কানন দেবী
(১৯১৫/১৬-১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ)
কণ্ঠশিল্পী, অভিনেত্রী, চলচ্চিত্র পরিচালক।
অন্যান্য নাম: কানন দাস, কাননবালা, কাননবালা দেবী। সংক্ষেপে কানন দেবী।

১৯১৫ বা ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে এপ্রিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়াতে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম রতন চন্দ্র দাস এবং মায়ের নাম রাজবালা দেবী। তবে রাজবালা ছিলেন রতন চন্দ্র দাসের রক্ষিতা।

কাননদেবীর পাঁচ বৎসর বয়সে পিতার মৃত্যু হয়। রাজবালা তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে দুর সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়িতে রাধুনী ও ঝি-এর কাজ করতেন। এই সময় এঁরা থাকতেন, হাওড়ার ঘোলডাঙা বস্তিতে। সেখানে তাঁর মতো অসাধারণ সুন্দরী মেয়ে নিয়ে সম্মানের সাথে থাকাটা মুশকিল হয়ে পড়ে। রাজবালা চান নি যে, তাঁর মেয়েও কারো রক্ষিতা হোক। শেষ পর্যন্ত অভাবের কারণে, ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মা তাঁকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করার অনুমতি দেন। এই সূত্রে ম্যাডান থিয়েটার্সের-এর ব্যানারে নির্মিত ' জয়দেব' নামক নির্বাক ছবিতে একটি অল্প বয়সী মেয়ে 'শ্রীরাধা' নামক চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবির পরিচালক ছিলেন জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই অভিনয়ের জন্য তিনি সম্মানী পেয়েছিলেন মাত্র ৫ টাকা। এই সময় তাঁর নামকরণ হয় 'কাননবালা'। এরপর তিনি ম্যাডান থিয়েটার্স-এর 'ঋষির প্রেম', 'প্রহ্লাদ' ছবিতে অভিনয় করেন।

কাননদেবী যখন চলচ্চিত্রে আসেন, তখন অভিজাত ঘরের মেয়েরা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য আসতেন না। এমনিতে কাননবালা ছিলে অভাবী ঘরের, অন্য দিকে ছিলেন রক্ষিতার কন্যা। এই কারণে, তাঁর সামাজিক মূল্য ছিল অতি নিম্নস্তরের। চলচ্চিত্রে আসার পর, তাঁর এই অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরিচালকরা তাঁকে দিয়ে প্রায় নগ্নদশায় পর্দায় উপস্থিত করার চেষ্টা করেন। শোনা যায়, ছবি নির্মাতারা তাঁকে অভিনয়ের সম্মানীও ঠিক মতো দেন না।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে রাধা ফিল্মসের সবাক ছবি ' জোরবরাত'-এ নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন। উল্লেখ্য এই ছবির পরিচালক ছিলেন জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ছবিতে পরিচালকের নির্দেশে নায়ক জয়নারায়ণ মুখোপাধ্যায় জোর করে চুম্বন করেন। এই আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ হলেও, মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর 'মানময়ী গার্লস স্কুল' ছবিতে অভিনয় করে সুখ্যাতি  লাভ করেন। এই ছবিতে তিনি নিজের কণ্ঠে গীত গানের সাথে ঠোঁট মেলান।

১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দেবকী বসু পরিচালিত 'বিদ্যাপতি' ছবিতে অভিনয় করে খ্যতির শীর্ষে উঠে আসেন। এই বছরেই মুক্তিপ্রাপ্ত 'মুক্তি' ছবির মাধ্যমে তিনি প্রথম সারির নায়িকা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এই বছর থেকে দরিদ্র সস্তা অভিনেত্রী কাননবালা থেকে তিনি সম্ভ্রান্ত কাননদেবী হয়ে উঠেন। আর্থিক দুরবস্থার কারণে, এই সময়ে বাছবিচার ছাড়া তিনি বহু ছবিতে অভিনয় করেছেন।

১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে মে (শনিবার ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৬), কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত সাপুড়ে' নামক ছায়াছবি মুক্তি পায়। এই ছবিতে 'চন্দন' চরিত্রে অভিনয় ও গানে কণ্ঠ দান করেন।

কাননদেবীর অভিনীত চলচ্চিত্রের তালিকা

১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে কানদেবী নিউ থিয়েটার্স ছেড়ে নিজের পছন্দমত ছবিতে অভিনয় শুরু করেন । ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত 'শেষ উত্তর' ও তার হিন্দী 'জবাব' ছবিতে তিনি বিশেষ সাফল্য পান। বিশেষ করে তাঁর 'তুফান মেল' গানটি তাঁকে অভিনেত্রীর পাশাপাশি গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত হিন্দি বাংলা মিলিয়ে বেছে বেছে অনেকগুলো ছবিতে অভিনয় করেন।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে  'শ্রীমতী পিকচার্স' প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে চলচ্চিত্র প্রযোজনার দিকে মন দেন। এই সময় তিনি শরৎচন্দ্রের উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র তৈরিতে মনোযোগী হন।

১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শেষবারের মতো অভিনয় করেন '‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত ও অন্নদা দিদি'।

কণ্ঠশিল্পী কানন দেবী

অভিনয় ছাড়া, তিন দশক ব্যাপী তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলা সঙ্গীতজগতে অসাধারণ অবদান রাখেন। সুকণ্ঠের জন্য তিনি শৈশব থেকেই সুনাম পেয়ে এসেছেন। কিন্তু আর্থিক দুরবস্থার জন্য তাঁর মা তাঁকে ভালো শিক্ষকের কাছে গান শেখানোর ব্যবস্থা করতে পারেন নি। তাঁর সহজাত সঙ্গীতপ্রতিভার বদলে তিনি ছবিতে কণ্ঠদান করতে পেরেছিলেন। পরে অবশ্য কাননদেবী ওস্তাদ আল্লা রাখার কাছে তালিম নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীত এবং আধুনিক বাংলা গানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। সেকালের বিখ্যাত গায়ক, সুরকার এবং সঙ্গীত শিক্ষক রাইচাঁদ বড়াল, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজ মল্লিক, অনাদিকুমার দস্তিদার, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র প্রমুখের কাছে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গান শিখেছিলেন। তাঁর গাওয়া নজরুলসঙ্গীত 'আমি বনফুল গো' সে সময়ে অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলো— 'আমার হৃদয় তোমার আপন হাতে', 'তার বিদায় বেলার মালা খানি', 'আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে', 'তোমার সুরের ধারা' আমার বেলা যে যায়', 'বারে বারে চেয়েছি, পেয়েছি যে তারে', প্রাণ চায় চক্ষু না চায়', 'সেই ভালো সেই ভালো', 'একদিন চিনে নেবে তারে', 'কাছে যবে ছিল হলোনা যাওয়া', 'সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে', 'এত দিন যে বসে ছিলেম পথ চেয়ে'।
 
শেষজীবনে তিবি সেবামূলক কাজে নিজেকে যুক্ত করেন । দুঃস্থ বয়স্ক শিল্পীদের সাহায্যের জন্য তিনি সব সময়ে সক্রিয় ছিলেন ।

১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পদ্মশ্রী সম্মাননা পান।
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর জনপ্রিয় আত্মজীবনী 'সবারে আমি নমি'।
১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে দেওয়া হয় দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার।
১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জুলাই তিনি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।