জেনেভা কনভেনশান

কোনো দেশে যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত চলাকালীন সময়ে, সাধারণ জনগণকে খুন, জনসাধারণের সম্পত্তি লুণ্ঠন, ধর্ষণ, কারাগারে আটক ব্যক্তিকে বিনাবিচারে হত্যা, দেশের নগর, বন্দর, হাসপাতালে কোন ধরনের সামরিক উস্কানি ছাড়াই আক্রমণ বা ধ্বংস প্রভৃতিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। যুদ্ধপরাধকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে জেনেভা কনভেনশনকে মান্য করা হয়। মূলত এটি যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। ১৮৬৪  খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে সম্পাদিত চুক্তিসমূহের সাধারণ নাম।

জেনেভা কনভেনশনের প্রেক্ষাপট
১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত ফরাসি সেনানায়ক নেপোলিয়ানের বেলজিয়ামের ওয়াটার-লু যুদ্ধের পর থেকে, ইউরোপে ইতালির আধিপত্য বেড়ে যায়। ১৮৫৩-৫৬ খ্রিষ্টাব্দের অনুষ্ঠিত ক্রিমিয়ার যুদ্ধ, ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দের সলফেরিনো যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এ সকল যুদ্ধে হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয় এবং কয়েক সহস্র সৈন্য আহত অবস্থায় মরণযন্ত্রণা ভোগ করে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে থাকে। সে সময়ে সুইজারল্যান্ডের প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী এবং স্যার হেনরি ডুনান্ট যুদ্ধাহত এবং বেসামরিক নাগরিকদের দুর্দশা দেখে ব্যথিত হন। পরে তিনি যুদ্ধের বিভীষিকা নিয়ে 'মেমোয়ার অভ সলফেরিনো' নামক একটি বই প্রকাশ করেন। পরে তাঁর উদ্যোগে ১৮৬৩ সালে আন্তর্জাতিক “রেডক্রস” প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রেদেরিক পাসির সাথে তিনি যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

এই সূত্রে ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা নগরীতে একটি সভা বসে। এরপর ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৪টি সভা হয়। বর্তমানে জেনেভা কনভেনশন বলতে বুঝায় এই চারটি সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের সম্মিলিত রূপ।

  • প্রথম জেনেভা কনভেনশন
    ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দ।
    যুদ্ধক্ষেত্রে আহত, রোগাক্রান্ত সৈন্যদের জীবনের নিরাপত্তা এবং শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে  প্রথম জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়।
     
  • দ্বিতীয় জেনেভা কনভেনশন
    ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ
    সমুদ্রস্থ যুদ্ধক্ষেত্রে আহত, রোগাক্রান্ত সৈন্যদের জীবনের নিরাপত্তা এবং শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে ২য় জেনেভা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
     
  • তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন
    ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ
    যুদ্ধবন্দীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ৩য় জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়।
     
  • চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন
     ১৯৪৯ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১২ আগষ্ট।
    চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন যুদ্ধকালীন বেসামরিক জনগণকে রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

    জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনক্রমে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে জেনেভা কনভেনশন কার্যকর হয়। এ কনভেনশন পূর্ববর্তী তিনটি কনভেনশনের সংশোধিত রূপ। উল্লেখ্য ২০০৬ সালের ২৭ জুন পর্যন্ত বিশ্বের ১৯৪টি দেশ জেনেভা কনভেনশন অনুমোদন করে। সর্বশেষ দেশ হিসেবে নাউরু এ কনভেনশন অনুমোদন করে।

জেনেভা কনভেনশনের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ

পার্ট-১ : জেনারেল প্রোভিশান্স

প্রথম অংশে জেনেভা কনভেনশনের সামগ্রিক গঠনপ্রণালী তথা আওতা বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন :
ধারা ২
এ ধারায় বলা হয়েছে স্বাক্ষরভূক্ত দেশ সমূহ এ কনভেনশন দ্বারা বাধ্য হয়েছে যে যুদ্ধকালীন এবং অস্ত্র সংঘাতের সময় যেখানে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, এমনকি অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থান কালীন সময় জেনেভা কনভেনশনকে মেনে নেবে।

