বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: নাচে ঐ আনন্দে নন্দ-দুলাল
নাচে ঐ আনন্দে নন্দ-দুলাল
তাতা থৈ তাতা থৈ – নাচে বৃন্দবনে হরি ব্রজ-গোপাল॥
ছন্দ নামে, দক্ষিণে বামে,
টলে বাঁকা শিখী-পাখা।
উছল যমুনা-জলে বাজিছে তাল। নাচে নন্দ-দুলাল॥
বিরাট খেলে হের আজ শিশুর রূপে,
স্বর্গে কাঙাল করি- ধরায় এলো চুপে চুপে।
এত রূপ কেমনে দেখি,
দিলে কেন দুটি আঁকি
তাহে আবার পলক পড়ে;
আজি বিশ্ব-পালক হ’ল বালক রাখাল॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের নৃত্যময় বাল্যলীলা, তাঁর অপরূপ সৌন্দর্য, প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর ঐক্য এবং বিশ্বপালক হয়েও সাধারণ রাখালবালক রূপে অবতীর্ণ হওয়ার অলৌকিক মহিমা চিত্রিত হয়েছে। গানের মূল ভাব হলো—অসীম পরমেশ্বর প্রেমের টানে মানবসমাজের কাছে সহজ, স্নেহময় ও লীলাময় রূপে আত্মপ্রকাশ করেন; আর সেই রূপ দর্শনই ভক্তের পরম আনন্দ ও পরম প্রাপ্তি।
ভক্তিমূলক গানে শ্রীকৃষ্ণের বাল্য ও রাখালরূপের অপরূপ সৌন্দর্য, তাঁর লীলামাধুর্য এবং পরম ঈশ্বরত্বের এক অনন্য সমন্বয় প্রকাশিত হয়েছে। কবি বিস্ময় ও ভক্তিভরে দেখিয়েছেন যে, যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের পালনকর্তা, তিনিই বৃন্দাবনের এক চঞ্চল রাখালবালক হয়ে আনন্দে নৃত্য করছেন।
গানের শুরুতে শ্রীকৃষ্ণকে নন্দদুলাল ও ব্রজগোপাল রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি আনন্দে নৃত্য করছেন, আর তাঁর নৃত্যের ছন্দে সমগ্র বৃন্দাবন মুখরিত হয়ে উঠেছে। তাঁর পদক্ষেপের তালে তালে ময়ূরপুচ্ছ দুলছে, যমুনার জল উচ্ছ্বসিত হয়ে তাল দিচ্ছে। অর্থাৎ, প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান কৃষ্ণের নৃত্যে অংশগ্রহণ করে এক অপূর্ব আনন্দোৎসবের সৃষ্টি করেছে। এখানে কৃষ্ণ কেবল একজন নর্তক নন, তিনি সমগ্র সৃষ্টির প্রাণস্পন্দন।
পরবর্তী অংশে কবি শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বরিক ও মানবীয় রূপের অপূর্ব মিলন তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, যিনি অনন্ত, বিরাট ও সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর, তিনিই আজ এক নিষ্পাপ শিশুর রূপে লীলা করছেন। তাঁর এই আবির্ভাবে স্বর্গও যেন শূন্য হয়ে যায়, কারণ দেবলোকের ঐশ্বর্য ত্যাগ করে তিনি নিঃশব্দে মর্ত্যে অবতীর্ণ হয়েছেন। এতে ঈশ্বরের ভক্তবৎসলতা এবং মানবজাতির প্রতি তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ প্রকাশিত হয়েছে।
শেষ স্তবকে কবি শ্রীকৃষ্ণের অতুলনীয় সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। মানুষের মাত্র দুটি চোখ দিয়ে তাঁর অসীম রূপ-মাধুর্য সম্পূর্ণরূপে দেখা সম্ভব নয়; তার ওপর চোখের পলক পড়ে দর্শনেও ব্যাঘাত ঘটে। এই আক্ষেপের মধ্য দিয়ে কবির গভীর ভক্তি, প্রেম এবং ঈশ্বরদর্শনের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে। শেষে তিনি উপলব্ধি করেন—যিনি সমগ্র বিশ্বজগতের পালনকর্তা, সেই বিশ্বপালক আজ এক বালক রাখাল রূপে বৃন্দাবনে লীলা করছেন। এই বৈপরীত্যই কৃষ্ণলীলার সর্বোচ্চ মাধুর্য।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের
নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৩৯) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি
থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত
হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৫ মাস।
- গ্রন্থ:
-
গীতি-শতদল।
- প্রথম সংস্করণ। বৈশাখ ১৩৪১ খ্রিষ্টাব্দ] ৬০ সংখ্যক গান। খাম্বাজ- কার্ফা
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংকলন। পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১। গীতি-শতদল।
৬০ সংখ্যক গান। খাম্বাজ- কার্ফা। পৃষ্ঠা ৩১৬]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৯৭১]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [নভেম্বর
১৯৩২ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৩৯)]। এন ৭০৫০। শিল্পী: মিস্ বীণাপাণি
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত: সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ বন্দনা
- সুরাঙ্গ:
রাগাশ্রয়ী