পশ্চিমবঙ্গ
ভিন্ন নাম পশ্চিম বাংলা।
ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক : ২০°১৫' উত্তর ৮৫°৩০'পূর্ব।

ভারত প্রজাতন্ত্রের একটি প্রদেশ। বঙ্গদেশের পশ্চিমাংশে অবস্থিত। এই কারণে এর নাম পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চল যখন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন পশ্চিমবঙ্গ নামটি গৃহীত হয়। তখন এর ইংরেজি নামকরণ করা হয়েছিল West Bengal (ওয়েস্ট বেঙ্গল)। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের ইংরেজি নামটি পালটে Paschimbanga রাখার প্রস্তাব দেয়।

এ রাজ্যের রাজধানী কলকাতাকলকাতা ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম মহানগর। এছাড়া উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি রাজ্যের অপর এক অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন মহানগর। শিলিগুড়ি করিডোরে অবস্থিত এই শহর উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে অবশিষ্ট দেশের সংযোগ রক্ষা করছে। এছাড়া অন্যান্য মহানগরীগুলো হলো আসানসোল, দুর্গাপুর, হাওড়া, রাণীগঞ্জ, হলদিয়া, জলপাইগুড়ি, খড়গপুর, বর্ধমান, দার্জিলিং, মেদিনীপুর, তমলুক, ইংরেজ বাজার ও কোচবিহার।

পশ্চিমবঙ্গের সীমানা
এই রাজ্যের উত্তরে ভারতের সিকিম রাজ্য, উত্তর-পূর্বে ভুটান। পূর্বে আসাম রাজ্য ও বাংলাদেশ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও নেপাল। ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং বাংলাদেশের ভিতরে এই রাজ্যটি একটি সংকীর্ণ অবয়ব ধারণ করেছে। এই রাজ্যের মোট আয়তন ৮৮,৭৫২ বর্গকিলোমিটার (৩৪,২৬৭ বর্গমাইল)। রাজ্যের সর্বোত্তরে অবস্থিত দার্জিলিং হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল। এই অঞ্চলটি পূর্ব হিমালয়ের একটি অংশ। পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সান্দাকফু (৩,৬৩৬ মিটার বা ১১,৯২৯ ফুট) এই অঞ্চলে অবস্থিত। এই পার্বত্য অঞ্চলকে দক্ষিণে গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে সংকীর্ণ তরাই অঞ্চল। অন্যদিকে রাঢ় অঞ্চল গাঙ্গেয় বদ্বীপকে বিচ্ছিন্ন করেছে পশ্চিমের মালভূমি ও উচ্চভূমি অঞ্চলের থেকে। রাজ্যের সর্বদক্ষিণে একটি নাতিদীর্ঘ উপকূলীয় সমভূমিও বিদ্যমান। অন্যদিকে
সুন্দরবন অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ অরণ্য পরিবেষ্টিত গাঙ্গেয় বদ্বীপের অংশবিশেষ।

পশ্চিমবঙ্গের ভূমিরূপ
পশ্চিমবঙ্গের ভূমি বৈচিত্র্যময়। এর উত্তরাংশ হিমালয়-এর পার্বত্য অঞ্চল, আর দক্ষিণে গঙ্গা-বিধৌত পললভূমি। এর মাঝে আছে আর্দ্র তরাই অঞ্চল, শুষ্ক রাঢ় অঞ্চল। ভূপ্রকৃতি অনুসারে পশ্চিমবঙ্গকে ৫টি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। এই ভাগগুলো হলো দার্জিলিং হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল, তরাই অঞ্চল, উত্তরবঙ্গ সমভূমি, রাঢ় অঞ্চল এবং উপকূলীয় সমভূমি।

পশ্চিমবঙ্গের বনভূমি
এই রাজ্যের ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ১৪ শতাংশ বনভূমি। এর ভিতরে রাজ্যের আয়তনের ৪ শতাংশ সংরক্ষিত এলাকা। প্রাকৃতিক অবস্থার পার্থক্যের জন্য পশ্চিমবঙ্গের উদ্ভিদের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। পশ্চিমবঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত লবণাক্ত ভূমিতে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য
সুন্দরবনের একটি অংশ । সুন্দরবন অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা প্রধান গাছ হলো সুন্দরী। এ রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান অর্থকরী বৃক্ষ হল শাল। পূর্ব মেদিনীপুর প্রধান বৃক্ষ হল ঝাউ। উত্তরবঙ্গের হিমালয়ের পাদদেশে ডুয়ার্স অঞ্চলে ঘন শাল ও অন্যান্য ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বৃক্ষের বন দেখা যায়।  সমুদ্রতল থেকে ১,৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত দার্জিলিঙে ওক, কনিফার, রডোডেনড্রন প্রভৃতি গাছ জন্মে।

