বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: সৈয়দে মক্কী মদনী আমার নবী মোহাম্মদ
সৈয়দে মক্কী মদনী আমার নবী মোহাম্মদ
করুণা-সিন্ধু খোদার বন্ধু নিখিল মানব-প্রেমাস্পদ॥
আদম নূহ্ ইব্রাহিম দাউদ সোলেয়মান মুসা আর ঈসা,
সাক্ষ্য দিল আমার নবীর, সবার কালাম হ'ল রদ।
যাঁহার মাঝে দেখ্ল জগৎ ইশারা খোদার নূরের,
পাপ-দুনিয়ায় আনলো যে রে, পুণ্য বেহেশ্তী সনদ॥
হায় সিকান্দর খুঁজ্ল বৃথাই আব-হায়াত এই দুনিয়ায়
বিলিয়ে দিল আমার নবী, সে সুধা মানব সবায়।
হায় জুলেখা মজ্ল ঐ ইউসুফেরই রূপ দেখে,
দেখ্লে মোদের নবীর সুরত্ যোগীন হত ভসম মেখে'।
শুন্লে নবীর শিরিন জবান, দাউদ মাগিত মদদ॥
ছিল নবীর নূর পেশানিতে, তাই ডুব্ল না কিস্তি নূহের
পুড়্ল না আগুনে হযরত ইব্রাহিম সে নমরুদের
হায়, দোজখ্ আমার হারাম হ'ল পিয়ে কোরানের শিরিন শ্যহদ্॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশের পাশাপাশি তাঁকে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কোরআনের শিক্ষা, নবীর আদর্শ এবং আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে মানুষের আত্মিক মুক্তি ও কল্যাণ লাভের বার্তাই এই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শনে রচিত এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বোচ্চ মর্যাদা, তাঁর প্রতি গভীর ভক্তি এবং ইসলামী ঐতিহ্যে তাঁর অনন্য স্থানকে কাব্যিক ভাষায় তুলে ধরেছেন। নাতধর্মী এই গানে কবি কোরআন, নবীদের ইতিহাস এবং সুফি ভাবধারার নানা প্রতীক ব্যবহার করে মহানবী (সা.)-এর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন।
গানের শুরুতে কবি মহানবী (সা.)-কে মক্কা ও মদিনার নেতা, আল্লাহর বন্ধু এবং সমগ্র মানবজাতির প্রিয়তম বলে অভিহিত করেছেন। তিনি করুণার অফুরন্ত উৎস, যাঁর জীবন ও আদর্শ জাতি, বর্ণ ও ধর্মের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র মানবতার কল্যাণের জন্য নিবেদিত। তাঁর আগমন মানুষের প্রতি আল্লাহর অসীম রহমতের প্রকাশ।
পরবর্তী অংশে কবি আদম (আ.), নূহ (আ.), ইবরাহিম (আ.), দাউদ (আ.), সুলাইমান (আ.), মুসা (আ.) ও ঈসা (আ.)-সহ পূর্ববর্তী নবীদের উল্লেখ করেন।
কবি এখানে বোঝাতে চেয়েছেন যে, পূর্ববর্তী সব নবীর শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে। এখানে
'সবার কালাম হ'ল রদ' কথাটি পূর্ববর্তী নবীদের অস্বীকার নয়; বরং ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁদের যুগভিত্তিক শরিয়তের স্থলে সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ শরিয়তের আগমনের কাব্যিক ইঙ্গিত।
এরপর কবি বলেন, মহানবী (সা.)-এর মধ্যে মানুষ আল্লাহর নূরের প্রকাশ দেখতে পেয়েছে। তিনি পাপাচারে নিমজ্জিত পৃথিবীতে ন্যায়, সত্য, দয়া ও মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, যেন মানুষ জান্নাতমুখী জীবন গড়তে পারে। এখানে ‘বেহেশ্তী সনদ' বলতে ঈমান ও সৎকর্মের সেই পথনির্দেশ বোঝানো হয়েছে, যা মুক্তির দিকে পরিচালিত করে।
এরপর কবি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তিগত উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, সিকান্দার (আলেকজান্ডার) অমরত্বের জল (আব-হায়াত) খুঁজে পাননি; কিন্তু মহানবী (সা.) মানবজাতিকে এমন এক চিরন্তন জীবনদর্শন দিয়েছেন, যা আত্মাকে অমরত্বের পথে পরিচালিত করে। আবার জুলেখা যেমন ইউসুফ (আ.)-এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন, তেমনি কবির কল্পনায় মহানবী (সা.)-এর রূপ ও মাধুর্য তারও ঊর্ধ্বে। এমনকি তাঁর মধুর বাণী শুনলে দাউদ (আ.), যিনি নিজেও সুমধুর কণ্ঠের জন্য প্রসিদ্ধ, তিনিও যেন মুগ্ধ হতেন। এগুলো ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং নবীপ্রেম প্রকাশের কাব্যিক অতিশয়োক্তি।
গানের শেষাংশে কবি সুফি ভাবধারার একটি পরিচিত কাব্যিক বিশ্বাসের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, নবীর নূরের বরকতেই নূহ (আ.)-এর নৌকা ডুবে যায়নি এবং ইবরাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে দগ্ধ হননি। এটি ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়; বরং নবী (সা.)-এর নূরের মাহাত্ম্য প্রকাশে সুফি সাহিত্যিক কল্পনার ব্যবহার। সবশেষে কবি বলেন, তিনি কোরআনের মধুর বাণী হৃদয়ে ধারণ করেছেন; তাই তাঁর জন্য জাহান্নামের পথ রুদ্ধ হয়েছে—অর্থাৎ কোরআনের শিক্ষা অনুসরণই মুক্তির পথ।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত '
জুলফিকার'
গীতি-গ্রন্থে
প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৩ মাস।
- গ্রন্থ:
-
জুলফিকার
- প্রথম সংস্করণ [১৫ অক্টোবর ১৯৩২
(শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)]। মিশ্র খাম্বাজ-কার্ফা
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭, জুলফিকার।
১৯ সংখ্যক গান। মিশ্র খাম্বাজ-কার্ফা । পৃষ্ঠা: ৩০৩-৩০৪]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ২৯২ সংখ্যক গান। বৈতালিক।
- রেকর্ড:
মেগাফোন।
জুন ১৯৩৩ (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৩৪০)। জেএনজি ৫৭। শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
[শ্রবণ
নমুনা]
-
স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি: সুধীন
দাশ।
[নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
পঞ্চম খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট,
ঢাকা]। ২৫ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ১১৯--১২২।
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য