বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম : হে বিধাতা! হে বিধাতা! হে বিধাতা!
হে বিধাতা! হে বিধাতা! হে বিধাতা!
দুঃখ-শোক-মাঝে, তোমারি পরশ রাজে,
কাঁদায়ে জননী-প্রায়, কোলে কর পুনরায়, শান্তি-দাতা॥
ভুলিয়া যাই হে যবে সুখ-দিনে তোমারে
স্মরণ করায়ে দাও আঘাতের মাঝারে।
দুঃখের মাঝে তাই, হরি হে, তোমারে পাই দুঃখ-ত্রাতা॥
দারা-সুত-পরিজন-রূপে হরি, অনুখন
তোমার আমার মাঝে আড়াল করে সৃজন।
তুমি যবে চাহ মোরে, লও হে তোদের হ’রে
ছিঁড়ে দিয়ে মায়া-ডোর, ক্রোড়ে ধর আপন।
ভক্ত সে প্রহ্লাদ ডাকে যবে 'নারায়ণ',
নির্মম হয়ে তার পিতারও হর জীবন।
সব যবে ছেড়ে যায় দেখি তব বুকে হায় আসন পাতা॥
- ভাবসন্ধান: দুঃখ কখনো কখনো আরাধ্য দেবতার প্রতি বিমুখতা, মানুষকে আবার
তাঁর দিকে ফিরিয়ে আনে। সুখে মানুষ তাঁকে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু দুঃখ ও বিপদের মধ্যে তাঁর করুণার স্পর্শ অধিক গভীরভাবে অনুভূত হয়। সংসারের সম্পর্ক ও মায়া
পরমসত্তাকে আড়াল করলেও, শেষ পর্যন্ত যখন সব পার্থিব আশ্রয় ক্ষয় হয়ে যায়, তখন তাঁর আশ্রয়ই অবশিষ্ট থাকে।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে - দুঃখ ও বিপদের মধ্য দিয়ে হরির (বিষ্ণু, কৃষ্ণ) সান্নিধ্য লাভ, সংসার-মায়ার আড়ালে
তাঁকে হারিয়ে ফেলা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁরই শরণে ফিরে আসা—এই আধ্যাত্মিক ভাবটি
উপস্থাপিত হয়েছে।
গানের শুরুতেই বিধাতা তথা হরিকে বারবার আহ্বান করার মধ্যে ভক্তের মনের গভীর আকুলতা প্রকাশিত
হয়েছে। জীবনের দুঃখ-শোকের মুহূর্তে মানুষ যখন সমস্ত পার্থিব আশ্রয় হারায়, তখন
হরির স্নেহময় উপস্থিতিই তার প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে।
দুঃখের মধ্যেও হরির করুণার স্পর্শ অনুভূত হয়। এখানে হরিকে এক স্নেহময়ী জননীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেমন মা কাঁদতে থাকা সন্তানকে কোলে তুলে সান্ত্বনা দেন, তেমনি
তিনিও দুঃখে বিপর্যস্ত মানুষকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে শান্তি দেন।
কিন্তু সুখের সময়ে মানুষ প্রায়ই তাঁকে ভুলে যায়। তখন জীবনের আঘাত ও বিপর্যয় তাকে আবার নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করায় এবং
তাঁর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই কবির কাছে দুঃখও এক অর্থে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যম।
‘দুঃখের মাঝে তাই, হরি হে, তোমারে পাই / দুঃখ-ত্রাতা’—এই উপলব্ধিই গানটির একটি প্রধান দর্শন। দুঃখের সময়ে মানুষ যখন অহংকার, আত্মনির্ভরতার ভ্রান্তি ও পার্থিব আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তার অন্তরে
হরির উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই দুঃখের মধ্যেই কবি তাঁর ত্রাতাকে খুঁজে পান।
'দারা-সুত-পরিজন' বলতে স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজনসহ পার্থিব সম্পর্ককে বোঝানো হয়েছে। এই সম্পর্কগুলো মানুষের জীবনে ভালোবাসা ও আনন্দের উৎস হলেও অতিরিক্ত আসক্তির কারণে এগুলো কখনো কখনো
হরির স্মরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় । অর্থাৎ মানুষ আপনজনের প্রতি মায়ায় এমনভাবে আবদ্ধ হয় যে সেই মায়ার অন্তরালে থাকা পরমসত্তাকে ভুলে যায়।
এই ভাবনার সূত্রে কবি হরির কাছে আত্মসমর্পণের কথা বলেছেন। কবি মনে করেন, তিনি যখন তাঁকে নিজের কাছে ডাকবেন, তখন যেন সংসারের মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে তাঁকে নিজের কোলে তুলে নেন। এটি মৃত্যুর আক্ষরিক কামনা নয়, বরং আত্মার পরমসত্তার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষা।
গানের শেষাংশে প্রহ্লাদ ও নারায়ণের পৌরাণিক কাহিনি দিয়ে এই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
‘ভক্ত সে প্রহ্লাদ ডাকে যবে “নারায়ণ”, / নির্মম হয়ে তার পিতারও হর জীবন।’ অর্থাৎ প্রহ্লাদ যখন বিপদের মধ্যেও নারায়ণের নাম থেকে বিচ্যুত হয়নি, তখন তার পিতা হিরণ্যকশিপুর অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে নারায়ণ নৃসিংহরূপে আবির্ভূত হন। এখানে পৌরাণিক ঘটনাটি
বিষ্ণুর ভক্তরক্ষক ও অধর্মবিনাশী রূপের প্রতীক।
সভশেষে কবি এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন যে,- জীবনের সব পার্থিব আশ্রয় যখন একে একে সরে যায়, তখন দেখা যায়
হরির বুকে ভক্তের জন্য আসন আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। অর্থাৎ পার্থিব সব বন্ধন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু
হরির আশ্রয় চিরস্থায়ী।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (রবিবার
২৭ আশ্বিন ১৩৩৯) প্রকাশিত 'বনগীতি' গ্রন্থে গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে
প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
-
বনগীতি
- প্রথম সংস্করণ [১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (রবিবার ২৭ আশ্বিন
১৩৩৯)। ভজন। মেঘ-তেতালা। পৃষ্ঠা: ৩৯-৪০]
।
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। পঞ্চম খণ্ড।
বাংলা একাডেমী। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮
মে, ২০১১। বনগীতি। ২৫ সংখ্যক গান। ভ্জন। মেঘ-তেতালা। পৃষ্ঠা ১৯৩]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২১৫১। রাগ: মেঘ, তাল: ত্রিতাল পৃষ্ঠা: ৬৪৭।
-
রেকর্ড:
- এইচএমভি [নভেম্বর ১৯৩২ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৩৯)। পি ১১৭৫৭। শিল্পী ইন্দুবালা।
]
- টুইন [জুলাই ১৯৩৫ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৪২)। এফটি ৪০১৯। শিল্পী ইন্দুবালা। ]
- এইচএমভি [জুন ১৯৬৪। শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। এন ৮৩০৭৪। এই রেকর্ডের
লেবেলে প্রথম 'নজরুলগীতি' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল।]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। হরি। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: খেয়ালাঙ্গ
- রাগ: মেঘ [মেঘ
মল্লার]
- তাল:
ত্রিতাল
- গ্রহস্বর:মপা