বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ব্রজ-গোপী খেলে হোরি
ব্রজ-গোপী খেলে হোরি
খেলে আনন্দ নবঘন শ্যাম সাথে।
রাঙা অধরে ঝরে হাসির কুম্কুম্
অনুরাগ-আবির নয়ন-পাতে॥
পিরিতি-ফাগ মাখা গোরীর সঙ্গে
হোরি খেলে হরি উন্মাদ রঙ্গে।
বসন্তে এ কোন কিশোর দুরন্ত
রাধারে জিনিতে এলো পিচ্কারি হাতে॥
গোপিনীরা হানে অপাঙ্গ খর শর ভ্রুকুটি ভঙ্গ
অনঙ্গ আবেশে জর জর থর থর শ্যামের অঙ্গ।
শ্যামল তনুতে হরিত কুঞ্জে
অশোক ফুটেছে যেন পুঞ্জে পুঞ্জে
রঙ-পিয়াসি মন ভ্রমর গুঞ্জে
ঢালো আরো ঢালো রঙ প্রেম-যমুনাতে॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে বৃন্দাবনের হোলি উৎসবকে রাধাকৃষ্ণের চিরন্তন প্রেমলীলা ও ভক্তিরসের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে রঙ, আবির, পিচকারি ও বসন্তের সমস্ত উপকরণ কেবল উৎসবের অনুষঙ্গ নয়; এগুলো প্রেম, আনন্দ, মিলন ও আত্মবিস্মৃত ভক্তির রূপক।
গানের শুরুতেই কবি উপস্থাপন করেছেন- ব্রজের গোপীদের নবঘনশ্যাম কৃষ্ণের হোলি খেলার
রূপমাধ্যুর্য। সেখানে চলছে হোরি-উৎসবের বর্ণঢ্য আনন্দ-উচ্ছ্বাস। রূপকল্পে
উপস্থাপন করেছেন- হোরির লীলার অংশভাগিনীদের রাঙা অধর থেকে ঝরে পড়া হাসি, যা কুমকুমের মতো লাল, নয়ন অনুরাগের আবিরে রঞ্জিত। অর্থাৎ তাঁদের সমগ্র সত্তাই
বর্ণাঢ্য প্রেমের রসে পূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এরপর কবি বলেন, প্রেমের ফাগে রঞ্জিত গোরীদের সঙ্গে কৃষ্ণ উন্মাতাল আনন্দে হোলি খেলছেন। বসন্তের এই রঙের উৎসবে কৃষ্ণ যেন এক দুরন্ত কিশোর, যিনি পিচকারি হাতে রাধার হৃদয় জয় করতে এসেছেন। এখানে পিচকারি বা রঙ নিক্ষেপের ঘটনাটি কোনো সাধারণ কৌতুক নয়; এটি প্রেম নিবেদন ও হৃদয়ের রঙে অপরকে রঞ্জিত করার প্রতীক।
গানের পরবর্তী অংশে গোপিনীদের চাওয়া, ভ্রুকুটির ভঙ্গি ও অপাঙ্গ-দৃষ্টিকে (চোখের
দৃশষ্টিবাণ) প্রেমের শর বা কামদেবের বাণের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাঁদের প্রেমময় দৃষ্টির আঘাতে কৃষ্ণও প্রেমাবেশে মুগ্ধ ও আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন। এটি পারস্পরিক প্রেমের এমন এক চিত্র, যেখানে জয়-পরাজয়ের কোনো ভেদ নেই; প্রেমেই উভয়ের পূর্ণতা।
গানের শেষাংশে কবি বলেন, শ্যামবর্ণ কৃষ্ণের দেহ যেন সবুজ কুঞ্জবনে ফুটে থাকা অশোকফুলে সুশোভিত। চারদিকে প্রেমের রঙে প্রকৃতিও যেন নতুন রূপ ধারণ করেছে। ভ্রমরের মতো প্রেমপিপাসু মন সেই রসের সন্ধানে গুঞ্জরিত হয়। তাই কবির আকাঙ্ক্ষা—প্রেম-যমুনায় আরও রঙ ঢেলে দাও। এখানে সেই রঙ পার্থিব রঙ নয়; তা ভক্তি, অনুরাগ, মিলন ও আত্মসমর্পণের অমৃতরস।
এই গানে বৃন্দাবনের হোলি উৎসবের বাহ্যিক রঙিন দৃশ্যের আড়ালে রাধাকৃষ্ণের চিরন্তন প্রেম, ভক্তির আনন্দ, বসন্তের নবজাগরণ এবং আত্মাকে ঈশ্বরপ্রেমে রঞ্জিত করার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অত্যন্ত কাব্যময় ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। মূল বক্তব্য হলো- প্রকৃত হোলি হলো সেই উৎসব, যেখানে হৃদয় প্রেম, ভক্তি ও অনুরাগের রঙে রঞ্জিত হয়ে
কৃষ্ণের সঙ্গে মিলনের আনন্দে উদ্বেলিত হয়।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৪০