বন্য প্রাণী
বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য এই রাজ্যে মোট ৬টি জাতীয় উদ্যান আছে। এগুলো হলো
সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান, বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প, গোরুমারা জাতীয় উদ্যান, নেওড়া উপত্যকা জাতীয় উদ্যান, সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যান ও জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান। এই রাজ্যের সুন্দরবনে রয়েছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারএই বনটি ভারতের বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্য বিখ্যাত।  বাঘ ছাড়া সুন্দরবন অঞ্চলে দেখা যায় গাঙ্গেয় ডলফিন, নদী কচ্ছপ, মিষ্টি ও লবণাক্ত জলের কুমির, হরিণ, শুকর। এখানে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় মাছ দেখা যায় সাগর এবং তৎসংলগ্ন নদীগুলোতে। রাজ্যের অন্যান্য বন্যপ্রাণীর মধ্যে ভারতীয় গণ্ডার, ভারতীয় হাতি, হরিণ, বাইসন, চিতাবাঘ, গৌর ও কুমির উল্লেখযোগ্য। সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের মতো উচ্চ পার্বত্য বনভূমি অঞ্চলে বার্কিং ডিয়ার, রেড পান্ডা, চিঙ্কারা, টাকিন, সেরো, প্যাঙ্গোলিন, মিনিভেট, কালিজ ফেজান্ট প্রভৃতি বন্যপ্রাণীর সন্ধান মেলে। এই রাজ্যে প্রচুর সংখ্যক পরিযায়ী পাখি শীতকালে আসতে দেখা যায়।

পশ্চিমবঙ্গের নদনদী
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান নদী গঙ্গা এবং এই নদীটি রাজ্যকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে। এই নদীর একটি শাখা পদ্মা নাম ধারণ করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর অপর শাখা ভাগীরথী ও হুগলি নামে পশ্চিমবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এই রাজ্যের উত্তরে রয়েছে তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকা ও মহানন্দা নামক নদনদী। পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন নদনদীগুলির মধ্যে প্রধান হল দামোদর, অজয় ও কংসাবতী। গাঙ্গেয় বদ্বীপ ও
সুন্দরবন অঞ্চলে অজস্র নদনদী ও খাঁড়ি দেখা যায়।

আবহাওয়া
পশ্চিমবঙ্গ গ্রীষ্মপ্রধান উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্গত। রাজ্যের ছয়টি ঋতু পর্যায়ক্রমে আসে। এই ঋতুগুলো হলো
গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এই রাজ্যের বদ্বীপ অঞ্চলের গ্রীষ্মকাল আর্দ্র অবস্থা বিরাজ করে পক্ষান্তরে পশ্চিমের উচ্চভূমি অঞ্চলে উত্তর ভারতের মতো শুষ্ক গ্রীষ্মকাল। এই রাজ্যে গ্রীষ্মকালের গড় তাপমাত্রা ৩৮° সেলসিয়াস (১০০° ফারেনহাইট) থেকে ৪৫° সেলসিয়াস (১১৩° ফারেনহাইট)। রাত্রিকালে বঙ্গোপসাগর থেকে শীতল আর্দ্র দক্ষিণা বায়ু প্রবাহিত হয়। গ্রীষ্মের শুরুতে স্বল্পস্থায়ী বৃষ্টিপাত ও কখনো কখনো কালবৈশাখী ঝড় হয়। বর্ষাকাল স্থায়ী হয় জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। বঙ্গাব্দের হিসেবে আষাঢ় ও শ্রাবণ বর্ষাকাল। ভারত মহাসাগরীয় মৌসুমি বায়ুর বঙ্গোপসাগরীয় শাখাটি উত্তরপশ্চিম অভিমুখে ধাবিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টিপাত ঘটায়। রাজ্যে শীতকাল (ডিসেম্বর-জানুয়ারি, পৌষ-মাঘ) আরামদায়ক। এই সময় রাজ্যের সমভূমি অঞ্চলের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হয় ১৫° সেলসিয়াস (৫৯° ফারেনহাইট)। শীতকালে শুষ্ক শীতল উত্তরে বাতাস প্রবাহিত হয়। এই রাজ্যের দার্জিলিং হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ে। এই সময়ে এই অঞ্চলের কোথাও কোথাও তুষারপাতও হয়।

