১. অনুভবজাত জ্ঞান: এই জ্ঞান মানুষ অনুভবের মাধ্যমে প্রথম অর্জন করে। প্রতিটি মৌলিক অনুভূতি জন্ম দেয়, এই অনুভূতি থেকে জন্ম নেয় উপলব্ধি এবং সবশেষে তা অভিজ্ঞা হিসেবে স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়। আর অনুভবের নানা রূপ অবলম্বনে জন্ম নেয় অনুভবজাত জ্ঞান।( Authoritarianism)-এর বিকাশ ঘটেছিল। এই মতবাদে ধরে নেওয়া হওয়া, সাধারণ মানুষ কোনো বিশেষ বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। একমাত্র যাঁরা ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে জ্ঞান দান করার ক্ষমতা লাভ করেন, তাঁরাই জ্ঞানীদের ভিতরে জ্ঞানী হয়ে উঠেন। এঁরা ঈশ্বরের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁদের কথা প্রামাণসাপেক্ষ্য নয়, অপ্রামান্য বিশ্বাসসাপেক্ষ্য। যেভাবেই হোক না কেন, যখন কোনো বিষয় কোনো মানুষের কাছে সত্য বলে প্রতীয়মান হবে, তখনই তার কাছে তা জ্ঞান হিসেবে বিবেচিত হবে। সত্যাশ্রয়ী জানার তারতম্যের কারণে মানুষে মানুষে জ্ঞানের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। জগতের যে কোনো বিষয়ের তথ্য নানাবিধ বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। সার্বিকভাবে একজন মানুষের পক্ষে কোনো সত্তার পূর্ণপরিচয় পাওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। সেই অর্থে কোনো মানুষই জ্ঞানী নয়। কোনো কোনো বিষয়ে কোনো একজন অনেকখানি জানতে পারে। এই অনেকখানি জানা হলো পরম জ্ঞানের অংশ মাত্র। এই অংশমাত্র জ্ঞান দিয়ে যে বিশ্বাসের জন্ম হয়, তা দিয়ে অনেককে মুগ্ধ করা যায়, কিন্তু পরমজ্ঞানের বিচারে তা ফাঁকি হয়েই থেকে যায়। এই কারণে 'আমি জানি' বলতে বুঝায় 'আমি যা জানি'। উল্লেখ্য, এখানে 'আমি' শব্দটি ব্যাকরণগত প্রথম পুরুষ সর্বনাম অর্থে ব্যবহৃত হয়নি; এটি ব্যক্তি-সত্তা বা জ্ঞাতাসত্তার প্রতীক। তাই 'আমি জানি' বলতে বোঝায়—আমার জ্ঞাতাসত্তা যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে, ততটুকুই। এক্ষেত্রে 'আমি জানি'-এর বদলে 'আমার মনে হয়', 'আমার মতে', 'আমার বিশ্বাস' ইত্যাদি অনেকটা নিরাপদ শব্দ।
২. মিশ্র জ্ঞান: একাধিক অনুভবের দ্বারা অভিজ্ঞাসমূহ জন্ম দেয় জ্ঞান। সে জ্ঞান আবার অন্যান্য জ্ঞানের সংমিশ্রণে সৃষ্টি করে একটি মিশ্র জ্ঞান। যেমন 'আগুনে হাত দিলে পুড়ে যায়' এটা যদি জ্ঞান হয়। তাহলে এর ভিতরে রয়েছে আগুন এবং এর হাত পুড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ের দুটি জ্ঞান। মানুষ যত ধরনের জ্ঞান অর্জন করে, তাকে প্রাথমিক পর্যায়ে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। এই ভাগ দুটি হলো−
- প্রত্যক্ষ-জ্ঞান: প্রত্যক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া জ্ঞান। কখনো কখনো ইন্দ্রিয়ের অক্ষমতা বা মনোযোগের অভাবে প্রত্যক্ষজ্ঞান সুচারুরূপে জন্মায় না। একজন বর্ণান্ধ মানুষ যদি লাল রঙ না দেখে, তাহলে তার কাছে লাল রঙ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান জন্মাবে না। অন্যমনস্ক থাকার জন্য, পৃথকভাবে কোনো বিষয় কোনো ব্যক্তিকে স্পর্শ নাও করতে পারে। প্রত্যক্ষ জ্ঞানের জন্য এই দুটি অপারগতা থেকে মুক্ত হতেই হয়।
- বিশ্বাসজাত-জ্ঞান: যা কোনো বিশ্বস্ত সূত্রে মানুষ গ্রহণ করে এবং সত্য বলে ধারণ করে। এমন কিছু বিষয় আছে যার সম্পর্কে অনুভূতি জন্মে বিশ্বাসের সূত্রে। পড়া বা শোনার মধ্য দিয়ে এই জ্ঞানের সঞ্চার হয়। যেমন- চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। এই বাক্যটির ভিতর দিয়ে যে সত্য প্রকাশিত হয়, তা বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া র কারণে। অধিকাংশ লোকই মহাকাশ গবেষক নন এবং তাঁদের এই বিষয়ে গবেষণার সুযোগও নেই। কিন্তু যে সকল মাধ্যম থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়, সে সকল মাধ্যম সত্যাশ্রয়ী তথ্যকে প্রকাশ করেন, এমন বিশ্বাস আমাদের মধ্যে কাজ করে। এমনটা আমাদের প্রাত্যহিক আটপৌরে জীবনেও ঘটে থাকে। কিছু মানুষের প্রতি এমন বিশ্বাস থাকে, যিনি মিথ্যা বলেন না। তাঁর কথা আমরা বিনা তর্কে মেনে নেই। উল্লেখিত আলোচনা সাপেক্ষে জ্ঞানকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়।
