দহগ্রাম-আংগরপোতা ছিটমহল
ভারতের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত,
দহগ্রাম
বাংলাদেশের একটি ছিট মহল। সাধারণভাবে এটি
দহগ্রাম-আংগরপোতা ছিটমহল নামে পরিচিত। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার
পাটগ্রাম উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। পাটগ্রাম উপজেলা সদর হতে এর দুরত্ব ১০ কিমি। এর আয়তন
৩৫ বর্গমাইল। লোক সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার (২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ)।
এখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪টি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৪টি, বেসরকারি
উচ্চ বিদ্যালয় ১টি, দাখিল মাদ্রাসা ১টি, হাফেজিয়া মাদ্রাসা ১টি, এবতেদায়ী মাদ্রাসা
৫টি, হাটবাজার ৩টি, বিওপি ২টি, পুলিশ ফাঁড়ি ১টি, ১০ সজ্জা বিশিষ্ট হাসপাতাল ১টি,
মসসিদ ১৮টি, আশ্রয়ণ কেন্দ্র ১টি, রোটারি গ্রাম ১টি, আদর্শ গ্রাম ১টি, পরিবার
২২০০টি, স্যানিটেশন শতকরা ১ ভাগ, জমির পরিমাণ ১৮৭৮ হেক্টর, এর মধ্যে ১৫৮০ হেক্টর
আবাদি জমি, পাকা রাস্তা ১০ কিলোমিটার।
|
|
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাজনের সময়, তদানিন্তন বাংলা প্রদেশটি ব্রিটিশ শাসকেরা
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেয়। উল্লেখ্য এই বিভাজনে সে সময়
Radcliffe Commission
গঠিত হয়েছিল। এই বিভাজনের সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে এই অংশটি তদানীন্তন
পূর্ব-পাকিস্তানের অংশে যুক্ত হয়। কিন্তু কার্যত দেখা যায়, এই অংশটি নব্য ভারত
প্রজাতন্ত্রের ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত। ফলে এটি ছিল ভারতে অবস্থিত পাকিস্তানের
বৃহত্তম ছিট মহলে হিসেবে চিহ্নিত হয়।
১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পাকিস্তান দাবি করে যে, দহগ্রাম পূর্ব-পাকিস্তানের মূল
ভূখণ্ডের সাথে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু মানচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, এটি
পূর্ব-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৮৫ মিটার পশ্চিমে অবস্থিত। তখন থেকে দহগ্রাম
নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে ১৯৭৪
খ্রিষ্টাব্দের ১৬ মে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও
বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ছিট মহল সংক্রান্ত বিরোধ নিরসনের জন্য চেষ্টা করা। কিন্তু
এই দীর্ঘদিন চুক্তি বাস্তবায়িত হয় নাই। ফলে ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের তৎকালীন
প্রেসিডেন্ট এইচ.এম. এরশাদ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির মধ্যে আবারও
এই বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তিও বিশেষভাবে কার্যকর হয় নাই। ইতিমধ্যে ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহলকে পাটগ্রাম উপজেলার
একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন (দহগ্রাম ইউনিয়ন) হিসেবে পরিগণিত হয়। আর ১৯৮৯
খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগষ্ট মাসে এখানে ইউনিয়ন পরিষদের শুভ উদ্বোধন ঘটে।
১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুন এক ইজারা চুক্তির মাধ্যমে উক্ত তিন বিঘা বাংলাদেশ লাভ করে। এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ ও দহগ্রামের মধ্যে যাতায়াতের জন্য ৩০ মিটার প্রশস্ত একটি করিডোরের ব্যবস্থা করা হয়। এই স্থানটি তিন বিঘা করিডোর নামে পরিচিত। প্রথম দিকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১ ঘন্টা পর পর করিডোর দিয়ে বাংলাদেশীদের যাতায়াতের সুযোগ ছিল। এরপর করিডোর দিন-রাত খোলা রাখার জন্য দাবি উত্থাপিত হলে ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ এপ্রিল থেকে তা সকাল ৬-৩০ মিনিট হতে সন্ধ্যা ৬-৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সর্বশেষ গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকাতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধান মন্ত্রী মনমোহন সিং-এর বৈঠকে স্বাক্ষরিত চুক্তি মোতাবেক, বাংলাদেশীদের যাতায়াতের জন্য তিনবিঘা করিডোর বর্তমানে ২৪ ঘন্টা খোলা রাখার অঙ্গীকার করা হয়। ওই বছরের ১৯শে অক্টোবর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দহগ্রাম ও আঙ্গোরপোতা’ সফরের মধ্য দিয়ে এই পথ ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।