২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ (গ্রেগরীয় বর্ষাপঞ্জী)
১৪ ফাল্গুন, ১৩৭৭ বঙ্গাব্দ (বাংলা পঞ্জিকা)
৩ মোহরম, ১৩৯১ হিজরী
শনিবার
সূর্যোদয়: ঢাকা- ভোর ৬:২৬ মিনিট (প্রায়)
সূর্যাস্ত: ঢাকা- সন্ধ্যা ৫:৫৯ মিনিটে (প্রায়)
বাংলাদেশের -এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ঘটনাবলি
১.উদ্বেগ ও অস্থিরতা: ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আসন্ন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এবং পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর টালবাহানা ও সামরিক প্রস্তুতির খবরে পুরো পূর্ব পাকিস্তানে চরম উত্তেজনা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। আজ সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন ছিল—‘পাকিস্তান কি সত্যিই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, নাকি তারা সামরিক চক্রান্ত করছে?’
২. আন্দোলনের প্রস্তুতি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ ইউনিটগুলো আজ সারা দেশে ‘প্রতিরোধ দিবস’ পালনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে। সারা দেশের প্রতিটি মহকুমা ও জেলা পর্যায়ে ছাত্র-জনতা লাঠি ও বাঁশের লাঠি হাতে প্রশিক্ষণের মহড়া শুরু করে। স্লোগান উঠেছে—‘অধিবেশন নস্যাৎ করলে, বাংলা হবে স্বাধীন’।
৩.বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের অপেক্ষায়: ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আজ বঙ্গবন্ধুর সাথে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নেতাদের বৈঠক হয়। তিনি সবাইকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি যেকোনো আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আলোচনা হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে, বাঙালির অধিকার হরণের বিনিময়ে নয়।
আঞ্চলিক কার্যক্রম
- চট্টগ্রাম
বন্দরনগরীতে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। বন্দর শ্রমিকরা পাকিস্তানি জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর কোনো খবর পাওয়া গেলে তা ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করে। লালদীঘি ময়দানে ছাত্ররা স্থানীয় জনগণের সাথে মিলে ‘প্রতিরোধ কমিটি’র সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর কাজ চালিয়ে যায়।
- যশোরে এমএম কলেজের ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করে ঘোষণা দেয় যে, ৩ মার্চের অধিবেশন ভণ্ডুল হলে যশোরকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন থেকে মুক্ত ঘোষণা করা হবে। শহরজুড়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর মহড়া ছিল চোখে পড়ার মতো।
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্র ঐক্যের এক নজিরবিহীন সভা হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, যদি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, তবে রাজশাহী থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ শুরু হবে এবং সরকারি অফিসগুলো অচল করে দেওয়া হবে।
- সিলেটের চা বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে একটি বিশাল সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালানো হয়। স্থানীয় নেতারা গোপনে পরিকল্পনা করেন কীভাবে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হয়।
- পাবনার স্থানীয় নেতারা বড়াল নদীর পাড়ে এক গোপন সভায় মিলিত হন। আলোচনার বিষয় ছিল—কীভাবে পাবনা শহরের প্রতিটি পাড়ায় লাঠিয়াল বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক গঠন করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা যায়।
- রংপুর কারমাইকেল কলেজের মাঠে বিশাল সমাবেশ থেকে দাবি ওঠে—"নির্বাচনের রায় মানতে হবে, অন্যথায় রক্ত ঝরবে।" উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হওয়ায় রংপুরের স্থানীয় নেতারা রেল ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেন।
সমসাময়িক বিশ্ব্ব
- উগান্ডা: ইদি আমিনের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের তীব্রতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মহল উগান্ডার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার দাবি তুলেছে।
- যুক্তরাজ্য:
ডাক ধর্মঘট অব্যাহত। ব্রিটিশ সরকার ইউনিয়ন নেতাদের সাথে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানানোয় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে।
- উপসাগরীয় যুদ্ধ (৪৩তম দিন):
জোট বাহিনীর বিমান হামলার তীব্রতায় ইরাকি বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ছে। যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি কুয়েতের পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব (ইতিহাসের এই দিনে)
- ১৯৩৩: জার্মান পার্লামেন্ট বা রাইখস্টাগ ভবনে রহস্যময় অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা হিটলারকে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন করার ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ করে দেয়।
- ১৯৯১: মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ কুয়েত মুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেন এবং উপসাগরীয় যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যায়।
জন্ম
- ১৯০২—জন স্টাইনবেক: বিখ্যাত আমেরিকান ঔপন্যাসিক (নোবেল বিজয়ী, 'দ্য গ্রেপস অফ র্যাথ'-এর লেখক)।
- ১৯৩২—এলিজাবেথ টেইলর: কিংবদন্তি হলিউড অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী।
মৃত্যু
- ১৯৮৯—কনরাড লরেঞ্জ: অস্ট্রিয়ান প্রাণিবিজ্ঞানী ও এথোলজির জনক (নোবেল বিজয়ী)।
- ২০১১—নজমুল হুদা: বিখ্যাত বাংলাদেশী সাংবাদিক ও কবি।
সূত্র:
- বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র:
- বিভিন্ন পত্রপত্রিকা