- প্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞান: এই জাতীয় জ্ঞান প্রাথমিকভাবে কোনো বিশ্বস্তসূত্র থেকে জন্মাতে পারে। কিন্তু এই জ্ঞান প্রমাণ দিয়ে দেখানো যায়। চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ, এই সত্যটি অধিকাংশ মানুষের কাছে বিশ্বাসের সূত্রে গড়ে উঠেছে। এর ভিতরে কেউ যদি এই বিশ্বাস যে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, তার প্রমাণ চায়। তাহলে দেওয়া সম্ভব। প্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞানের প্রমাণ, মানুষ ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভব করে প্রত্যক্ষভাবে গ্রহণ করতে চায়।
- অপ্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞান: এই জাতীয় জ্ঞানের ভিত্তি বিশ্বাস। কিন্তু এই বিশ্বাসকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দ্বারা উপস্থাপন করা যায় না। ধর্মগ্রন্থে আত্মা'র ধারণা যে জ্ঞান জন্ম দেয়, তা অপ্রামাণ্য বিশ্বাসজাত জ্ঞান। এই জাতীয় অনেক বিশ্বাস দিয়ে ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠিত। এই ধারণা থেকে জ্ঞানের প্রাধিকারবাদ
উচ্চতর জ্ঞান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নানা ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ধরা যাক, একটি ছোটো নদীর ওপারে যাওয়ার জন্য একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সমস্যা হলো ওপারে যাওয়া। কিভাবে তাড়াতাড়ি ওপারে যাওয়া যায়, এই সূত্রে চিন্তন কার্য শুরু হলো তার মনোজগতে। প্রথমে সিদ্ধান্ত নিলো কোনো নৌকার জন্য অপেক্ষা করা, সিদ্ধান্ত নিলো সাঁতরে পার হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ আপাতত তার কাছে দুটি সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য মনে হলো। এবার সে অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করবে। এইভাবে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি হবে বিচার-প্রক্রিয়া (judging) মানুষ প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত নেয় এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেই কোনো কাজ করতে পারে। অজস্র সিদ্ধান্তের সাগরে মানুষ কখনো ঠিক কাজটি করে, কখনো চরম ভুল করে। কর্মক্ষেত্রে এটা ঘটে থাকে, বিষয়ানুসারে অভিজ্ঞতার আলোকে যথাযথ বিচার-বিবেচনা না করার কারণে। অনেক সময়ই একজনের কার্যক্রম অন্যের কাছে যথার্থ মনে হয় না। সিদ্ধান্তের এই ভিন্নতার পিছনের কারণে, একে কয়েকটি স্তরে ভাগ করা যায়। যেমন
শিক্ষাব্যবস্থার প্রক্রিয়া, পারিবারিক ইচ্ছা, আর্থিক স্বচ্ছলতা ইত্যাদির দ্বারা তাড়িত হয়ে, পরিবারের অভিভাবকরা অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেয়। এর ফলে এই সব সন্তানদের স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। কোনো সুনির্দিষ্ট ইচ্ছায় আবদ্ধ থেকে সন্তানের কল্যাণ কামনায় যা সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা সন্তান এবং জাতির জন্য পরম কল্যাণ বয়ে আনে না।
যে কোনো সত্তার গুণমান অনুসারে একটি সত্তার পরিচয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়। সত্তার গুণগতবৈশিষ্ট্যসমূহ দিয়ে তৈরি হয় সত্তাগুণ। আর সত্তাগুণের সংস্পর্শে মানুষের নানা ধরনের অনভূতি সৃষ্টি হয়। এই অনুভব মানুষের মনোগত দশার সৃষ্টি করে। মনোগত দশায় তৈরি হয় সুপ্রজ্ঞা দশা (cognitive state)। এই সুপ্রজ্ঞাদশার মধ্য দিয়ে আরও উন্নততর যে দশায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয় 'চেতনা (consciousness)'। বলে রাখা ভালো- consciousness-এর বাংলা সচেতনতা এবং চেতনা। দুটো বিষয় এক নয়। মূলত ধারণার বিকাশ ঘটে চেতনার ভিতর দিয়ে। আর চেতনা মানুষকে সচেতন করে তোলে। এই সূত্রে পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করবো 'চেতনা ও ধারণা' নিয়ে।