হিন্দু মেলা
ব্রিটিশ ভারতে তদানীন্তন হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে স্বাদেশিকতার ভাব জাগরিত করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত একটি মেলা। এই জন্য এই মেলাকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের স্বদেশী আন্দোলনের পূর্বসূরি বলে মনে করা হয়। একই কারণে এই মেলাটি  জাতীয় মেলা ও স্বদেশী মেলা নামেও পরিচিতি লাভ করে।

এই মেলাটির আয়োজনের পিছনে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের একটি প্রবন্ধের বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে [১২৭২ বঙ্গাব্দ] দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচালিত  ব্রাহ্মসমাজের সাথে কেশবচন্দ্র এবং তাঁর অনুগামীদের ভিতরে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। এই সূত্রে কেশচন্দ্র তাঁর সম্পাদিত  'Indian Mirror' নামক পত্রিকাটির সাথে সম্পর্কিত সকল কাগজপত্র নিজের বাসায় নিয়ে যান। উল্লেখ্য এই পত্রিকাটি সে সময়ে ব্রাহ্মসমাজের পত্রিকা হিসেবে পরিচিত ছিল। কেশবচন্দ্রের এই আচরণে দেবেন্দ্রনাথ মনে কষ্ট পান। তিনি কেশবচন্দ্রের সাথে কোনো বাক্‌বিতণ্ডায় না গিয়ে, ব্রাহ্মসমাজের জন্য 'National Paper' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। এই পত্রিকার সমস্ত ব্যয়ভারের দায়িত্ব নেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। নবগোপাল মিত্রের সম্পাদনায় এই পত্রিকাটি সম্ভবত ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ৭ই অগাষ্টে প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় রাজেন্দ্রনারায়ণ বসু'র Prospectus of Society for the Promotion of National Felling among the Educated Natives of Bengal' নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ত্ত্ত্ববোধিনী পত্রিকার চৈত্র সংখ্যায় পুনর্মুদ্রিত হয়। এই প্রবন্ধটি ছিল, রাজেন্দ্রনারায়ণ বসুর মেদেনীপুরস্থ 'জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভার' কার্যাবলির জন্য অনুষ্ঠান পত্র। পরে তৎকালীন ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক উমেশচন্দ্র দত্ত প্রবন্ধটির অনুবাদ করেন। এই অনুবাদটি রাজানারায়ণ বসুর 'বিবিধ প্রবন্ধ' গ্রন্থের (১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। অনূদিত এই প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল 'শিক্ষিত বঙ্গবাসিগণের মধ্যে জাতীয় গৌরবেচ্ছা সঞ্চারিণী সভা সংস্থাপনের প্রস্তাব'।

এই প্রবন্ধটির আদর্শে নবগোপাল মিত্র একটি বাৎসরিক স্বদেশী মেলা উৎযাপনের উদ্যোগ নেন। এবং তিনি কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ৩০ চৈত্র ১২৭৩ বঙ্গাব্দে এই মেলার আয়োজন চূড়ান্ত করেন। সেই থেকে হিন্দু মেলার সূত্রপাত।

প্রথম অধিবেশন: চৈত্র মেলা

স্থান: আশুতোষ দেবের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ি। [এই বাগনাবাড়িটি সে সময়ে ডন ক্যাস্টরের বাগান বা ডান্‌কিন সাহেবের বাগান নামেও পরিচিত ছিল। ]
সময়: ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই এপ্রিল  [শুক্রবার, ৩০ চৈত্র ১২৭৩ বঙ্গাব্দ]
সম্পাদক:  গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর
সহ-সম্পাদক: নবগোপাল মিত্র।

রাজেন্দ্রনারায়ণ বসুর মেদেনীপুরস্থ 'জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভার' কার্যাবলির জন্য অনুষ্ঠান পত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে, ন্যাশনাল পেপার-এর সম্পাদক নবগোপাল মিত্র একটি মেলার আয়োজনের প্রস্তাব করেন। এই আয়োজনে প্রধান পরামর্শক হিসেবে এগিয়ে আসেন দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই মেলাটিকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য প্রবল উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়েন গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর। চৈত্রসংক্রান্তিতে এই মেলার আয়োজন করা হয়, এই কারণে এর নামকরণ হয় চৈত্র মেলা।