পশ্চিমবঙ্গের শস্য
পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। রাজ্যের প্রধান খাদ্যফসল হল ধান। অন্যান্য খাদ্যফসলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডাল, তৈলবীজ, গম, তামাক, আখ ও আলু। এই অঞ্চলের প্রধান পণ্যফসল হল পাট। চা উৎপাদনও বাণিজ্যিকভাবে করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ দার্জিলিং এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে উচ্চ মানের চায়ের জন্য বিখ্যাত।

পশ্চিমবঙ্গের জেলা-মানচিত্র

পশ্চিমবাংলার প্রশাসনিক ব্যবস্থা
প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য পশ্চিমবঙ্গকে টি বিভাগ ও ২৩টি জেলায় বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলি হলো

প্রেসিডেন্সি বিভাগ ১। জেলার সংখ্যা ৫

বর্ধমান বিভাগ ২। জেলার সংখ্যা ৪

জলপাইগুড়ি বিভাগ ৩। জেলা সংখ্যা ৫

মালদহ বিভাগ ৪:

মেদেনীপুর বিভাগ ৫:

প্রতিটি জেলার শাসনভার একজন জেলাশাসক বা জেলা কালেক্টরের হাতে ন্যস্ত থাকে। তিনি "ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা "পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন কর্মকর্তা কর্তৃক নিযুক্ত হন। প্রতিটি জেলা মহকুমার বিভক্ত। মহকুমার শাসনভার মহকুমা-শাসকের হাতে ন্যস্ত থাকে। মহকুমাগুলি আবার ব্লকে বিভক্ত। ব্লকগুলি গঠিত হয়েছে পঞ্চায়েত ও পুরসভা নিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গের শাসন পদ্ধতি:
ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গও প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের সংসদীয় পদ্ধতিতে শাসিত হয়। রাজ্যের সকল নাগরিকের জন্য সার্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত। পশ্চিমবঙ্গের আইনসভার নাম 'বিধানসভা'। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এই বিধানসভা গঠিত হয়। বিধানসভার সদস্যরা একজন অধ্যক্ষ ও একজন উপাধ্যক্ষকে নির্বাচিত করেন। অধ্যক্ষ অথবা (অধ্যক্ষের অনুপস্থিতিতে) উপাধ্যক্ষ বিধানসভা অধিবেশনে পৌরহিত্য করেন।

শাসনবিভাগের কর্তৃত্বভার ন্যস্ত রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার উপর। রাজ্যপাল রাজ্যের আনুষ্ঠানিক প্রধান হলেও, প্রকৃত ক্ষমতা সরকারপ্রধান মুখ্যমন্ত্রীর হাতেই ন্যস্ত থাকে। রাজ্যপালকে নিয়োগ করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন। তবে মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাজ্যপালই অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করে থাকেন। মন্ত্রিসভা বিধানসভার নিকট দায়বদ্ধ থাকে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা এককক্ষীয়। এই সভার সদস্য সংখ্যা ২৯৫ জন। এঁদের মধ্যে ২৯৪ জন নির্বাচিত এবং একজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সম্প্রদায় থেকে মনোনীত। বিধানসভার সদস্যদের বিধায়ক বলা হয়। বিধানসভার স্বাভাবিক মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে মেয়াদ শেষ হবার আগেও বিধানসভা ভেঙে দেওয়া যায়। গ্রাম ও শহরাঞ্চলে স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন সংস্থাগুলি যথাক্রমে পঞ্চায়েত ও পুরসভা নামে পরিচিত। এই সকল সংস্থাও নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ (ভারতীয় বঙ্গ) থেকে ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ৪২ জন ও উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ১৬ জন সদস্য প্রতিনিধিত্ব করেন।

