বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বল দেখি মা নন্দরানী ওগো গোকুলবালা
বল দেখি মা নন্দরানী ওগো গোকুলবালা
(ওমা) কেমন করে তোদের ঘরে (মা) এলো নন্দলালা।
(মা তুই) কোন সাধনায় দধি মথন করে
তুললি ননী হৃদয় পাত্র ভরে;
তুই সেই নবনী দিয়ে যতন করে
(মা তুই) গড়িলি কি এই ননীর পুতুল আঁধার চিকনকালা॥
অমন রসবিগ্রহ মা গড়তে পারে কে?
গোপঝিয়ারী গড়তে পারে কে?
গোকুল মেয়ে নস্ তুই মা তুই কুমারের ঝি।
(মাগো) তুই নস্ যোগিনী তবু স্বগুণ বলে
(মা তুই) শ্রীকৃষ্ণে বাঁধলি উদূখলে
(আমায়) সেই যোগ তুই শিখিয়ে দে মা বসেই জপমালা॥
- ভাবসন্ধান: বৈষ্ণব ভাবাদরশে রচিত এই গানে কবি নন্দরানীর (যশোদা.
নন্দের স্ত্রী, কৃষ্ণর পালকমাতা) প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও ঈর্ষামিশ্রিত ভক্তিভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি
মন করেন- অসাধারণ সৌভাগ্য ও সাধনার ফলে যশোদা শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পালকমাতা হওয়ার
যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। তাই তিনি নন্দরানীর কাছে জানতে চেয়েছেন- 'হে গোকুলবালা, কী এমন সাধনা করেছিলে যে পরমেশ্বর তোমার সন্তানরূপে তোমার ঘরকে ধন্য করেছেন?' এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে কবি আসলে ঈশ্বরলাভের প্রকৃত পথের সন্ধান করতে
চেয়েছেন।
গানের দ্বিতীয়াংশে- দধি মথন ও নবনী (মাখন) তৈরির দৈনন্দিন কাজকে গভীর আধ্যাত্মিক অর্থে রূপায়িত করা হয়েছে। বাহ্যত যশোদা দধি মথন করে মাখন তুলতেন; কিন্তু কবির কল্পনায় সেই দধি হলো মানুষের হৃদয়, আর মথন হলো সাধনা ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক। সেই সাধনার ফলে হৃদয়পাত্রে যে নির্মল ভক্তির নবনী সঞ্চিত হয়, তা দিয়েই যেন যশোদা কৃষ্ণরূপী
'ননীর পুতুল' গড়ে তুলেছেন। এখানে কৃষ্ণের শ্যামবর্ণ রূপকে ‘আঁধার চিকনকালা- বলে স্নেহভরে বর্ণনা করা হয়েছে, যা তাঁর অপরূপ সৌন্দর্য ও মাধুর্যের কাব্যিক প্রকাশ।
গানের অংশে কবি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বলেন, এমন রসময়, প্রেমময় ও আনন্দময় বিগ্রহ কোনো সাধারণ শিল্পীর পক্ষে সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। যশোদা যেন কেবল গোকুলের একজন গোপকন্যা নন; তিনি যেন একজন অতুলনীয় শিল্পী, যিনি মাতৃস্নেহ, ভক্তি ও প্রেম দিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন। এখানে
'কুমারের ঝি' উপমাটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেন তিনি মাটির পুতুল নয়, প্রেমের পুতুল গড়ার অতুলনীয় শিল্পী।
গানের শেষাংশে কবি শ্রীকৃষ্ণের দামোদর-লীলার প্রসঙ্গ স্মরণ করেন। যশোদা কোনো যোগিনী ছিলেন না, কোনো কঠোর তপস্যাও করেননি; কিন্তু তাঁর নির্মল মাতৃস্নেহ ও স্বাভাবিক গুণের বলেই তিনি সেই সর্বশক্তিমান শ্রীকৃষ্ণকে উদূখলে (উখল বা শিলনোড়ার কাঠের পাত্রে) বেঁধে রাখতে পেরেছিলেন। এখানে কৃষ্ণকে দড়ি দিয়ে বাঁধার ঘটনাটি প্রকৃতপক্ষে ভক্তির বন্ধনে ঈশ্বরকে আবদ্ধ করার প্রতীক। তাই কবি বিনীতভাবে যশোদার কাছে প্রার্থনা করেন-
তাঁকেও সেই ভক্তিযোগ শিখিয়ে দিতে, যাতে কেবল জপমালা ঘোরানো নয়, আন্তরিক প্রেম, আত্মসমর্পণ ও নিঃস্বার্থ ভক্তির দ্বারা
তিনিও কৃষ্ণকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারেন।
সার্বিকভাবে, গানটি শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা অবলম্বনে ভক্তির সর্বোচ্চ আদর্শকে তুলে ধরেছে। এখানে কবি দেখিয়েছেন যে,
কৃষ্ণকে লাভ করার জন্য কেবল কঠোর তপস্যা বা যোগসাধনা যথেষ্ট নয়; নির্মল হৃদয়, অকৃত্রিম প্রেম, মাতৃসুলভ স্নেহ ও নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদনই
কৃষ্ণকে মানুষের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত করতে পারে। নন্দরানী যশোদা তাই এই গানে ভক্তির সেই সর্বোচ্চ আদর্শের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭)
মাসে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির প্রথম রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ ১৪১৭, ফেব্রুয়ারি ২০১১) নামক গ্রন্থের
২০২০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬০৮।
- রেকর্ড: মেগাফোন [সেপ্টেম্বর ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৭)। জেএনজি ৫৪৯৮। শিল্পী: কমল গাঙ্গুলী।
- সুরকার:
কাজী নজরুল ইসলাম
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। নন্দরাণী
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: র