দ্বিতীয় অধিবেশন: চৈত্র মেলা

স্থান: আশুতোষ দেবের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ি।
সময়:
১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল [শনিবার ৩০ চৈত্র ১২৭৪ বঙ্গাব্দ] হিন্দু মেলার দ্বিতীয় দ্বিতীয় অধিবেশন হয়।
সম্পাদক:  গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর
সহ-সম্পাদক: নবগোপাল মিত্র।

এবারে মেলায় কয়েকটি বিভাগের নাম এবং বিভাগের সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। এই বিভাগগুলো ছিলো
সাধারণ বিভাগ, প্রগতি বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ, প্রদর্শনী বিভাগ, সংগীত বিভাগ এবং ব্যায়াম-শিক্ষা বিভাগ।

বেলা দশটায় ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এই মেলা উপলক্ষে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'মিলে সবে ভারতসন্তান গান'টি পরিবেশিত হয়।  উল্লেখ্য এই গানটি ভারতের প্রথম জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা অর্জন করে্ছিল। এছাড়া এই মেলা উপলক্ষে রচিত আর যে সকল গান ও কবিতা পরিবেশিত হয়েছিল, সেগুলো হলো

এছাড়া এই অধিবেশনে দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী, ব্যায়াম, রাসায়নিক পরীক্ষা প্রদর্শিত হয়েছিল।

এই অধিবেশনে একটি স্থায়ী কমিটি গঠনের উদ্যাগ নেওয়া হয়েছিল। এই অধিবেশনে শরীর গঠনের জন্য একটি ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পাশ হয়। সেই সূত্রে সার্কুলার রোডের ধারে ৬৪ নম্বর ফরিদ পুকুর  লেনে শিবচন্দ্র গুহের বাগানবাড়িতে একট ব্যায়াম-শিক্ষালয় খোলা হয়। এরপর ৭ই ডিসেম্বর চোরাবাগানে গোপালচন্দ্র সরকারের প্রিপারেটরি ইনস্টিটিউশন ভবনে আর একটি ব্যায়াম-শিক্ষা কেন্দ্র চালু হয়।

তৃতীয় অধিবেশন: চৈত্র মেলা

স্থান: আশুতোষ দেবের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল [রবিবার ৩০ চৈত্র ১২৭৫ বঙ্গাব্দ]।
সম্পাদক:  গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর
সহ-সম্পাদক: নবগোপাল মিত্র।


এবারের সভার সভাপতিত্ব করেন ঈশ্বরচন্দ্র ঘোষাল।
এই অধিবেশনে মোট ১১টি জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়েছিল। এর ভিতরে ছয়টি ছিল নতুন গান। এই মেলা উপলক্ষে জাতীয় সঙ্গীত রচনায় একটি উদ্যম লক্ষ্য করা যায়। গান ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ পাঠ করা হয়। 'স্ত্রী-শিল্পজাত' নামে মেয়েদের তৈরি দ্রব্যাদির উৎকৃষ্টতা বিবেচনা করে, কয়েকজন মহিলাকে পুরষ্কৃত করা হয়।

এই বছরে মেলার সময় এপ্রিল মাসের পরিবর্তে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধরাণের প্রস্তাব উঠে। এই প্রস্তাব অনুসারে এই মেলার বাৎসরিক অধিবেশনের  সময় নির্ধরিত হয়, প্রতি বৎসর ফাল্গুন মাসের প্রথম শনি ও রবিবার।

চতুর্থ অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: আশুতোষ দেবের বেলগাছিয়ার বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২-১৩ ফেব্রুয়ারি [শনিবার ও রবিবার,  ২ ও ৩ ফাল্গুন, ১২৭৬ বঙ্গাব্দ]।
সম্পাদক:  ১২৭৬ বঙ্গাব্দের ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ গণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয়। এই কারণে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দেবেন্দ্র মল্লিক।
সহ-সম্পাদক: নবগোপাল মিত্র।