পশ্চিমবঙ্গের প্রধান রাজনৈতিক দল :
ভারতের সকল রাজনৈতিক দলেরই কার্যক্রম কলকাতায় আছে। তবে ক্ষমতার লড়াইয়ে যে দলগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যায়, সে দলগুলো হলো
তৃণমূল, (সিপিআই(এম)), কংগ্রেস, বিজেপি।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দুই প্রধান প্রতিপক্ষ শক্তি হল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) (সিপিআই(এম)) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ও সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৫টি আসন দখল করে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। বিগত ৩৪ বছর এই বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। এই সরকার ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম মেয়াদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের বিধানসভা নির্বাচনে, ২২৬টি আসন দখল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস-জাতীয় কংগ্রেস জোট বামফ্রন্টকে পরাজিত করে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিচারবিভাগ
কলকাতা হাইকোর্ট ও অন্যান্য নিম্ন আদালত নিয়ে রাজ্যের বিচারবিভাগ গঠিত।

পশ্চিমবঙ্গের পরিবহন ব্যবস্থা
পশ্চিমবঙ্গে সড়কপথের মোট দৈর্ঘ্য ৯২,০২৩ কিলোমিটার (৫৭,১৮০ মাইল)। এর মধ্যে জাতীয় সড়ক ২,৩৭৭ কিলোমিটার (১,৪৭৭ মাইল) এবং রাজ্য সড়ক ২,৩৯৩ কিলোমিটার (১,৪৮৭ মাইল)। রাজ্যে সড়কপথের ঘনত্ব প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ১০৩.৬৯ কিলোমিটার (প্রতি ১০০ বর্গমাইলে ১৬৬.৯২ মাইল); যা জাতীয় ঘনত্ব প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ৭৪.৭ কিলোমিটারের (প্রতি ১০০ বর্গমাইলে ১২০ মাইল) থেকে বেশি। রাজ্যে রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য ৩,৮২৫ কিলোমিটার (২,৩৭৭ মাইল)। ভারতীয় রেলের পূর্ব রেল ও দক্ষিণ পূর্ব রেল ক্ষেত্রদুটির সদর কলকাতায় অবস্থিত। রাজ্যের উত্তরভাগের রেলপথ উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলের অন্তর্গত। কলকাতা মেট্রো ভারতের প্রথম ভূগর্ভস্থ মেট্রো রেল পরিষেবা। উত্তরপূর্ব সীমান্ত রেলের অংশ দার্জিলিং হিমালয়ান রেল একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।

পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলো
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এই বিমানবন্দরটি কলকাতার নিকটেই উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার দমদমে অবস্থিত। এছাড়া শিলিগুড়ির নিকটবর্তী বাগডোগরা বিমানবন্দর রাজ্যের অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর। সাম্প্রতি একে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্তরে উন্নীত করা হয়েছে।

কলকাতা বন্দর পূর্ব ভারতের একটি প্রধান নদীবন্দর। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট কলকাতা ও হলদিয়া ডকের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কলকাতা বন্দর থেকে
আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট ব্লেয়ার পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন পরিসেবা রয়েছে। এছাড়া ভারত ও বহির্ভারতের বন্দরগুলিতে শিপিং কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার মাধ্যমে পণ্য পরিবহন পরিসেবা চালু আছে। রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষত সুন্দরবন অঞ্চলে, নৌকা পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। কলকাতা ভারতের একমাত্র শহর যেখানে আজও ট্রাম গণপরিবহনের অন্যতম মাধ্যম।

কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা, উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থা, দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা, পশ্চিমবঙ্গ ভূতল পরিবহন নিগম ও ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি বাস পরিসেবার দায়িত্বপ্রাপ্ত। এছাড়া বেসরকারি কোম্পানিগুলিও বাস চালিয়ে থাকে। শহরের বিশেষ বিশেষ রুটে মিটার ট্যাক্সি ও অটোরিকশা চলে। কম দুরত্বের যাত্রার জন্য রাজ্যের সর্বত্র সাইকেল রিকশা ও কলকাতাতে সাইকেল রিকশা ও হাতে-টানা রিকশা ব্যবহার করা হয়।

