বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: যাবার বেলায় সালাম লহ হে পাক রমজান
যাবার বেলায় সালাম লহ হে পাক রমজান।
তব বিদায় ব্যথায় কাঁদিছে নিখিল মুসলিম জাহান॥
পাপীর তরে তুমি পারের তরী ছিলে দুনিয়ায়,
তোমারি গুণে দোজখের আগুন নিভে যায়,
তোমারি ভয়ে লুকায়ে ছিল দূরে শয়তান॥
ওগো রমজান, তোমারি তরে মুসলিম যত
রাখিয়া রোজ চিল জাগিয়া চাহি’ তব পথ,
আনিয়াছিলে দুনিয়াতে তুমি পবিত্র কোরআন॥
পরহেজগারের তুমি যে প্রিয় প্রাণের সাথী,
মসজিদে প্রাণের তুমি যে জ্বালাও দীনের বাতি,
উড়িয়ে গেলে যাবার বেলায় নতুন ঈদের চাঁদের নিশান॥
- ভাবসন্ধান: রমজান মাস আত্মশুদ্ধি, সংযম, কোরআনের শিক্ষা, আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়। তাই এর বিদায়ে ভক্তের হৃদয় ব্যথিত হয়, আবার এরই পরিণতিতে ঈদের আনন্দ আসে। কবি রমজানকে এক মহিমান্বিত অতিথি হিসেবে কল্পনা করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
এই ভাবনার আলোকে রচিত কবি পবিত্র রমজান মাসকে একজন মহিমান্বিত ও প্রিয় অতিথি হিসেবে কল্পনা করেছেন। রমজানের বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর হৃদয়ে যে গভীর বেদনা, কৃতজ্ঞতা এবং আবার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জাগে, সেই অনুভূতিই গানের মূল সুর। এখানে রমজান কেবল একটি মাস নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, সংযম, ক্ষমা এবং আল্লাহর রহমতের প্রতীক।
গানের শুরুতেই কবি রমজানকে বিদায়-সালাম জানিয়ে বলেন, তার বিদায়ে সমগ্র মুসলিম জগৎ শোকাহত। এই শোক কোনো পার্থিব বিচ্ছেদের নয়; বরং এমন এক পবিত্র সময়ের অবসানের জন্য, যখন মানুষ আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমা লাভের সুযোগ পায়। রমজানের বিদায় তাই ভক্তের হৃদয়ে গভীর বেদনার সৃষ্টি করে।
এরপর কবি রমজানকে 'পাপীর তরে পারের তরী' বলে অভিহিত করেছেন। এখানে পারের তরী একটি রূপক, যা মানুষের পাপমুক্তি ও মুক্তিলাভের পথকে বোঝায়। রমজান মানুষের আত্মসংযম, তওবা, ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে তাকে আল্লাহর ক্ষমার দিকে নিয়ে যায়।
তাঁর মতে, রমজানের বরকতে যেন দোজখের আগুন নিভে যায় এবং শয়তান দূরে সরে থাকে। এর দ্বারা তিনি ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী রমজানের বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও আল্লাহর অনুগ্রহের কথাই কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করেছেন।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, মুসলমানরা সারা বছর রমজানের অপেক্ষায় থাকে। রোজা, তারাবিহ, কোরআন তিলাওয়াত এবং ইবাদতের মাধ্যমে তারা এই মাসকে বরণ করে নেয়।
'আনিয়াছিলে দুনিয়াতে তুমি পবিত্র কোরআন'—এই পংক্তির মাধ্যমে কবি ইঙ্গিত করেছেন যে, রমজান মাসেই পবিত্র কোরআনের অবতারণা শুরু হয়েছিল। তাই রমজান কোরআনের আলো ও হেদায়েতের মাস।
গানেরর শেষাংশে কবি বলেন, রমজান পরহেজগার মানুষের প্রাণের সাথী এবং মসজিদগুলোকে ইবাদতের আলোয় উদ্ভাসিত করে তোলে। কিন্তু বিদায়ের সময় সে যেন নতুন ঈদের চাঁদের পতাকা উড়িয়ে চলে যায়। অর্থাৎ রমজানের অবসান ঘটলেও তার সমাপ্তি ঈদের আনন্দের সূচনা করে। এখানে বিদায়ের বেদনা ও ঈদের আনন্দ—দুটি অনুভূতি একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪২) মাসে, এইচএমভি
রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৬ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ
(নজরুল ইন্সটিটিউট, মাঘ, ১৪১৭/ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। গান সংখ্য ৫৯৬।
- রেকর্ড:
এইচএমভি। ডিসেম্বর ১৯৩৫ (অগ্রহায়ণ -পৌষ ১৩৪২)। এন ৭৪৪৮। শিল্পী:
আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
নীলিমা দাস। [নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, একত্রিশতম খণ্ড, নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন,
১৩৯৭ বঙ্গাব্দ/ ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দ] ২১ গান।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ-এর
গাওয়া গানের সুরানুসারে স্বরলিপি করা হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী ধর্মাঙ্গ। রমজান
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য