এই মেলাটির সময় পরিবর্তন হওয়ায় 'চৈত্র মেলা' নামটি পরিত্যক্ত হয়। এই সময় থেকে মেলাটি 'জাতীয় মেলা' নামে স্বীকৃতি লাভ করে। এই মেলা উপলক্ষে শনিবার সমস্ত সরকারি স্কুল ও কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষিত হয়। শনিবার বিকালে সাড়ে চারটায় সভাপতি রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুরের একটি বাংলা ভাষণের মধ্য দিয়ে মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলার প্রথম দিনে প্রায় তিন হাজার লোকের সমাগম হয়। তবে দ্বিতীয় দিনে সারাদিনে প্রায় কুড়ি হাজার লোকের আনাগোনায় মেলটি জমজমাট হয়ে উঠে। এই মেলায় নানা ধরনের কৃষিপণ্য এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি, শিল্পকার্যের নমুনা প্রদর্শিত হয়। মেলার আকর্ষণীয় দিক ছিল সঙ্গীত, ভোজবাজি, বালকদের ব্যায়াম, ঘোড়দৌড়, সাঁতার, নৌকাচালনা ইত্যাদি।

পঞ্চম অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: নৈনানে হীরালাল শীলের বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭১  খ্রিষ্টাব্দের ১১-১৩ ফেব্রুয়ারি [শনি-সোম,  ৩০ মাঘ, ১-২ ফাল্গুন, ১২৭৭ বঙ্গাব্দ]।
সভাপতি: রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুর।
সম্পাদক:  ১২৭৬ বঙ্গাব্দের ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ গণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয়। এই কারণে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দেবেন্দ্র মল্লিক।
সহ-সম্পাদক: নবগোপাল মিত্র।

আগের অধিবেশনগুলোর মতোই এই অধিবেশনেও নানা ধরনের কৃষিপণ্য এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি, শিল্পকার্যের নমুনা প্রদর্শিত হয় এবং বিভিন্ন ভাগে ভোজবাজি, বালকদের ব্যায়াম, ঘোড়দৌড়, সাঁতার, নৌকাচালনা ইত্যাদি হয়।

এই মেলা শেষ হয়ে যাওয়ার পর, এই মেলার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়ের উপর স্বতন্ত্র অধিবেশনে বক্তৃতা করেন বিভিন্ন বক্তা। এই অধিবেশনগুলো হয়েছিল ১৩নং কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটস্থ 'ক্যালকাটা ট্রেনিং এ্যাকাডেমি' ভবনে। এই বক্তাদের নাম এবং বক্তৃতাগুলো নিচে তুলে ধরা হল।

ষষ্ঠ অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: রাজা বৈদ্যনাথ রায়ের কাশীপুরস্থ বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭২  খ্রিষ্টাব্দের ১১-১৩ ফেব্রুয়ারি [রবি-মঙ্গল,  ৩০ মাঘ, ১-২ ফাল্গুন, ১২৭৮ বঙ্গাব্দ]।
সম্পাদক:  সম্পাদক দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সহ-সম্পাদক: নবগোপাল মিত্র।

এবারে মেলা চলাকালে আন্দামানের পোর্টব্লেয়ারে লর্ড মেয়োর নিহত হন। এই কারণে শোক প্রস্তাবের মাধ্যমে ২ ফাল্গুন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ষষ্ঠ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এই অধিবেশন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না।

সপ্তম অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: নৈনানে হীরালাল শীলের বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭৩  খ্রিষ্টাব্দের ১৫-১৭ ফেব্রুয়ারি [সোম-বুধ,  ৫-৭ ফাল্গুন, ১২৭৯ বঙ্গাব্দ]।
সম্পাদক:  সম্পাদক দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সহ-সম্পাদক: নবগোপাল মিত্র।

আগের অধিবেশনগুলোর মতোই এই অধিবেশনেও নানা ধরনের কৃষিপণ্য এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি, শিল্পকার্যের নমুনা প্রদর্শিত হয় এবং বিভিন্ন ভাগে ভোজবাজি, বালকদের ব্যায়াম, ঘোড়দৌড়, সাঁতার, নৌকাচালনা ইত্যাদি হয়।