পশ্চিমবাংলার জনসংখ্যা
২০১১ খ্রিষ্টাব্দের জনগণনার তাৎক্ষণিক ফলাফল অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ৯১,৩৪৭, ৭৩৬ (ভারতের মোট জনসংখ্যার ৭.৫৫%)। জনসংখ্যার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রাজ্য। জনসংখ্যার সিংহভাগই বাঙালি। এছাড়া রয়েছে মাড়োয়ারি, বিহারি ও ওড়িয়া সংখ্যালঘুরা। দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে শেরপা ও তিব্বতি, নেপালি গোর্খা জাতির বাস করে। পশ্চিমবঙ্গে সাঁওতাল, কোল, রাজবংশী ও টোটো আদিবাসীরা বাস করে। রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় চীনা, তামিল, গুজরাতি, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, আর্মেনিয়ান, পাঞ্জাবি ও পারসি সংখ্যালঘুদেরও খুব অল্প সংখ্যায় বাস করতে দেখা যায়।

পশ্চিমবঙ্গের জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯০৪ জন। এই রাজ্য জনঘনত্বের বিচারে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম স্থানাধিকারী। ভারতের মোট জনসংখ্যার ৭.৮১ শতাংশ বাস করে পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৯১-২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ভিতর পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১৭.৮৪ শতাংশ।  রাজ্যে লিঙ্গানুপাতের হার প্রতি ১০০০ পুরুষে ৯৩৪ জন মহিলা।

এই রাজ্যের ৭২ শতাংশ মানুষ বাস করেন গ্রামাঞ্চলে। ১৯৯৯-২০০০ সালের হিসেব অনুযায়ী, রাজ্যের ৩১.৮৫ শতাংশ মানুষ বাস করেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। তফসিলি জাতি ও উপজাতিগুলি গ্রামীণ জনসংখ্যার যথাক্রমে ২৮.৬ শতাংশ ও ৫.৮ শতাংশ এবং নগরাঞ্চলীয় জনসংখ্যার ১৯.৯ শতাংশ ও ১.৫ শতাংশ।

চলচ্চিত্র শিল্প
কলকাতার টালিগঞ্জ অঞ্চলে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রধান কেন্দ্রটি অবস্থিত। এই কারণে এই কেন্দ্রটি হলিউডের অনুকরণে "টলিউড" নামে পরিচিত হয়ে থাকে। বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প আর্ট ফিল্ম বা শিল্পগুণান্বিত চলচ্চিত্রে সুসমৃদ্ধ। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ বিশিষ্ট পরিচালকের চলচ্চিত্র বিশ্ববন্দিত। সমসাময়িককালের বিশিষ্ট পরিচালকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন ও ঋতুপর্ণ ঘোষ। বাংলা সিনেমার পাশাপাশি এই রাজ্যে অবশ্য হিন্দি সিনেমাও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

উৎসব ও মেলা
পশ্চিমবাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজা হলো পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম উৎসব।পশ্চিমবঙ্গের অপর একটি বহুপ্রচলিত হিন্দু উৎসব হল কালীপূজা। এই পূজা অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজার পরবর্তী অমাবস্যা তিথিতে। এছাড়া রাজ্যের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য হিন্দু উৎসবগুলি হল পয়লা বৈশাখ, অক্ষয় তৃতীয়া, দশহরা, রথযাত্রা, ঝুলনযাত্রা, জন্মাষ্টমী, বিশ্বকর্মা পূজা, মহালয়া, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, ভ্রাতৃদ্বিতীয়া, নবান্ন, জগদ্ধাত্রী পূজা, সরস্বতী পূজা, দোলযাত্রা, শিবরাত্রি ও চড়ক-গাজন। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে হুগলি জেলার মাহেশ ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মহিষাদলে বিশেষ মেলা ও জনসমাগম হয়ে থাকে। হুগলি জেলার চন্দননগর ও নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পূজা ও জগদ্ধাত্রী বিসর্জন শোভাযাত্রা বিখ্যাত। মকর সংক্রান্তির দিন বীরভূম জেলার কেন্দুলিতে জয়দেব মেলা উপলক্ষ্যে বাউল সমাগম ঘটে। পৌষ সংক্রান্তির দিন হুগলি নদীর মোহনার কাছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গঙ্গাসাগরে আয়োজিত গঙ্গাসাগর মেলায় সারা ভারত থেকেই পুণ্যার্থী সমাগম হয়। শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির নিকটে প্রাচীন জল্পেশ্বর শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হয় বিখ্যাত জল্পেশ্বর মেলা। শ্রাবণ সংক্রান্তির সর্পদেবী মনসার পূজা উপলক্ষ্যে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে আয়োজিত হয় ঝাঁপান উৎসব। বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের ঝাঁপান উৎসব সবচেয়ে বিখ্যাত। কোচবিহার শহরের মদনমোহন মন্দিরকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত রাসমেলা পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহত্তম মেলা।

