বেণু
দক্ষিণ ভারতীয় বাঁশের তৈরি বাঁশি।
দক্ষিণ ভারতে ভাষাভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন নাম পাওয়া যায়। যেমন- এটাকে পুল্লাঙ্কুঝল (তামিল), কোলালু (কন্নড়), পিল্লানা গ্রোভি বা ভেনুভু
(তেলুগু) বলা হয়।
সাধারণভাবে প্রাচীন ভারতে সুষির যন্ত্র হিসেবে বাঁশির প্রচলন ছিল। সংস্কৃত ভাষায়
ব্যবহৃত বেণুর সমার্থক শব্দ বাঁশি। প্রাচীন ভারতে বেণু তৈরি হতো বাঁশ, কাঠ, নল
খাগড়া ইত্যাদি দিয়ে। এর ভিতরে বাঁশ থেকে সৃষ্ট বেণুকে বিশেষভাবে বাঁশি
নামে অভিহিত করা হয়েছিল। এই অর্থে দক্ষিণ ভারতের এই যন্ত্রটি মূলত বাঁশি।
প্রাচীনকাল থেকে বেণু বা বাঁশি দক্ষিণ ভারতের লোকসঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে শরভ শাস্ত্রী এবং পরবর্তীকালে টি.আর. মহালিঙ্গম লোক গানে ব্যবহৃত বাঁশীকে দক্ষিণ ভারতের শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের উপযোগী করে তোলেন। এঁরা মূলত
লোক গানে ব্যবহৃত বাঁশির আদলে মোটা দেওয়ালের বাঁশ ব্যবহার করেন এবং স্বর ও সুরশৈলীর
উপযোগী করার জন্য এতে অতিরিক্ত ছিদ্র যোগ করেন।
এ ছাড়া এঁরা এই যন্ত্রটি বাজানোর বিশেষ কৌশলও চালু করেন।
- নির্মাণ: সম্পূর্ণ বাঁশ দিয়ে তৈরি। বাঁশের দেয়াল মোটা, যাতে ধ্বনি আরও গভীর ও
সুরেলা হয়।
বাঁশের প্রাকৃতিক গিট দিয়ে এক প্রান্ত বন্ধ রাখা হয়, অন্য প্রান্ত খোলা থাকে।
- ছিদ্র সংখ্যা: ৮টি স্বর প্রকাশের ছিদ্র, ১টি ফুঁ দেওয়ার ছিদ্র।
- দৈর্ঘ্য: সাধারণত ৩০-৬০ সেমি। স্কেল অনুসারে এর দৈর্ঘ্যের হেরফের হয়।
- ধ্বনি ও বৈশিষ্ট্য: খুবই সুষম, মসৃণ এবং প্রায় যথার্থ সাইন তরঙ্গ-এর মতো গোলাকার শব্দতরঙ্গ
সৃষ্টি হয়। সঙ্গীতোপযোগী শব্দের বিচারে এর ভিত্তি ধ্বনি প্রবল। সমমেল ধ্বনির
প্রাবল্য কম। দুই থেকে আড়াই অক্টেভ পর্যন্ত সুর তোলা যায়। এতে গমক, আন্দোলন, মীড় এবং সূক্ষ্ম অলঙ্কারণ সহজে করা যায়। এজন্য
প্রয়োজন হয় নিখুঁত আঙুল সঞ্চালন মুখের বায়ুসঞ্চালন কৌশল।
- ইতিহাস ও গুরুত্ব: ভরতের নাট্যশাস্ত্র এ উল্লেখ আছে।
সনাতন হিন্দু ধর্মের পৌরাণিক আদর্শে উদযাপিত হোরি এবং কাজরী গানে কৃষ্ণের মুরলী
নামক বেণুর নাম পাওয়া যায়।
১৯শ শতাব্দীতে শারভা শাস্ত্রী এবং পরে টি.আর. মহালিঙ্গম এই অনুষঙ্গ যন্ত্র হিসেবে
ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে এর গঠনশৈলীর পরিবর্তন করেছিলেন। বর্তমান দক্ষিণ ভারতীয়
লোকগানে, চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীতে বা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত গানের অনুষঙ্গী যন্ত্র
ব্যবহৃত হয়। এছাড়া আজকাল বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়—ক্লাসিক্যাল, ফোক, জ্যাজ এমনকি ওয়েস্টার্ন মিউজিকেও ব্যবহার হয়।
বিখ্যাত শিল্পী
বেণুকে বিশ্বমঞ্চে জনপ্রিয় করার পেছনে বেশ কয়েকজন কিংবদন্তি শিল্পীর অবদান রয়েছে।
এঁরা হলেন-
- টি. আর. মহালিঙ্গম (মালি): তিনি বেণু বাজানোর কৌশলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন।
- এন. রমণী: আধুনিক কর্ণাটকী বাঁশির অন্যতম প্রধান দিকপাল।
- সিক্কিল সিস্টার্স: দুই বোন কুঞ্জুমণি ও নীলা তাঁদের যুগলবন্দীর জন্য বিখ্যাত।
- শশাঙ্ক সুব্রহ্মণ্যম: বর্তমান প্রজন্মের একজন বিশ্বখ্যাত শিল্পী।