অধিবেশনের তৃতীয় দিনে রাজনারায়ণ বসুর সভাপতিত্বে সীতানাথ ঘোষ 'বঙ্গের সংক্রামক জ্বরের কারণ' শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠা করেন।  উল্লেখ্য এই বিষয়ের উপর ভিত্তি করে ২৮শে জ্যৈষ্ঠ ভুবনমোহন সরকার একটি জাতীয় সভায় একটি বক্তৃতা করেন। উল্লেখ্য সে সময়ে বাংলায় ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
 

অষ্টম অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: সারকুলার রোডেস্থ পার্সি বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭৪  খ্রিষ্টাব্দের ১১-১৫ ফেব্রুয়ারি [বুধ-রবি,  ৩০ মাঘ-৪ ফাল্গুন, ১২৮০ বঙ্গাব্দ]।

এই মেলায় একটি কার্যকরী কমিটি তৈরি করা হয়। এই কমিটির পদ ও ব্যক্তিবর্গ ছিলেন

এই মেলায় প্রথম প্রবেশ-দক্ষিণা প্রবর্তন হয়। মূল্য ছিল ৮ আনা। এই অর্থের কিছু অংশ দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত অঞ্চলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। আগের অধিবেশনগুলোর মতোই এই অধিবেশনেও নানা ধরনের কৃষিপণ্য এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি, শিল্পকার্যের নমুনা প্রদর্শিত হয় এবং বিভিন্ন ভাগে ভোজবাজি, বালকদের ব্যায়াম, ঘোড়দৌড়, সাঁতার, নৌকাচালনা ইত্যাদি হয়।

নবম অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: সারকুলার রোডেস্থ পার্সি বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭৫  খ্রিষ্টাব্দে [১২৮১ বঙ্গাব্দ] এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেকালের পত্রিকাগুলোতে তারিখের হেরফের লক্ষ্য করা যায়। ধারণা করা হয়, ৩০শে মাঘ থেকে ৪ঠা ফাল্গুনের ভিতরে এই অধিবেশন বসেছিল।

রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুরের সভাপতিত্বে এই অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ প্রথম তাঁর স্বরচিত কবিতা 'হিন্দুমেলার উপহার' আবৃত্তি করেন। অবশ্য তাঁর আবৃত্তির কবিতাটি 'হিন্দুমেলার উপহার' কিনা এ নিয়ে বিতর্ক আছে। এ বিষয়ে তৎকালীন ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ পত্রিকায় (১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৫) প্রকাশিত সংবাদে লেখা হয়েছিল,

“Baboo Rabindranath Tagore, the youngest son of Baboo Debendranath Tagore, a handsome lad of some 15, had composed a Bengali poem on Bharat (India) which he delivered from memory; the suavity of his tone much pleased the audience.” (বাবু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরে পঞ্চদশবর্ষীয় কনিষ্ঠ পুত্র বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্বরচিত কবিতা মুখস্থ আবৃত্তি করে শ্রোতাদের বিমোহিত করেন।)

উল্লেখ্য পত্রিকায় উল্লেখিত বয়সের হিসাবটিতে ভুল ছিল। সে সময়ে রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ১৩ বৎসর ৯ মাস। এই মেলা উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের আঁকা একটি ছবি বাঁধাই করা হয়। এই ছবি বাঁধাইয়ের খরচের হিসেআব ঠাকুর বাড়ির হিসাবের খাতা থেকে জানা যায়। সম্ভবত 'হিন্দু মেলা'র চিত্র প্রদর্শনীতে এই ছবিটি স্থান পেয়েছিল। তবে এই ছবিটির সন্ধান পাওয়া যায় না।

 আগের অধিবেশনগুলোর মতোই এই অধিবেশনেও নানা ধরনের কৃষিপণ্য এবং কৃষির সাথে সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি, শিল্পকার্যের নমুনা প্রদর্শিত হয় এবং বিভিন্ন ভাগে ভোজবাজি, বালকদের ব্যায়াম, ঘোড়দৌড়, সাঁতার, নৌকাচালনা ইত্যাদি হয়। মেলাতে বিবিধ বিষয়ে প্রবন্ধও পঠিত হয়েছিল। 

