বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: প্রথম প্রদীপ জ্বালো মম
প্রথম প্রদীপ জ্বালো মম ভবনে হে আয়ুষ্মতী
আঁধার ঘিরে' আশার আলো আনুক তোমার গৃহের জ্যোতি॥
হেরিয়া তোমার আঁখির আলোক
বিষাদিত সাঁঝ পুলকিত হোক,
যেন দূরে যায় সব দুখ শোক, তব শঙ্খরব শুনি', হে সতী॥
কাঁকন পরা তব শুভ কর
মুখর করুক এ নীরব ঘর
এ গৃহে আনুক বিধাতার বর তোমার মধুর প্রেম-আরতি॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে সনাতন আর্যসমাজের নববধূর স্বামীর গৃহে প্রথম পদার্পণকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এক শুভ ও মঙ্গলময় সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের সৌরভ ফুটে উঠেছে। এখানে বধূবরণ উৎসবের এক নিটোল ও হৃদয়স্পর্শী চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, যেখানে নববধূর প্রতি সংসারের কল্যাণ কামনা ও আশীর্বচনের আবহ সুস্পষ্ট।
প্রথাগতভাবে এই গানে এমন এক নববধূর আহ্বান জানানো হয়েছে, যিনি গৃহের জন্য সুমঙ্গলময়ী, পবিত্রা ও কল্যাণদায়িনী। তাঁর আগমনে যে গৃহ ছিল বিষাদময়, আশাহীন ও নিরানন্দ, তা রূপান্তরিত হয়ে ওঠে মঙ্গলময়, আশান্বিত ও আনন্দনিকেতনে। কবি এই নববধূর আগমনকে এক পবিত্র উৎসব হিসেবে কল্পনা করেছেন।
কবির কামনা, নবজীবনের এই সূচনালগ্নে কল্যাণদায়িনী নববধূর হাতে প্রজ্বলিত প্রথম
প্রদীপটি যেন হয়ে ওঠে জীবনের প্রথম শুভ জাগরণ ও কল্যাণের প্রথম আশ্বাসের দীপশিখা।
চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকার ও নিরাশার মধ্যে এই আলো যেন আশার দীপ্ত শিখা হয়ে জ্বলে
ওঠে। কবির আশীর্বচন যেন এই উৎসব-লগ্নকে আরও পবিত্র ও আলোকিত করে তোলে। তাঁর কামনা-
এই শুভ উৎসব যেন দীর্ঘজীবী হয়, চিরন্তন রূপে যাপিত জীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে। এই
কারণেই কবি নববধূকে 'আয়ুষ্মতী' (দীর্ঘায়ুসম্পন্না ও মঙ্গলময়ী নারী) বলে অভিহিত
করেছেন।
সংসারের সকল বিষাদ, ক্লান্তি ও নিরানন্দের আবরণ অপসৃত হয়ে নববধূর চোখের স্নিগ্ধ
আলোকেই ম্লান সন্ধ্যা নতুন প্রাণ ও পুলকে উদ্ভাসিত হয়। তাঁর উপস্থিতি দুঃখ-শোকের
সমস্ত ভার লাঘব করে হৃদয়কে মুক্ত, প্রশান্ত ও আনন্দময় করে তোলে। তাঁর আগমনের
শঙ্খধ্বনি সমস্ত বেদনা ও বিষাদকে দূরীভূত করে এক পবিত্র মঙ্গলময় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
আর্য ঐতিহ্যে শঙ্খধ্বনি শুভ, পবিত্রতা ও ঐশ্বরিক সূচনার প্রতীক—এই সাংস্কৃতিক
পরম্পরার মধ্য দিয়ে কবি নববধূর আগমনকে এক দেবোপম কল্যাণময় রূপ দিয়েছেন।
এই ঐতিহ্যের ধারাতেই কবি কামনা করেছেন, নববধূর কাঁকন-শোভিত হাতের মৃদু ধ্বনি যেন এই
নীরব ঘরকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তাঁর আগমনে নিস্তব্ধ, নির্জীব গৃহ সজীবতা, উচ্ছ্বাস
ও জীবনের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল
সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫
জুলাই (মঙ্গলবার, ১ আষাঢ় ১৩৪৪),
এইচ.এম.ভি. রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের যে
চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়, তাতে এই গানটি ছিল। এই সময়
নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্
নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫।
জুন ২০১৮। গান ৩১৮। পৃষ্ঠা ৯৯]
- বেতার:
- একক অনুষ্ঠান, শিল্পী-মৃণালকান্তি ঘোষ [১৫ জুন ১৯৩৮ (মঙ্গলবার, ৩২
জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৫]
- একক অনুষ্ঠান, শিল্পী-নিতাই ঘটক [৩ আগষ্ট ১৯৩৮ (রবিবার, ১৮ আষাঢ় ১৩৪৫)]
- রেকর্ড:
- ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার, ৩১ আষাঢ় ১৩৪৪)
এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানির সাথে নজরুলের চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তিপত্রে এই গানটি
তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল।
- এইচএমভি।
[জুলাই
১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ (আষাঢ়-শ্রাবণ ১৩৫৬)।
এন ৩১০৪৯।
শিল্পী:
জগন্ময় মিত্র সুর-নজরুল
ইসলাম।] [শ্রবণ
নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর।
[নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড
(নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)] ১৬ সংখ্যক গান
[নমুনা]
- সুরকার:
নজরুল
ইসলাম।
- পর্যায়: