বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: তুমি সুন্দর কপট হে নাথ! মায়াতে রাখ বিভোর
তুমি সুন্দর কপট হে নাথ! মায়াতে রাখ বিভোর।
তোমার ছলনা যে বোঝে না নাথ সেই সে দুঃখী ঘোর॥
কত শত রূপে
নিঠুর আঘাতে
তুমি চাও নাথ
তোমারে ভোলাতে
তবু যে তোমারে ভুলিতে পারে না ধরা দাও তারে চোর॥
কাঁদাও তাহারে নিশিদিন তুমি যপে যে তোমার নাম
তোমারে যে চাহে শত বন্ধনে বাঁধ তারে অবিরাম।
সাগরে মিশাতে
চায় বলে নদী
জনম গোঁয়ায়
কেঁদে নিরবধি
ভক্তে তেমনি দিয়াছ যে নাথ অসীম আঁখি-লোর॥
- ভাবসন্ধান: পরম সুন্দররূপী পরমসত্তার রহস্যময় ও দুর্বোধ্য লীলার
মোহমায়ায়কে উপস্থান করা হয়েছে এই গানে। পরমসত্তার অপূর্ব লীলার ছলনায় মোহিত জগৎ। সে
মায়ারই একটি রূপ জাগতিক দুঃখ. যা গৃহী মানুষ বুঝতে পারে না। এই গানের মূল বক্তব্য হলো- ঈশ্বরের লীলা রহস্যময় ও দুর্বোধ্য হলেও, সেই লীলার অন্তরালে রয়েছে গভীর প্রেম। দুঃখ ও বিরহের মধ্য দিয়েই ভক্তের প্রেম পরিপূর্ণতা লাভ করে এবং শেষপর্যন্ত সে ঈশ্বরের কৃপা অর্জন করে।
এর মধ্য দিয়ে মূলত কবি পরমসত্তার বন্দনা করেছেন।
কবি এই গানে পরমসত্তাকে 'সুন্দর কপট' বলে সম্বোধন করেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে বিরোধাত্মক হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত গভীর।
পরমসত্তার এই 'কপটতা'কে তাঁর লীলাময় অসীম রহস্যকে বুঝানো হয়েছে। তিনি মায়ার আবরণে ভক্তকে আবদ্ধ রাখেন, আবার সেই মায়ার মধ্য দিয়েই তাঁকে
কাছে টেনে নেন। কবির দৃষ্টিতে, পরমসত্তা নানা রূপে ভক্তকে আঘাত দেন- দুঃখ, বেদনা ও বিচ্ছেদের মাধ্যমে। এই আঘাত নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং ভক্তকে সংসারমোহ থেকে বিচ্যুত করে
পরমসত্তার অভিমুখী করার এক গভীর কৌশল। মূলত ভক্ত সত্যিকার অর্থে পরমসত্তাকে যে ভালোবাসে, সে এই দুঃখের মাঝেও তাঁকে
কখনো ভুলে যায় না। বরং তাঁকে পাওয়ার জন্য তার আকুলতা আরও তীব্রতর হয়ে ওঠ। আর এই অকৃত্রিম প্রেমের কাছে ঈশ্বর নিজেই ধরা দেন।
কবি এক চমৎকার বিরোধাভাস তুলে ধরেছেন- গানটির পরবর্তী অংশে। যে ভক্ত সর্বদা
পরমসত্তাকে নানা নামে জপ করে, তাকেই তিনি আরও বেশি কাঁদান। আবার যে তাঁকে পেতে চায়, তাকেই নানা বন্ধনে আবদ্ধ করেন। এই দুঃখ ও বন্ধন আসলে ভক্তির পরীক্ষাক্ষেত্র, যেখানে প্রেমের সত্যতা যাচাই হয়। কারণ প্রকৃত প্রেম কখনো সহজলভ্য নয়; তা অর্জন করতে হয় অশ্রু ও ত্যাগের মাধ্যমে।
গানের শেষাংশে নদী ও সাগরের উপমা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নদী যেমন অবিরাম ধারা বয়ে সাগরের সঙ্গে মিলিত হতে চায়, তেমনি ভক্তও ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের জন্য আজীবন আকুল থাকে। এই পথে তাকে অশেষ অশ্রু বিসর্জন দিতে হয়। তাই কবি বলেন,
পরমসত্তা ভক্তকে 'অসীম আঁখি-লোর' দান করেন, ভক্তকে পরিশুদ্ধ করার জন্য।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৩) মাসে, টুইন রেকর্ড কোম্পানি
গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৮ মাস।
-
গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ৪৪৩ সংখ্যক গান।
-
রেকর্ড: টুইন [ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৩)। এফটি ৪৭৭৫। শিল্পী আব্দুল লতিফ। সুর: কে. মল্লিক]
-
স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
সুধীন দাশ।
[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি, সপ্তদশ খণ্ড। প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট আষাঢ়, ১৪০৩/ জুন, ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ।
১৩ সংখ্যক গান।]
[নমুনা]
-
সুরকার: কাশেম মল্লিক
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। বন্দনা
- সুরাঙ্গ:
স্বকীয় বৈশিষ্ট্য