি দেখিয়েছেন, মহানবীর প্রেমে মানুষ কিংবদন্তির প্রেমিক
মজনুর চেয়েও অধিক আত্মহারা ও প্রেমাসক্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর নামের প্রেমে সবাই গীত-নৃত্যে আত্মবিস্মৃত হয়ে আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন হচ্ছে। এখানে এই প্রেম কোনো জাগতিক আসক্তি নয়; বরং মহানবীর আদর্শ, চরিত্র ও আল্লাহপ্রেমের প্রতি গভীর আধ্যাত্মিক ভালোবাসার প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪৩) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ১ মাস।
-
গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত
সংগ্রহ,[নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। সংখ্যা ৯০৪। পৃষ্ঠা:
২৭৮]
- রেকর্ড: টুইন [মে ১৯৩৬
(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪২)। এফটি ৪৪০০। শিল্পী: আব্দুল লতিফ। সুর: নজরুল
ইসলাম]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ রসুল। বন্দনা