ধারা ৩
বলা হয়েছে যখন কোনো সংঘর্ষ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বীকৃত হবে না, তখন প্রত্যেকটি দলের ন্যূনতম নিরাপত্তার অধিকার থাকবে। যেমন :- বেসামরিক ব্যক্তি বা যারা যোদ্ধা নয়, অস্ত্র পরিত্যাগকারী সৈন্য এবং ঐ সমস্ত সৈন্য যারা আহত বা রোগাক্রান্তের কারণে যুদ্ধ হতে বিরত। এছাড়া অন্যান্য কারণে তাদের প্রতি মানবীয় আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। এবং নিম্ন বর্নিত বিষয় সমূহ হতে মুক্ত রাখতে হবে-
(ক) ব্যক্তি এবং জীবনের প্রতি সহিংসতামূলক আচরণ: বিশেষ ধরনেরসহ সকল ধরনের হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, অমানবিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং নির্যাতন।
(খ) জিম্মি করে রাখা
(গ) ব্যক্তি মর্যাদার ওপর অমানবিক আচরণ, অমানবিক চিকিৎসা প্রদান।
(ঘ) মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা এবং বিচার বহির্ভূত অবস্থায় শাস্তি কার্যকর করা।

পার্ট-২ : বিশেষ যুদ্ধকালীন অবস্থায় সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা বা রক্ষণ।

ধারা ১৩
কনভেনশনের দ্বিতীয় অংশে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একটি দেশের সমগ্র জনগণের নিরাপত্তা সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো জাতি, বর্ণ, ধম, গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না।

পার্ট-৩ : নিরাপত্তা প্রদানকৃত ব্যক্তিদের মর্যাদা ও চিকিৎসা

ধারা ৩২ :
নিরাপত্তা সহকারে আশ্রিত বা নিরাপত্তা প্রদানকৃত কোনো ব্যক্তি/ ব্যক্তিদেরকে শারীরিক নির্যাতন, গণহত্যা, হত্যা, শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি প্রভৃতি ধরনের অমানবিক নির্যাতন থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় হত্যা, নির্যাতন, দৈহিক শাস্তি, শারীরিক অপব্যবহার, শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি বা বিনাশ সাধনও করা যাবে না।

ধারা ৩৩ : সমন্বিত শাস্তি
১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সমন্বিত শাস্তি একটি যুদ্ধাপরাধ। এ কনভেনশনে বলা হয়েছে- “কোন আশ্রিত ব্যক্তিকে সামষ্ঠিক অপরাধ এমনকি ব্যক্তিগত অপরাধের জন্যও শাস্তি প্রদান করা যাবে না। সমন্বিত শাস্তি, এবং এর মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি ও সন্ত্রাসীমূলক আচরণ তাদের সাথে করা যাবেনা। লুটতরাজ নিষিদ্ধ এবং জীবন ও সম্পত্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ করা যাবে না।”

ধারা ৩৯ : ফিরে পাবার অধিকার
”যুদ্ধকালীন সময়ে যে সমস্ত জনগনণ তাদের বাস্তু, দেশ ও সম্পদ ত্যাগ করে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে, অস্ত্র বিরতি বা স্থিতিশীলতার পরিবেশ সৃষ্টির পর তাদেরকে তাতের স্ব অবস্থানে ফেরত নেয়া তাদের অধিকার।”

পার্ট-৪ : কনভেনশনের বাস্তবায়ন

এ অংশে আন্তর্জাতিক মানবহিতৈষী আইনের প্রাতিষ্ঠানিক বা কূটনীতিক অধ্যায়ের সংযোজন রয়েছে যা সাধারণত আন্তর্জাতিক জেনেভা কনভেনশন আইনের সর্বশেষ অংশে সংযোজিত। বাস্তবায়নের ধরণ ও পদ্ধতি এ অংশে সন্নিবেশিত হয়েছে।


দেখুন : ১৯৪৯ এর কনভেনশন এবং প্রটোকলের মূল অংশ ও টীকা