ইসলামি উৎসব মধ্যে ঈদুজ্জোহা, ঈদুলফিতর, মিলাদ-উন-নবি, শবেবরাত ও মহরম বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। খ্রিষ্টান উৎসব বড়দিন ও গুড ফ্রাইডে; বৌদ্ধ উৎসব বুদ্ধপূর্ণিমা; জৈন উৎসব মহাবীর জয়ন্তী এবং শিখ উৎসব গুরু নানক জয়ন্তীও মহাধুমধামের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক উৎসবগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, পঁচিশে বৈশাখ, নেতাজি জয়ন্তী ইত্যাদি। প্রতি বছর পৌষ মাসে শান্তিনিকেতনে বিখ্যাত পৌষমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। বইমেলা পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উৎসব আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলা রাজ্যে একমাত্র তথা বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বইমেলা। আঞ্চলিক বইমেলাগুলি রাজ্যের সকল প্রান্তেই বছরের নানা সময়ে আয়োজিত হয়। এছাড়া সারা বছরই রাজ্য জুড়ে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা
পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়গুলি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অথবা বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত হয়ে থাকে। বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনও বিদ্যালয় পরিচালনা করে। প্রধানত বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমেই শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত আছে।  তবে সাঁওতালি, নেপালি, হিন্দি ও উর্দু ভাষাতেও পঠনপাঠন করার সুযোগ রয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ অথবা কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ (সিবিএসসি) অথবা কাউন্সিল ফর ইন্ডিয়ান স্কুল সার্টিফিকেট একজামিনেশন (আইসিএসই) দ্বারা অনুমোদিত। ১০+২+৩ পরিকল্পনায় মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর ছাত্রছাত্রীদের দুই বছরের জন্য প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় জুনিয়র কলেজে পড়াশোনা করতে হয়। এছাড়াও তারা পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ অথবা কোনো কেন্দ্রীয় বোর্ড অনুমোদিত উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়েও প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করতে পারে। এই ব্যবস্থায় তাদের কলাবিভাগ, বাণিজ্যবিভাগ অথবা বিজ্ঞানবিভাগের যেকোনো একটি ধারা নির্বাচন করে নিতে হয়। এই পাঠ্যক্রম সম্পূর্ণ করার পরই তারা সাধারণ বা পেশাদার স্নাতক স্তরের পড়াশোনা করতে পারে।

২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের হিসেব অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা আঠারো। নিচে উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের তালিকা দেওয়া হলো।

গণমাধ্যম
২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসেব অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গ (ভারতীয় বঙ্গ) থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের সংখ্যা ৫০৫। এগুলির মধ্যে ৩৮৯টি বাংলা সংবাদপত্র। কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা ভারতে একক-সংস্করণে সর্বাধিক বিক্রিত বাংলা পত্রিকা। এই পত্রিকার দৈনিক গড় বিক্রির পরিমাণ ১,২৩৪,১২২টি কপি। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বাংলা সংবাদপত্রগুলি হল আজকাল, বর্তমান, সংবাদ প্রতিদিন, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, জাগো বাংলা, দৈনিক স্টেটসম্যান ও গণশক্তি। দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য স্টেটসম্যান, এশিয়ান এজ, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ইংরেজি দৈনিকের নাম। এছাড়াও হিন্দি, গুজরাটি, ওড়িয়া, উর্দু ও নেপালি ভাষাতেও সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়ে থাকে।