খ্রিষ্টাব্দের মার্চ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৬) মাসে, পায়োনিয়র রেকর্ড কোম্পানি প্রথম গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশ করে।
এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ:
- অগ্রন্থিত গান। নজরুল-রচনাবলী─দশম খণ্ড [নজরুল জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। বাংলা একাডেমী, জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬। মে ২০০৯। ৩৮৫ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা
৪০২-৪০৩]
- নজরুল গীতি, অখণ্ড
- প্রথম সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৬ আশ্বিন ১৩৮৫। ২৩ সেপ্টেম্বর
১৯৭৮]
- দ্বিতীয় সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ১ শ্রাবণ ১৩৮৮। ১৭ জুলাই
১৯৮১]
- তৃতীয় সংস্করণ [ব্রহ্মমোহন ঠাকুর সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৮ মাঘ ১৪১০। ২৩ জানুয়ারি ২০০৪। ভক্তিগীতি। ১৬৪৩ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা
৪৩০]
- পরিবর্ধিত সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। বৈশাখ শ্রাবণ ১৪১৩। এপ্রিল-মে ২০০৬] ভৈরবী-গজল। ১৪৮৬ সংখ্যাক গান। পৃষ্ঠা: ২৯০।
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ৪৪। পৃষ্ঠা
১৪-১৫]
-
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
দ্বিতীয় খণ্ড। স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ।
প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। পৌষ ১৪০২। ডিসেম্বর ১৯৯৫। ১৯ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা
৯৫-৯৭]
-
রেকর্ড:
পায়োনিয়র [মার্চ ১৯৪০ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৬)। এনকিউ
১৭৪। শিল্পী: বেচু দত্ত। পিলু-খাম্বাজ]
- বেতার: আবীর কুমকুম
(গীতি-আলেখ্য)। দোল-পূর্ণিমা উপলক্ষে প্রচারিত গীতি-আলেখ্য। কলকাতা খ।
তৃতীয় অধিবেশন। ১৩ মার্চ ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪৭)। রাত
৮.০০-৮.৩৯০।
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ৫ম সংখ্যা। ১৭ মার্চ ১৯৪১। পৃষ্ঠা: ২৭৪
- Indian-listener 1941-Vol-VI-5. page 75
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ।
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
দ্বিতীয় খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন ১৪১১। ফেব্রুয়ারি ২০০৫। ১৯তম গান
[নমুনা]
সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
বি.দ্র.: রেকর্ডের সুরটি প্রকৃতপক্ষে নজরুলের। চিত্ত রায় প্রায়শই নজরুলের সুর নিজের নামে রেকর্ডে প্রকাশ করতেন। এর একটি উদাহরণ 'গভীর রাতে জাগি খুঁজি তোমারে' গানটির রেকর্ড।
[তথ্যসূত্র: নজরুল সঙ্গীত নির্দেশিকা, ব্রহ্মমোহন ঠাকুর (নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। প্রথম সংস্করণ। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬। ২৫ মে ২০০৯)। ১৯৫০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ৫৪৬]
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত, সনাতন হিন্দুধর্ম, বৈষ্ণব,
উৎসব। হোরি/হোলি
- সুরাঙ্গ: হোরি/হোলি
গান