বিষয়: নজরুলসঙ্গীত
শিরোনাম: তুষার-মৌলি জাগো জাগো গিরি-রাজ।
তুষার-মৌলি জাগো জাগো গিরি-রাজ।
পঙ্গু তোমারে আজি হানিতেছে লাজ॥
রুদ্র ও রুদ্রাণী অঙ্কে যাহার,
দৈত্য হরিছে আজ সম্মান তার।
হে মহা-মৌনী, জাগো, পর নব সাজ॥
স্বর্গ তোমার শিরে, পদতলে হায়,
আর্যাবর্ত কাঁদে চির অসহায়
মেঘ-লোকে হ’তে হান দৈত্যেরি বাজ॥
- ভাবসন্ধান: এক গভীর জাতীয় জাগরণ ও প্রতিবাদের আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে এই
গানে। এখানে 'তুষার-মৌলি গিরিরাজ' বলতে মূলত হিমালয়-কে বোঝানো হয়েছে, যাকে কবি মহিমাময়, নীরব ও শক্তির প্রতীক হিসেবে কল্পনা করেছেন। কিন্তু সেই মহাশক্তিধর সত্তাই
কেন আজ নিস্তব্ধ ও নিষ্ক্রিয়—এটাই কবির বেদনার মূল উৎস।
প্রথমেই কবি গিরিরাজকে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন—'জাগো জাগো' ধ্বনিতে। কারণ আজ এক “পঙ্গু” (অক্ষম, দুর্বল) শক্তিও তাকে লজ্জিত করছে। অর্থাৎ, যে দেশ বা জাতি একসময় শক্তিশালী ও গৌরবময় ছিল, আজ তা দুর্বল ও অপমানিত অবস্থায় পতিত হয়েছে।
পরবর্তী পংক্তিতে “রুদ্র ও রুদ্রাণী” উল্লেখের মাধ্যমে শিব ও পার্বতী-এর উপস্থিতি বোঝানো হয়েছে, যারা শক্তি, সংহার ও সৃষ্টির প্রতীক। যে ভূমি একসময় এমন দেবশক্তির অধিষ্ঠানস্থল ছিল, আজ সেই ভূমির সম্মান
'দৈত্য' বা শত্রুর দ্বারা লাঞ্ছিত হচ্ছে। এখানে “দৈত্য” বলতে অত্যাচারী শক্তি বা বিদেশি
ব্রিটিশ শাসকের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কবি গিরিরাজকে 'মহা-মৌনী' বলে সম্বোধন করে তাঁর এই নীরবতাকে ভেঙ্গে নব সাজে, নতুন রূপে, নতুন শক্তিতে জেগে ওঠার আহ্বান
করা হয়েছে।
এরপর কবি বলেন, যার শিরে স্বর্গ এবং পদতলে আর্যাবর্ত (প্রাচীন আর্য অধ্যুষিত ভারতের
উত্তরাঞ্চল), সেই বিশাল সত্তার নিচে থাকা মানুষ আজ অসহায় হয়ে কাঁদছে। এখানে
'আর্যাবর্ত' দ্বারা উত্তর ভারতীয় আর্য সভ্যতার ঐতিহ্য ও গৌরবকে বোঝানো হয়েছে।
শেষে কবি আহ্বান করেন— মেঘলোক থেকে বজ্রপাতের মতো শক্তি নিয়ে এই 'দৈত্য'-কে আঘাত হানতে।
এই আহবান মূলত হিমালয়ের দৈবশক্তি বলে- অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রবল আঘাত
হানার জন্য।
- রচনাকাল: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু
জানা যায় না। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ) মাসে প্রকাশিত
'চন্দ্রবিন্দু' সঙ্গীত-সংকলনে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩২ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
-
চন্দ্রবিন্দু।
- প্রথম প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ১৯৩১
(আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ)
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, চতুর্থ খণ্ড [জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮, মে ২০১১।
চন্দ্রবিন্দু। ৪০। সাজগিরি-ত্রিতালী। পৃষ্ঠা: ১৮২]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ১৯২২ সংখ্যক গান।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। দৈবসত্তা। হিমালয়।
উদ্দীপনামূলক