দূরদর্শন পশ্চিমবঙ্গের সরকারি টেলিভিশন সম্প্রচারক। এছাড়া কেবল টেলিভিশনের মাধ্যমে মাল্টিসিস্টেম অপারেটরগণ বাংলা, নেপালি, হিন্দি, ইংরেজি সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যানেল সম্প্রচার করে থাকেন। বাংলা ভাষায় সম্প্রচারিত ২৪ ঘণ্টার বাংলা টেলিভিশন সংবাদ-চ্যানেলগুলি হল স্টার আনন্দ, কলকাতা টিভি, ২৪ ঘণ্টা, এনই বাংলা, নিউজ টাইম, চ্যানেল টেন, আর-প্লাস ও তারা নিউজ। বিনোদন-চ্যানেলগুলি হল স্টার জলসা, ইটিভি বাংলা, জি বাংলা, আকাশ বাংলা, তারা বাংলা ইত্যাদি। এছাড়া চ্যানেল এইট টকিজ নামে একটি ২৪ ঘণ্টার চলচ্চিত্র-চ্যানেল এবং তারা মিউজিক ও সঙ্গীত বাংলা নামে দুটি উল্লেখনীয় ২৪ ঘণ্টার সংগীত-চ্যানেলও দৃষ্ট হয়।

আকাশবাণী পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বেতার কেন্দ্র। বেসরকারি এফএম স্টেশন কেবলমাত্র কলকাতা, শিলিগুড়ি ও আসানসোল শহরেই দেখা যায়। বিএসএনএল, ইউনিনর, টাটা ডোকোমো, আইডিয়া সেলুলার, রিলায়েন্স ইনফোকম, টাটা ইন্ডিকম, ভোডাফোন এসার, এয়ারসেল ও এয়ারটেল সেলুলার ফোন পরিষেবা দিয়ে থাকে। সরকারি সংস্থা বিএসএনএল ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ব্রডব্যান্ড ও ডায়াল-আপ অ্যাকসেস ইন্টারনেট পরিসেবা পাওয়া যায়।

ক্রীড়াজগত
ক্রিকেট ও ফুটবল এই রাজ্যের দুটি জনপ্রিয় খেলা। কলকাতা ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। মোহনবাগান, ইস্ট বেঙ্গল ও মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মতো দেশের প্রথম সারির জাতীয় ক্লাবগুলি রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। এছাড়া রয়েছে খো খো, কাবাডি প্রভৃতি দেশীয় খেলা। ক্যালকাটা পোলো ক্লাব বিশ্বের প্রাচীনতম পোলো ক্লাব বলে পরিগণিত হয়। অন্যদিকে রয়্যাল ক্যালকাটা গলফ ক্লাব গ্রেট ব্রিটেনের বাইরে এই ধরনের ক্লাবগুলির মধ্যে প্রথম।

পশ্চিমবঙ্গে একাধিক সুবৃহৎ স্টেডিয়াম অবস্থিত। সারা বিশ্বে যে দুটি মাত্র লক্ষ-আসন বিশিষ্ট ক্রিকেট স্টেডিয়াম রয়েছে কলকাতার ইডেন গার্ডেনস তার অন্যতম। অন্যদিকে বিধাননগরের বহুমুখী স্টেডিয়াম যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফুটবল স্টেডিয়াম। ক্যালকাটা ক্রিকেট অ্যান্ড ফুটবল ক্লাব বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম ক্লাব। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয় দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি ও খড়গপুর শহরেও। পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট ক্রীড়া ব্যক্তিত্বেরা হলেন প্রাক্তন জাতীয় ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, অলিম্পিক টেনিস ব্রোঞ্জ পদকজয়ী লিয়েন্ডার পেজ, দাবা আন্তর্জাতিক গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া প্রমুখ। অতীতের খ্যাতমানা ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফুটবলার চুনী গোস্বামী, পি কে বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলেন মান্না, সাঁতারু মিহির সেন, অ্যাথলেট জ্যোতির্ময়ী শিকদার প্রমুখ।

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস
প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং তৎসংলগ্ন কিছু অংশ নিয়ে যে বৃহত্তর বঙ্গদেশ ছিল, সেখানে মানুষের প্রথম পদচারণা হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার বৎসর আগে। সে সময়ে প্রাচীন প্রস্তরযুগের সূচনা হয়েছিল
নেগ্রিটো জনগোষ্ঠীর দ্বারা। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০-২০ হাজার বৎসরের মধ্যে এরা ভারতবর্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। এদের দ্বারাই সূচিত হয়েছিল ভারতের প্রাচীন প্রস্তরযুগ। এই যুগে নেগ্রিটোরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো অমসৃণ পাথর। এদের নিদর্শন পাওয়া গেছে পাকিস্তানের সোয়ান উপত্যাকায়, দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ অঞ্চলে এবং ভারতের পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে। [দেখুন : বাংলাদেশের ইতিহাস]

