২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ (গ্রেগরীয় বর্ষাপঞ্জী)
১২ ফাল্গুন, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ (বাংলা পঞ্জিকা)
১ মোহরম, ১৩৯১ হিজরী
বৃহস্পতিবার
সূর্যোদয়: ঢাকা- ভোর ৬:২৮ মিনিট (প্রায়)
সূর্যাস্ত: ঢাকা- সন্ধ্যা ৫:৫৯ মিনিটে (প্রায়)
বাংলাদেশের -এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলি
১.অনিশ্চয়তার কালো মেঘ: ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হলেও, পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী এবং পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর পক্ষ থেকে একের পর এক শর্ত ও তালবাহানা শুরু হওয়ায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আজ জনমনে তীব্র ক্ষোভের পাশাপাশি এক গভীর অনিশ্চয়তা দানা বেঁধেছে।
২. বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অবস্থান: ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আজ বঙ্গবন্ধুর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক
দলের নেতা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ অব্যাহত ছিল। বঙ্গবন্ধু সকল
পরিস্থিতিতে জনগণকে ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সাথে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
শাসকগোষ্ঠী যাতে কোনোভাবেই ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে,
সেজন্য তিনি কৌশলী ও অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করছেন।
৩.আন্দোলনের প্রস্তুতি ও জনসচেতনতা: কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আজ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে গোপন ও প্রকাশ্য সভার মাধ্যমে চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রস্তুতির ডাক দিয়েছে। তারা প্রতিটি গ্রামে, পাড়ায় ও মহল্লায় প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ওপর জোর দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্লোগান উঠেছে—‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।
আঞ্চলিক আন্দোলন
- যশোর
জনপ্রতিরোধের প্রস্তুতি: যশোরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ যৌথভাবে বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় ‘প্রতিরোধ সেল’ গঠন শুরু করে। এদিন যশোর শহরের এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে মাইকিং করে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।
শ্রমিকদের সংহতি: স্থানীয় বিড়ি শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকরা একটি বিশাল মিছিল করে শহরে। মিছিল থেকে "বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো" স্লোগানটি প্রকট হয়ে ওঠে, যা স্পষ্টতই সাধারণ মানুষের চরম ধৈর্যের সীমা অতিক্রমের ইঙ্গিত ছিল।
- চট্টগ্রাম
বন্দরের কর্মতৎপরতা: চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় আজ শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছিল। বহিরাগত বা পাকিস্তানি জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর কোনো খবর পাওয়া গেলেই তা প্রতিরোধের জন্য বন্দর শ্রমিকরা পাহারায় নিযুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করে।
প্রতিবাদ সভা: চট্টগ্রাম কলেজ মাঠে এদিন এক ঘরোয়া আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সেখানে স্থানীয় নেতাদের মূল বক্তব্য ছিল—ভুট্টো এবং সামরিক বাহিনীর গোপন আঁতাত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবকরা নজরদারি বাড়াতে শুরু করে।
- সিলেট
চা শ্রমিকদের অংশগ্রহণ: সিলেটের রাজনীতিতে চা শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার জন্য এদিন স্থানীয় নেতারা বাগান এলাকায় গোপন বৈঠক করেন। চা বাগানের দুর্গম এলাকাগুলোতে যাতে পাকিস্তানি বাহিনী কোনোভাবেই অবস্থান নিতে না পারে, সে জন্য স্থানীয় পাহাড় ও রাস্তাঘাট সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা হয়।
সাংস্কৃতিক জাগরণ: সিলেটের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ও পাঠাগারে আজকের দিনে রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীতের আসর বসার চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় ছিল—কীভাবে রেডিও বা খবরের কাগজের খবরের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব প্রচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।
- রাজশাহীতে আন্দোলন: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোতে উত্তজনা ছিল তুঙ্গে। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) এবং স্থানীয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা এক যৌথ সভায় মিলিত হন। তারা শপথ নেন যে, ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বানচালের যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা: নগরীর ‘সাহেব বাজার’ ছিল আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের উপস্থিতিতে বড় ধরনের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা স্পষ্টভাবে বলেন, "বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই আমাদের চূড়ান্ত নির্দেশ।"
- পাবনা শহরের প্রস্তুতি: প্রধান কেন্দ্রগুলোতে আজ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মতৎপরতা ছিল তুঙ্গে। শহরের বিভিন্ন মোড়ে লিফলেট বিলি করা হয়, যেখানে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরের গড়িমসিকে ‘চক্রান্ত’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
পাবনার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের বাসভবনে রাজনৈতিক কর্মীরা জড়ো হয়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানের অপেক্ষায় থাকার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়।
- রংপুরের আন্দোলন: রংপুর কারমাইকেল কলেজ ও তৎকালীন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিশাল প্রতিবাদী মিছিল বের হয়। শিক্ষার্থীরা শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘পায়রা চত্বর’ এবং ‘জাহাজ কোম্পানি মোড়’-এ সমবেত হয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তাদের মূল বক্তব্য ছিল—নির্বাচনের রায় অস্বীকার করলে পাকিস্তান ভেঙে যাবে।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আজ স্থানীয় নেতাদের এক জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বানচালের যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রংপুরবাসী সব ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্রস্তুত।
সমসাময়িক বিশ্ব্ব
- উগান্ডা: ইদি আমিনের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও আন্তর্জাতিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। সংবাদমাধ্যমগুলো দেশটিতে চলমান ভীতি ও অরাজকতার বিশদ বিবরণ তুলে ধরছে।
- যুক্তরাজ্য: ডাক ধর্মঘটের অষ্টম দিনে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। ধর্মঘটী কর্মীদের দাবি মেনে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি বা ইচ্ছা সরকারের নেই, যার ফলে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
- উপসাগরীয় যুদ্ধ (৪১তম দিন): জোট বাহিনীর অভিযানে ইরাকি বাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যুহ আরও ভেঙে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সমাজ কুয়েতে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয়ের ভয়াবহতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং এটি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব (ইতিহাসের এই দিনে)
- ১৫৮২: পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ ‘ইন্টার ক্যালারিদাসে’ নামক পোপীয় আদেশনামা জারির মাধ্যমে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জী প্রবর্তন করেন, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বাধিক ব্যবহৃত ক্যালেন্ডার।
- ১৯৪৬: হুয়ান পেরন আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, যা দেশটির আধুনিক ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করে।
জন্ম
- ১৮১০—হেনরি ক্যাভেন্ডিশ: ব্রিটিশ বিজ্ঞানী যিনি হাইড্রোজেনের বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার এবং পৃথিবীর ভর পরিমাপের জন্য বিখ্যাত।
মৃত্যু
- দিনা পাঠক: প্রখ্যাত ভারতীয় অভিনেত্রী ও নাট্যকার।
সূত্র:
- বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র:
- বিভিন্ন পত্রপত্রিকা