বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: বাঁশি বাজায় কে কদমতলায় ওলো ললিতে
বাঁশি বাজায় কে কদমতলায় ওলো ললিতে
শুনে সরে না পা পথ চলিতে॥
তার বাঁশির ধ্বনি যেন ঝুরে ঝুরে
আমারে খোঁজে লো ভুবন ঘুরে
তার মনের বেদন শত সুরে সুরে
(ও সে)
কি যেন চাহে মোরে বলিতে॥
আছে গোকূল নগর আরো কত নারী
কত
রূপবতী বৃন্দাবন-কুমারী
আছে
গোকূল নগরে।
কেন
আমারি নাম লয়ে বংশীধারী
আসে
নিতি নিতি মোরে ছলিতে।
সখি
নিমর্ল কুলে
মোর কৃষ্ণ-কালি
কেন
লাগালে কালিয়া বনমালী
আমার বুকে
দিল তুষের আগুন জ্বালি
আরো
কত জনম যাবে জ্বলিতে॥
-
ভাবাসন্ধান: এই গানে রাধার হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গভীর প্রেম, বিরহ, অভিমান এবং আত্মসমর্পণের অনুভূতি অত্যন্ত সজীবভাবে
উপস্থাপিত হয়েছে। কৃষ্ণের বাঁশির সুর তাঁর অন্তরে এমন আলোড়ন সৃষ্টি করে যে, তিনি আর স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে প্রেমের আকর্ষণ ও বিরহের দহন পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে।
গানের শুরুতে রাধা সখী ললিতাকে প্রশ্ন করেন—কদমতলায় কে বাঁশি বাজাচ্ছে? যদিও তিনি অন্তরে জানেন, সেই বাঁশিওয়ালা শ্রীকৃষ্ণই। কিন্তু তাঁর প্রশ্নের মধ্যে বিস্ময়, আকুলতা এবং প্রিয়জনকে স্মরণ করার আনন্দ মিশে আছে। বাঁশির সুর শুনে তাঁর পদযুগল আর এগোতে চায় না; যেন সেই সুর তাঁকে অদৃশ্য শক্তির মতো থামিয়ে দেয়। এখানে কৃষ্ণের বাঁশি পরমপ্রিয়ের প্রেমময় আহ্বানের প্রতীক, যা মানুষের সমস্ত কর্ম ও চেতনাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে।
এরপর রাধা অনুভব করেন, সেই বাঁশির প্রতিটি সুর যেন তাঁরই সন্ধানে সমগ্র ভুবন ঘুরে বেড়াচ্ছে। কৃষ্ণের হৃদয়ের যে গভীর প্রেম ও বেদনা, তা বাঁশির শত সুরে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সেই সুরের ভাষা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না; শুধু মনে হয়, কৃষ্ণ যেন তাঁকে কোনো গভীর প্রেমবার্তা জানাতে চাইছেন। এই অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষাই গানের আবেগকে আরও গভীর করেছে।
গানের পরবর্তী অংশে রাধার অভিমান প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, গোকুলে তো অসংখ্য সুন্দরী গোপিনী রয়েছে; তবে কেন কৃষ্ণ বারবার তাঁরই নাম উচ্চারণ করে বাঁশি বাজান? কেন তাঁকেই নিত্য নতুন ছলে আকৃষ্ট করেন? এই প্রশ্নে ঈর্ষা নেই, বরং প্রিয়জনের একান্ত ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। প্রেমিকের কাছে নিজের বিশেষ স্থান আছে কি না—এই চিরন্তন মানবীয় প্রশ্নই এখানে কাব্যিক রূপ লাভ করেছে।
গানের শেষাংশে রাধা নিজের অন্তরের গভীর দহন-যাতনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তিনি ছিলেন নির্মল কুলের কন্যা; কিন্তু কৃষ্ণরূপী ‘কালিয়া বনমালী- তাঁর হৃদয়ে প্রেমের এমন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন, যা তুষের আগুনের মতো ধীরে ধীরে কিন্তু নিরন্তর জ্বলছে।
'তুষের আগুন' এমন আগুন, যা বাইরে খুব বেশি প্রকাশ পায় না, কিন্তু ভিতরে দীর্ঘক্ষণ ধরে জ্বলতে থাকে। এই উপমার মাধ্যমে কবি বিরহের নীরব অথচ অসহনীয় যন্ত্রণাকে প্রকাশ করেছেন। রাধা প্রশ্ন করেন, এই প্রেমের দহন তাঁকে আর কত জন্ম ধরে বহন করতে হবে। এখানে
'অনেক জন্ম' বলতে প্রেমের চিরন্তনতা ও আত্মার অবিনশ্বর আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে।
এই আকাঙ্ক্ষার জন্ম-জন্মান্তরের।
সার্বিকভাবে, গানটি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মাধ্যমে ভক্ত ও পরমাত্মার সম্পর্কের এক গভীর প্রতীকী রূপ উপস্থাপন করেছে। কৃষ্ণের বাঁশি এখানে
কৃষ্ণেরই আহ্বান, রাধার অভিমান মানুষের প্রেমময় হৃদয়ের স্বাভাবিক অনুভূতি, আর বিরহের আগুন আত্মার
কৃষ্ণলাভের অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাই এই গান কেবল প্রেমের নয়; এটি বিরহ, ভক্তি, আত্মসমর্পণ এবং চিরন্তন মিলনের প্রত্যাশারও এক অনুপম কাব্য।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৭
খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর
(আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৪) মাসে,
এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। সময় নজরুলের বয়স ছিল
৩৮ বৎসর ৪ মাস।
-
গ্রন্থ:
- নজরুল গীতি, অখণ্ড
- প্রথম সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৬ আশ্বিন ১৩৮৫। ২৩ সেপ্টেম্বর
১৯৭৮]
- দ্বিতীয় সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ১ শ্রাবণ ১৩৮৮। ১৭ জুলাই
১৯৮১]
- তৃতীয় সংস্করণ [ব্রহ্মমোহন ঠাকুর সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৮ মাঘ ১৪১০। ২৩ জানুয়ারি ২০০৪। লোকগীতি। ২০৮১ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা
৫৫০]
- পরিবর্ধিত সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। বৈশাখ শ্রাবণ ১৪১৩। এপ্রিল-মে ২০০৬] ভৈরবী-গজল। ১৮১৬ সংখ্যাক গান। পৃষ্ঠা:
৩৬০।
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ৩৩। পৃষ্ঠা
১১]
-
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
দ্বিতীয় খণ্ড। স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ।
প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। পৌষ ১৪০২। ডিসেম্বর ১৯৯৫। ৮ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ৪৮-৫৪]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [অক্টোবর
১৯৪২ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৯) । এন ৯৯৬৩। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ। সুর:
গিরীণ চক্রবর্তী।
- সুরকার: নজরুল ইসলাম।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ।
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
দ্বিতীয় খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন ১৪১১। ফেব্রুয়ারি ২০০৫। অষ্টম গান।
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: ভাটিয়ালি (ঝুমুর ছন্দে নিবদ্ধ)।
- তাল:
দাদরা।
- গ্রহস্বর: ধপা।