বিষয়: নজরুলসঙ্গীত।
শিরোনাম: নাচো শ্যাম-নটবর কিশোর-মুরলীধর
নাচো শ্যাম-নটবর কিশোর-মুরলীধর অঙ্গ
মিশায়ে মম অঙ্গে।
তোমার নাচের শ্রী ফুটুক আমার এই নৃত্য-বিভঙ্গে॥
মম রক্তে বাজুক তব পায়ের নূপুর
আমার কণ্ঠে দাও বাঁশরির সুর,
তব বাঁশরির সুর।
লীলায়িত হয়ে উঠুক এ তনু তোমার প্রেম-আনন্দ-তরঙ্গে॥
আমার মাঝে হরি, নাচো যবে তুমি আমি নাচি আপনা ভুলি’
শরম ভরম যায় এই দেহ যমুনায় ছন্দের হিল্লোল তুলি’।
মনে হয় আমি যেন রাসের রাধা জনম জনম আমি নাচি তব
সঙ্গে॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তের গভীর প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং
তাঁর সঙ্গে আত্মার একাত্ম হওয়ার আকাঙ্ক্ষা উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে কবি বাহ্যিক
নৃত্যের কথা বলেননি; তিনি এমন এক আধ্যাত্মিক নৃত্যের কথা বলেছেন, যেখানে ভক্তের দেহ,
মন ও প্রাণ শ্রীকৃষ্ণের লীলার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একাকার হয়ে যায়।
গানের শুরুতে কবি শ্রীকৃষ্ণকে শ্যাম-নটবর, কিশোর ও মুরলীধর রূপে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রার্থনা করেন, কৃষ্ণ যেন তাঁর নিজের দেহের সঙ্গে ভক্তের দেহকে মিলিয়ে নৃত্য করেন। অর্থাৎ ভক্ত চান, তাঁর জীবনের প্রতিটি কর্ম, অনুভূতি ও প্রকাশে কৃষ্ণের সৌন্দর্য, লাবণ্য ও লীলার ছাপ ফুটে উঠুক। তাঁর নৃত্যের শ্রী যেন ভক্তের নৃত্যেও প্রতিফলিত হয়।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি তাঁর আত্মসমর্পণের ভাবকে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেছেন। তিনি চান, কৃষ্ণের নূপুরের ধ্বনি যেন তাঁর রক্তের স্পন্দনে অনুরণিত হয় এবং কৃষ্ণের বাঁশির সুর যেন তাঁর কণ্ঠে বেজে ওঠে। অর্থাৎ ভক্তের জীবন, হৃদস্পন্দন, বাক্য ও সঙ্গীত—সবই যেন ঈশ্বরপ্রদত্ত হয়ে ওঠে। তিনি নিজের স্বতন্ত্র সত্তাকে বিলীন করে কৃষ্ণপ্রেমের আনন্দতরঙ্গে ভেসে যেতে চান।
যখন কৃষ্ণ তাঁর অন্তরে নৃত্য করেন, তখন তিনি নিজের অস্তিত্ব ভুলে যান। লজ্জা, সংকোচ ও অহংকার দূর হয়ে যায়; তাঁর দেহ যেন যমুনার ঢেউয়ের মতো ছন্দময় হয়ে ওঠে। এটি ভক্তির এমন এক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তিসত্তা বিলীন হয়ে
কৃষ্ণ-চেতনার সঙ্গে মিলিত হয়। এই অনুভূতি বৈষ্ণব সাধনার প্রেমভক্তি ও আত্মবিস্মৃতির পরিচায়ক।
শেষ স্তবকে কবি অনুভব করেন, তিনি যেন বৃন্দাবনের রাধা, যিনি জন্মে জন্মে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে রাসলীলায় নৃত্য করছেন। এখানে রাধা কোনো
পৌরাণিক চরিত্রমাত্র নন; তিনি পরম ভক্তির প্রতীক। কবির এই উপলব্ধি আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার চিরন্তন মিলনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। জন্মে জন্মে কৃষ্ণের সঙ্গ লাভই তাঁর একমাত্র কামনা।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের
সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৬) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম
রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ২ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত
সংগ্রহ,(নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ১৯৭৪
সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৫৯৩।
- রেকরড:
এইচএমভি [সেপ্টেম্বর
১৯৩৯ (ভাদ্র- আশ্বিন ১৩৪৬) এন. ১৭৩৪৪ ]।
শিল্পী পদ্মরাণী
চট্টোপাধ্যায়
- সুরকার:
নিতাই ঘটক
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান
মুর্শেদ
[নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি,
পঁয়তাল্লিশতম খণ্ড, কবি নজরুল ইসলাম
ইনস্টিটিউট। জুন ২০১৮] গান সংখ্যা ১৭। পৃষ্ঠা: ৬৭- ৬৮ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
- তাল: কাহারবা
- গ্রহস্বর: পা