বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নাইয়া কর পার!
নাইয়া কর পার!
কুল নাহি নদী-জল সাঁতার॥
দুকূল ছাপিয়া জোয়ার আসে!
নামিছে আঁধার; মরি তরাসে!
দাও দাও কূল কুলবধূ ভাসে
নীর পাথার॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে এক অসহায় মানুষের হৃদয়ের গভীর আকুতি প্রকাশ পেয়েছে, যে জীবনের দুঃখ, ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে একজন উদ্ধারকারীর সাহায্য কামনা করছে। এখানে ‘নাইয়া’ (নৌকার মাঝি) রূপক অর্থে সেই আশ্রয়দাতা পরমসত্তার প্রতীক, যিনি মানুষকে বিপদের সাগর পার করে নিরাপদ কূলে পৌঁছে দিতে পারেন। এটি মূলত জীবন-সংগ্রাম, আত্মসমর্পণ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক রূপকধর্মী গান।
এই গানে নদী পারাপারের একটি চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবি মানুষের জীবনের গভীর সংকট, অসহায়তা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করেছেন। এখানে ‘নদী’ শুধু জলধারা নয়; এটি মানুষের যাপিত জীবনের দুঃখ, দুর্দশা, অস্থিরতা ও প্রতিকূলতার প্রতীক।
গানের শুরুতেই কবি পরমসত্তাকে মন-মাঝির আসনে অধিষ্ঠিত করে তাঁকে জীবনের বিপদসংকুল নদী পার করে দেওয়ার জন্য আকুল প্রার্থনা জানিয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, জীবনের যাত্রাপথে এমন এক সংকটময় অবস্থায় এসে পৌঁছেছেন, যেখানে নিজের শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দুঃখ ও দুর্দশার স্রোত এত গভীর যে তা অতিক্রম করার ক্ষমতা তাঁর নেই। চারদিকে শুধু অনিশ্চয়তা ও বিপদের বিস্তার। তাই তাঁর আকুল আর্তি 'নাইয়া কর পার!'।
গানের পরবর্তী অংশে কবি জীবনের প্রবল সংকটের চিত্র আরও তীব্রভাবে তুলে ধরেছেন। দুঃখ, ভয় ও বিপদ এমনভাবে তাঁকে ঘিরে ধরেছে যে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। যেমন প্রবল জোয়ার নদীর দুই কূল ছাপিয়ে যায়, তেমনি জীবনের দুর্যোগও সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে তাঁর জীবনে, আর তিনি মুক্তির আশায় পরম আশ্রয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন।
গানের শেষাংশে কবি জীবনের অনন্ত দুঃখের সাগরে ভেসে যাওয়ার বেদনা প্রকাশ করেছেন।
'কুলবধূ' এখানে শুধু কোনো গৃহবধূ নয়; রূপকার্থে এটি অসহায় মানবাত্মার প্রতীক, যে সংসার ও জীবনের দুঃখস্রোতে ভেসে যাচ্ছে এবং নিরাপদ আশ্রয় বা মুক্তির কূলের সন্ধান করছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৩৩৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ (ডিসেম্বর ১৯২৯) মাসে প্রকাশিত 'চোখের চাতক' সঙ্গীত-সংকলনে
গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩০ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ
-
চোখের চাতক
- প্রথম সংস্করণ [অগ্রহায়ণ ১৩৩৬ (ডিসেম্বর ১৯২৯)। গান ৪৯। ধবলশ্রী-
মধ্যমান]
- নজরুল-রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ফাল্গুন ১৪১৩। ফেব্রুয়ারি ২০০৭। চোখের চাতক।
গান ৪৯। ধবলশ্রী-
মধ্যমান। পৃষ্ঠা: ২২৬
-
নজরুল-গীতিকা।
- প্রথম সংস্করণ [ভাদ্র ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ। ২ সেপ্টেম্বর ১৯৩০।
খেয়াল। ২। ধবলশ্রী-
মধ্যমান। পৃষ্ঠা ১২৭]
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। তৃতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ঢাকা
ফাল্গুন ১৪১৩/মার্চ ২০০৭।] নজরুল গীতিকা। ১০০। খেয়াল
।ধবলশ্রী-
মধ্যমান। পৃষ্ঠা: ২৪৩-২৪৪]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ১৮৭২ সংখ্যক গান।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। প্রার্থনা