দশম অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: রাজা বদনচাঁদের টালার বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭৬  খ্রিষ্টাব্দের ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি [৮-৯ ফাল্গুন ১২৮২ বঙ্গাব্দ] এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এই মেলায় মেয়েদের তৈরি কার্পেট, জুতো, টুপি, আসন, ছবি ইত্যাদি প্রদর্শিত হয়। এছাড়া কবিতা আবৃত্তি, গান, প্রবন্ধ পাঠ হয় অধিবেশনের বিভিন্ন অংশে।

একাদশ অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: রাজা বদনচাঁদের টালার বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৭৭  খ্রিষ্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি [রবিবার ৮ ফাল্গুন ১২৮২ বঙ্গাব্দ] এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এবারে মেলা উপলক্ষে বক্তৃতা শুরু হয়েছিল ২৯শে মাঘ থেকে। মেলার প্রধান দিন ৮ই ফাল্গুন, মেলাতে পুলিশ হামলা চালিয়ে সব আয়োজন পণ্ড করে দেয়। 'সমাচার চন্দ্রিকা' পত্রিকার মতে, জনৈক ইংরেজ তাঁর স্ত্রীকে সাথে নিয়ে মেলার জিমনেশিয়াম প্রদর্শেনর স্থানে আসেন। তিনি তাঁর স্ত্রীর বসার জন্য স্থানীয় দুইজন দর্শককে তাঁদের আসন ত্যাগ করতে বলেন। দর্শকদ্বয় এই আবেদন অগ্রাহ্য করলে, বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। শেষে স্থানীয় যুবকরা ইংরেজকে প্রহার করেন। এরপর উক্ত ইংরেজ থানার শরণাপন্ন হন। পুলিশ এসে কয়েকজন নিরাপরাধ যুবককে গ্রেফতার করলে, অন্যান্যরা পুলিশের হাত থেকে গ্রফতারকৃতদের ছিনিয়ে নেয়। এই সংবাদ থানায় পৌঁছালে, অতিরিক্ত পুলিশ এসে মেলাতে প্রবেশ করে। পুলিশ অধিবেশনের আয়োজন পণ্ড করে দেয় এবং কয়েকজন নিরাপরাধ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। 

রবীন্দ্রনাথ এই অধিবেশন উপলক্ষে একটি কবিতা ও গান রচনা করেছিলেন। সভা পরিত্যক্ত হ‌ওয়ায়, সভাস্থলে তিনি তা পরিবেশন করতে পারেন নি। তবে সভা প্রাঙ্গনে কবিতা (দিল্লীর দরবার) আবৃত্তি করেন এবং গানটি পরিবেশন করেছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথ কোন গানটি গেয়েছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনুমাননির্ভর যে তথ্য পাওয়া যায়, তা হলো

১. ভারত রে, তোর কলঙ্কিত পরমাণুরাশি [প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়]
২. অয়ি বিষাদিনী বীণা [গীতবিতান-সম্পাদক]

দ্বাদশ অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: মহারানী স্বর্ণময়ীর কাঁকুরগাছির বাগানে
সময়: ১৮৭৮  খ্রিষ্টাব্দের ৭-১১ ফেব্রুয়ারি [বৃহস্পতিবার-সোমবার ২৬ -৩০ মাঘ ১২৮৩ বঙ্গাব্দ]

এই অধিবেশন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না।

 

ত্রয়োদশ অধিবেশন: জাতীয় মেলা

এই অধিবেশন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায় না।

চতুর্দদশ অধিবেশন: জাতীয় মেলা

স্থান: ব্রজনাথ ধরের বাগানবাড়ি।
সময়: ১৮৮০  খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি [বুধবার ২৯ মাঘ ১২৮৫ বঙ্গাব্দ]

ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশান-এর প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জাতীয় নেতাদের স্বদেশী আন্দোলনের উপর বক্তৃতা ও রচনা'র কারণে এই জাতীয় মেলা বা হিন্দু মেলার বিষয়ে অনেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে এই মেলাটি মৃত্যর দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছিল। এই অধিবেশনের পরে হিন্দুমেলা সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

এই মেলার মৃত্যু হলেও, এ কথা সবাই একবাক্যে বলেন যে, স্বদেশী আন্দোলনের ভিত তৈরি হয়েছিল এই সভার মাধ্যমে।


সূত্র :
http://en.wikipedia.org/wiki/Hindu_College,_Kolkata