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয় যে— আসাম. ঢাকা, বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, পার্বত্য ত্রিপুরা, দার্জিলিং ও রাজশাহী বিভাগ একত্রিত করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ হবে এবং ঢাকা এই প্রদেশের রাজধানী হবে। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ ও আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে, তাই ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন বা সংক্ষেপে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন নামে অভিহিত হয়ে থাকে। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর পঞ্চম জর্জ-এর ভারত সফরের সময় দেওয়া ঘোষণা অনুসারে 'বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা' বাতিল হয়ে যায়। এই সময় ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হয়।

কলকাতাকে কেন্দ্র করে বঙ্গদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয়ে উঠছিল সে সময়। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের মতো বিপ্লবী দলগুলি এখানে সশস্ত্র বিপ্লবের ভিতর দিয়ে ভারত স্বাধীন করার কার্যক্রম চালানো শুরু করে। এই সময় পশ্চিম বঙ্গ এবং বাংলাদেশে বিপ্লবীরা বিচ্ছিন্নভাবে ব্রিটিশ শাসকদের আক্রমণ করে। এরফলে ইংরেজ রাজকর্মচারী এবং তাদের তাবেদারদের অনেকে হতাহত হয়। অন্যদিকে বহু বিপ্লীবী ঘটনাস্থলে শহীদ হন। ধৃত বিপ্লীবদের অনেককে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং অনেককে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসন দেওয়া হয়। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এর সাথে যুক্তহয় বামপন্থী আন্দোলন। সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের চক্রান্তে ভারত স্বাধীনতা অর্জন ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা দ্বিধাবিভক্ত হয়। হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মুসলমানপ্রধান পূর্ববঙ্গ নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে যোগ দেয়। বঙ্গদেশে পূর্বাঞ্চল তখন পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত লাভ করে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব-পাকিস্তান সশস্ত্র সংগ্রামের ভিতর দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। বর্তমানে এই দেশটির নাম গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে লক্ষ লক্ষ হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। এই ব্যাপক অভিবাসনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে খাদ্য ও বাসস্থানের সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে দেশীয় রাজ্য কোচবিহারের রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভারত সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলায় পরিণত হয়। এরপর ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়া বিহারের কিছু বাংলা-ভাষী অঞ্চলও এই সময় পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। একই সাথে সহিংস মার্ক্সবাদী-নকশালবাদী আন্দোলনের ফলে রাজ্যের শিল্প পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে। এর ফলে অর্থনৈতিক উন্য়নে স্থবিরতা নেমে আসে । ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় নকশালবাড়ি আন্দোলনের সাথে জড়িত সশস্ত্র বিপ্লবীরা ছাড়া, সমগ্র পশ্চিম বাংলার মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবাসী সরকারকে নানাভাবে সাহায্য করে। 

১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বসন্ত মহামারীতে রাজ্যে প্রায় সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে পরাজিত করে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলে রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হয়। এরপর তিন দশকেরও বেশি সময় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) (সিপিআই(এম)) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যে শাসনভার পরিচালনা করে।

১৯৯০ দশকের মধ্যভাগে ভারত সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ২০০০ সালে সংস্কারপন্থী নতুন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্বাচনের পর রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। অবশ্য এই শাসনামলে রাজ্যের বিভিন্ন অংশে ছোটোবড়ো বেশ কয়েকটি সশস্ত্রী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। শিল্পায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের একাধিক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে হুগলির সিঙ্গুরে টাটা ন্যানো কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র গণ-অসন্তোষ দেখা যায়। জমি অধিগ্রহণ বিতর্কের প্রেক্ষিতে সিঙ্গুর থেকে টাটা গোষ্ঠী কারখানা প্রত্যাহার করে নিলে, তা রাজ্য রাজনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে অশান্তির জেরে পুলিশের গুলিতে ১৪ জন মারা গেলে রাজ্য রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে লোকসভা নির্বাচন ও ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের পৌরনির্বাচনে শাসক বামফ্রন্টের আসন সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। অবশেষে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়ে রাজ্যের ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান হয়।


সূত্র :
http://www.wbgov.com/
http://www.mapsofindia.com/