বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: হে গোবিন্দ, ও অরবিন্দ চরণে শরণ দাও হে
হে গোবিন্দ, ও অরবিন্দ চরণে শরণ দাও হে।
বিফল জনম কাটিল কাঁদিয়া, শান্তি নাহি কোথাও হে॥
জীবন-প্রভাত কাটিল খেলায়,
দুপুর ফুরাল মোহের মেলায়।
ডাকিব যে নাথ সন্ধ্যা-বেলায় ডাকিতে পারিনি তাও হে॥
এসেছি দুঃখ-জীর্ণ পথিক মৃত্যু-গহন রাতে।
কিছু নাহি প্রভু সম্বল, শুধু জল আছে আঁখি-পাতে॥
সন্তান তব বিপথগামী,
ফিরিয়া এসেছে হে জীবন-স্বামী।
পাপী তাপী তবু সন্তান আমি ধূলা মুছে-কোলে নাও হে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে একজন পাপতাপ-ক্লিষ্ট, জীবনসন্ধ্যায় উপনীত ভক্তের
গোবিন্দে (কৃষ্ণ) কাছে পরম আশ্রয় ও ক্ষমা প্রার্থনা প্রকাশ পেয়েছে। ভক্ত নিজেকে পথভ্রষ্ট সন্তান এবং
কৃষ্ণকে করুণাময় পিতা হিসেবে কল্পনা করেছেন।
গানের শুরুতেই ভক্ত গোবিন্দের 'অরবিন্দ চরণে' আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। অরবিন্দ চরণ অর্থ পদ্মের মতো কোমল ও পবিত্র চরণ। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে জাগতিক জীবনে স্থায়ী শান্তি পাননি। তাই এখন তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা-
কৃষ্ণের চরণে আশ্রয় লাভ।
যাপিত জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে ভক্তের মনে হচ্ছে, তাঁর জীবন যেন ব্যর্থতায় কেটে
গেছে। সুখ ও শান্তির সন্ধানে ঘুরেও তিনি প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারেননি। তাই
তাঁর ক্ষেদোক্তি- 'বিফল জনম কাটিল কাঁদিয়া, শান্তি নাহি কোথাও হে।'
জীবনের যে সময় ঈশ্বরকে স্মরণ করা উচিত ছিল, তখন তিনি তা করেননি; এখন যখন
মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে, তখন তিনি তাঁর অনুতাপে দগ্ধ হয়েছেন। গানের পরের অংশে নিজেকে
'দুঃখ-জীর্ণ পথিক' হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। দীর্ঘ জীবনের ক্লান্ত পথ অতিক্রম করে তিনি এখন
'মৃত্যু-গহন রাতে' এসে পৌঁছেছেন। তাঁর কোনো পার্থিব সম্বল নেই; একমাত্র সম্বল তাঁর চোখের জল। এই চোখের জল তাঁর অনুতাপ, অসহায়ত্ব ও আত্মসমর্পণের প্রতীক।
শেষ স্তবকেই গানের আবেগ সবচেয়ে গভীর হয়ে উঠেছে। কবি কৃষ্ণকে 'জীবন-স্বামী' বলে সম্বোধন করে নিজের পরিচয় দিচ্ছেন।
তিনি নিজেকে কৃষ্ণের সন্তান বলে স্বীকার করছেন। সন্তান পথভ্রষ্ট হয়েছিল, পাপ করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিতার কাছেই ফিরে এসেছে। তাই নিজের পাপের কথা স্বীকার করেও তিনি
কৃষ্ণের করুণার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। কবির শেষ প্রার্থনা- 'পাপী তাপী তবু সন্তান আমি/ধূলা মুছে-কোলে নাও হে।' এখানে
'ধূলা মুছে কোলে নেওয়া' অত্যন্ত মর্মস্পর্শী প্রতীক। পথভ্রষ্ট, ধূলিধূসরিত সন্তান যেমন ফিরে এলে স্নেহময় পিতা তার ধুলো মুছে কোলে তুলে নেন, তেমনি
কৃষ্ণ তাঁর পাপী সন্তানকে ক্ষমা করে গ্রহণ করুন'- এই প্রার্থনাই গানের পরিণতি।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা
যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ) মাসে টুইন রেকর্ড
কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ১ মাস।।
-
রেকর্ড: টুইন। জুন ১৯৩২ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৩৯)। এফটি ২০৩০। শিল্পী:
জীবনানন্দ গোস্বামী
- গ্রন্থ:
- বনগীতি।
- প্রথম সংস্করণ [১৩ অক্টোবর ১৩৩২ (রবিবার ২৭ আশ্বিন ১৩৩৯)]। বেহাগ-একতাল। বেহাগ-একতাল।
পৃষ্ঠা: ৮৯।
- নজরুল রচনাবলী। জন্মশতবর্ষ সংস্করণ পঞ্চম খণ্ড। বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮ মে, ২০১১
। বনগীতি। ৫৯। বেহাগ-একতাল। পৃষ্ঠা: ২১৩।
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২১৪২]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান মুর্শেদ
[নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, বিয়াল্লিশতম খণ্ড, আষাঢ় ১৪২৫] গান সংখ্যা ২৫। পৃষ্ঠা:
৯৬-৯৯
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ।
প্রার্থনা
- সুরাঙ্গ: ভজন