ভাষাংশ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর রচনাবলী
রচনাবলী সূচি

মহুয়া
 


 

                   দীনা
তোমারে সম্পূর্ণ জানি হেন মিথ্যা কখনো কহি নি,
        প্রিয়তম, আমি বিরহিণী
            পরিপূর্ণ মিলনের মাঝে ।
                মোর স্পর্শে বাজে
       যে-তন্ত্রটি তোমার বীণায়,
তাহারি পঞ্চম স্বরে তোমারে কি নিঃশেষে চিনায়
             তোমার বসন্তরাগে,
     নিদ্রাহীন রজনীর পরজে বেহাগে ।
    সে তন্ত্র সোনার বটে — বিভাসে ললিতে
           যে কথা সে চেয়েছে বলিতে
তাইতে হয়েছে পূর্ণ এ আমার জীবন-অঞ্জলি ।
        তবু সত্য করে বলি,
               ব্যথা লাগে বুকে

      যখন সহসা আসি তোমার সম্মুখে
             নিভৃতে তোমার ঘরে
     স্বপ্নভাঙা প্রথম প্রহরে —
             যখন জাগে নি পাখি, রক্তিম আকাশে
    আসন্ন অরণ্যগাথা নব সূর্যোদয়-আশে
            রয়েছে স্তম্ভিত,
পিঙ্গল আভায় দীপ্ত জটা-বিলম্বিত
          অরুণ সন্ন্যাসী
করজোড়ে আছে স্থির আলোকপ্রত্যাশী —
তখন তোমার মুখ চেয়ে দেখিয়াছি ভয়ে ভয়ে,
        জেনেছি হৃদয়ে
             তুমিই অচেনা ।
       কোনো দিন ফুরাবে না
পরিচয় ; তোমারে বুঝিব আমি করি না সে আশা,
কথায় যা বল নাই, আমি-যে জানি না তার ভাষা ।
            ভয় হয় পাছে
     যে-সম্পদ চেয়েছিলে মোর কাছে
সে-যে মোর নাই, তাই শেষে পড়ে ধরা,
দেখ দূর হতে এসে জলাশয়ে জল নাই ভরা ।
     তখন নিয়ো না যেন অপরাধ মোর,
           হোয়ো না কঠোর ।
তুমি যদি মুগ্ধ মনে ভুলে থাক, তবু
গভীর দীনতা মোর গোপন করি নি আমি কভু ।
      মোর দ্বারে যবে এলে অন্যমনা
সে কি মোর কিছু নিয়ে পুরাতে কামনা ।
নহে নহে, হে রাজন, তোমার অনেক ধন আছে,
       তাই তুমি আস মোর কাছে
দেবার আনন্দ তব পূর্ণ করিবার লাগি ;
যদি তাই পূর্ণ হয়, তবে আমি নহি তো অভাগী ।

৪ সেপ্টেম্বর ১৯২৮