বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: নাচো বনমালী করতালি দিয়া
নাচো বনমালী করতালি দিয়া হেলে দুলে ধিয়া তাধিয়া।
মধুর ছন্দে নাচো আনন্দে আমার প্রাণ নাচাইয়া।
একবার নাচো হে –
বাঁকা শিখী পাখা বামে হেলায়ে, বাঁকাশ্যাম একবার নাচো হে।
বাকা নয়ন পীত-বসন, বনমালা গলে নাচ iহে।
এসো ত্রিভঙ্গ ঠামে শ্যামরায় –
‘দক্ষিণে বামে ছন্দ নামে’ রুমুঝুমু নূপুর-পায়॥
অলক-তিলক আঁকা, শিরে শিখী পাখা, এসো মন-বন-ছায়ায়।
ঐ শুনি তার বাজে বাঁশরি আসে ঐ আসে প্রাণের হরি॥
কোটি অমল কমল-গন্ধে,
আসে দশদিক আমোদিত করি’
এলো ঐ এরো প্রাণের হরি॥
-
ভাবসন্ধান: ধ্রুব চলচ্চিত্রের শিশুশিল্পী মাষ্টার প্রবোধের জন্য কবি এই গানটি
রচনা করেছিলেন। এই গানটি কাজী নজরুল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃষ্ণভক্তিমূলক নৃত্যগীতি।
গানটি চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী মাস্টার প্রবোধ-এর নৃত্যাভিনয়ের উপযোগী করে লেখা হয়।
এই গানে কবি শ্রীকৃষ্ণকে বনমালী, বাঁকাশ্যাম, শ্যামরায় এবং প্রাণের হরি রূপে আহ্বান জানিয়ে তাঁর মনোমুগ্ধকর নৃত্যদর্শনের আকুল বাসনা প্রকাশ করেছেন। ভক্তের বিশ্বাস, কৃষ্ণের নৃত্যের ছন্দে কেবল বৃন্দাবন নয়, ভক্তের অন্তরও প্রেম, আনন্দ ও ভক্তির উচ্ছ্বাসে নেচে ওঠে।
গানের শুরুতেই কবি কৃষ্ণকে করতালি দিয়ে হেলে-দুলে নৃত্য করার আহ্বান জানান। তিনি চান, কৃষ্ণের মধুর নৃত্যের ছন্দে তাঁর নিজের প্রাণও নেচে উঠুক। এখানে কৃষ্ণের নৃত্য ভক্তির উল্লাস ও আত্মবিস্মৃত আনন্দের প্রতীক। ভক্তের কাছে ঈশ্বরদর্শন কেবল দর্শন নয়, হৃদয়ের অন্তর্লোককে আন্দোলিত করার এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
এরপর কবি কৃষ্ণের অপরূপ সৌন্দর্য-চিত্র অঙ্কন করেছেন। মাথায় বাঁকা ময়ূরপুচ্ছ, পীতবসন, গলায় বনমালা, ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমা এবং রুমুঝুমু নূপুরধ্বনিতে তিনি নৃত্য করছেন। এই রূপ বৈষ্ণব কাব্যের চিরন্তন শ্যামসুন্দরের রূপ। তাঁর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি পদক্ষেপ ও প্রতিটি ছন্দ ভক্তের হৃদয়কে মোহিত করে। এখানে বাহ্যিক রূপবর্ণনার মধ্য দিয়েও কৃষ্ণের মাধুর্য ও লীলাময় ঐশ্বর্য প্রকাশিত হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি কৃষ্ণের আগমনের অনুভূতিকে অত্যন্ত কাব্যিকভাবে প্রকাশ করেছেন। দূর থেকে তাঁর বাঁশির সুর শোনা যায়, আর সেই সুরে ভক্ত বুঝতে পারেন—‘প্রাণের হরি’ আসছেন। তাঁর আগমনে কোটি
কোটি প্রস্ফুটিত পদ্মের সুগন্ধে দশদিক আমোদিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কৃষ্ণের আবির্ভাবে সমগ্র প্রকৃতি পবিত্র, সুরভিত ও আনন্দময় হয়ে ওঠে। বাঁশির সুর, ফুলের গন্ধ এবং প্রকৃতির উল্লাস—সবই তাঁর ঐশ্বরিক উপস্থিতির লক্ষণ।
গানের শেষাংশে ভক্তের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। কৃষ্ণ সত্যিই আগমন করেন, আর ভক্তের হৃদয় পরম আনন্দে ভরে ওঠে। এই আগমন কেবল শারীরিক নয়; এটি ভক্তের অন্তরে ঈশ্বরের আবির্ভাবের প্রতীক। কৃষ্ণের নৃত্য, বাঁশির সুর এবং মাধুর্যময় রূপ ভক্তকে জাগতিক দুঃখ-দুর্দশা ভুলিয়ে প্রেম, ভক্তি ও আনন্দের এক চিরন্তন জগতে নিয়ে যায়।
-
রচনাকাল ও স্থান:
১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি ‘ধ্রুব’ নামক
চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল।
এই সময়
নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৭ মাস।
-
গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২০০৮। চলচ্চিত্র: ধ্রুব । পৃষ্ঠা: ৫৯৩]
-
চলচ্চিত্র:
ধ্রুব। ক্রাউন টকি হাউস।
১ জানুয়ারি ১৯৩৪ (সোমবার, ১৭ পৌষ ১৩৪০)।
ধ্রুবের গান। শিল্পী: মাস্টার প্রবোধ]
-
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু৭ধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা